সুরাইয়া খাতুন

সুরাইয়া খাতুন, টিডিএন বাংলা, উস্থি: “একজন মানুষ যদি রক্ত দিয়ে কথা বলে ওঠে, সমস্ত সেলাই এসে জড়ো হয় আমাদের ঠোঁটে।”—-শ্রীজাত

কাশ্মীরের বাসিন্দা আট বছরের নিষ্পাপ শিশু আসিফা বানু। জম্মুর কাথুয়া জেলার একটি স্থানীয় মন্দিরে কিছু নরপিশাচদের লালসার স্বীকার হয় সে। অকথ্য পাশবিক নির্যাতনের পর শেষমেষ মাথায় পাথর মেরে হত্যা।
জম্মুর কাথুয়া জেলার বাসিন্দা ৫২ বছরের মোহাম্মদ ইউসুফ পুজ্বালা। যিনি একজন মুসলমান ভ্রাম্যমান মেষপালক সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। যারা গুজ্জর নামে পরিচিত। গরু, ছাগল, ঘোড়া প্রতিপালনই এঁদের পেশা। গত ১০ ই জানুয়ারী নিখোঁজ হয় মুহাম্মদ ইউসুফ ও নাসীমা বিবির আট বছরের ফুটফুটে মেয়ে আসিফা। দু’দিন ধরে খুঁজে না পেয়ে তাঁরা পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু  তাঁদের কোন রকম সাহায্য করেনি পুলিশ। উল্টে অপবাদ দিয়েছে, তাদের মেয়ে  হয়তো কোন ছেলে সঙ্গে পালিয়ে গেছে। এমন নিম্মরুচির মন্তব্য করতে শোনা গেছে দেশের আইন শৃংখলা রক্ষকদের কন্ঠে।
১৭ই জানুয়ারী এক প্রতিবেশী জানায়,  বাড়ি থেকে কিছু দূরে বনের মধ্যে পড়ে আছে ক্ষতবিক্ষত নিথর আসিফার দেহ।
তাকে এহেন নির্যাতন করা হয়েছে যে, তার পা ভেঙ্গে গেছে, নখ কালো হয়ে গেছে এবং তার হাত ও আঙ্গুলের উপর আছে নীল এবং লাল ক্ষতচিহ্ন ।
দুর্ঘটনায় দুই সন্তানকে হারানোর পর কোনো এক আত্মীয়ের কাছ থেকে শিশু কন্যা আসিফাকে দত্তক নেয় মোহাম্মদ ইউসুফ ও নাসীমা বিবি। নাসীমা বিবির কথায়, আসিফা ছিল চড়ুই পাখির মত সদা চঞ্চল, হরিণের মতো নিরীহ ও নিষ্পাপ। তার এই চরিত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য প্রতিবেশীদের সবার কাছে সে হয়ে উঠেছিল নয়নের মনি। মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির নির্দেশে তদন্তে শুরু হলে জানা যায় যে, আসিফাকে কয়েকদিন ধরে একটি স্থানীয় মন্দিরে বন্দী করে অজ্ঞান অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়। বারংবার নির্যাতন, গণধর্ষণ ও অবশেষে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাকে।
আসিফার মৃত্যুতে পুলিশ আট জনকে আটক করেছে। যাদের মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, চারজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং একটি কিশোর রয়েছে। ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সঞ্জী রাম অভিযোগ করেন, পুলিশ কর্মকর্তারা সুরেন্দ্র বর্মা, আনন্দ দত্ত এবং তিলক রাজ মিখর খাজুরিয়ার সহায়তায় এই অপরাধ পরিকল্পনা করেছিলেন। রামের ছেলে বিশাল, তার ভাগ্নে, একটি কিশোর এবং তার বন্ধু পারভেশ কুমারও ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত।
জানা যায় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি গুজ্জর সম্প্রদায়কে জম্মু ত্যাগ করার জন্য সন্ত্রস্ত করতে চেয়েছিলেন। জম্মুতে এরা জীবিকা নির্বাহ করতে বনভূমি ব্যবহার করে, যা নিয়ে সম্প্রতি এই অঞ্চলের কিছু হিন্দু বাসিন্দাদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এমনকি আসিফাকে কবরস্থ করার জন্য কবরস্থানে নিয়ে গেলে সেখানে সশস্ত্র কিছু হিন্দু তাদের হুমকি দেয়। সেই জমি তাদের দখলে বলে সমাধি দিতে বাধা সৃষ্টি করে। অথচ সেখানে এর আগে বেশ কয়েকজনকে কবরস্থ করা হয়েছিল।
আরো জানা যায় যে, বহুদিন ধরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বনভূমিকে নিয়ে বিবাদ চলছিল। উপজাতি অধিকার কর্মী ও আইনজীবী তালিব হুসেন বলেন, “এই দুর্ঘটনার কারণ জমি।” আসিফার পরিবারের সমর্থনে প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন জনাব হুসেন। বিপরীতে অভিযুক্তদের  আইনজীবী অঙ্কুর শর্মা অভিযোগ করেন যে মুসলমান জম্মুতে জনসংখ্যা পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে, যেখানে হিন্দু বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। “তারা আমাদের বন এবং জল সম্পদে অনধিকার প্রবেশ করে”। তিনি বলেন, অভিযুক্তদের মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং প্রকৃত অপরাধীরা এখনও মুক্ত।
সে যাই হোক, এলাকার দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে  বিবাদ ষড়যন্ত্র পরিণামে আট বছরের নিষ্পাপ ফুলের এই বিভীষিকাময় ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকান্ড। জমি সংক্রান্ত বিবাদের জেরেই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক, নিষ্পাপ শিশু আসিফার এই চরম নির্মম পরিণতির জন্য যারা দায়ী তারা যেন যথোপযুক্ত শাস্তি থেকে রেহাই না পায়।