ভ্যালেন্টাইন ডে’র আগে এই অসাধারণ প্রবন্ধটি পড়ে নিন “পুঁজির উৎসে ভ্যালেন্টাইন ডে “

0

মোহা: আজাহারউদ্দিন, টিডিএন বাংলা :  তৃতীয় বিশ্বের মানচিত্রে সমস্ত পরিবারে শৌচাগার না থাকলেও আমরা যে গ্লোবালাইজেশনের ক্লাইমেক্সে অবস্থান করছি তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। উৎস সম্পর্কে  ইতিহাসের স্পষ্টতা না থাকলে প্রচলিত ও প্রতিষ্টিত”ভ্যালেন্টাইনস” ডে সম্পর্কে  ধারণা দেওয়ার প্রয়য়োজন নেই।  অনান্য দিনের মতো সেইদিনটিও  একটি দিন পার্থক্য শুধু প্রেম আর ব্যবসার নিরিখে যা সমগ্র পাশ্চাত্য দেশসহ এশিয়াতে ও তার প্রভাত কোনো অংশে কম নেই।

যেখানে  প্রিয়া প্রকাশ ওয়ারিরার চোখের  এক ভ্রুকুঁচকানোতে ৪/৫দিনে ৫মিলিয়ন ভিউয়ার হয়ে সেখানেতো ভ্যালেন্টাইন  ডে কে হাতিয়ার করে প্রেম দিবসের নামে পুঁজি  কামানো খুব সহজ ব্যাপার

১৪ ফেব্রুয়ারির ঘন্টা ধ্বনি বেজে ওঠার সাথে সাথে প্রমিক-প্রেমিকার উষ্ণ আলিঙ্গনের শীতল চেতনায় নিক্ষেপ হবে পুঁজিবাদের দৃষ্টি। গাছ থেকে লাল ফুল ছিঁড়ে গাছের সৌন্দর্য নস্ট করে প্রেমিকা খুশি করতে আয়োজনের কোনো ঘারতি থাকবে না। কেক, চকোলেট আর ক্রিয়েটিভ আর্ট-এর চাহিদা থাকবে ব্যবসার জগতে তুঙ্গে। পর্যটনশিল্পে পার্কের ব্যবসা হয়ে উঠবে জমজমাট উঠবে। সরকারের অর্থনীতিও মজবুত হবে।


মানবীয় মুল্যবোধের চরম অবক্ষয়ে প্রেম, ভালোবাসা,স্নেহ,শ্রদ্ধা একাবিংশ শতাব্দীর মরুদ্যান সমকক্ষ তাতে সন্দেহ নেই।কিন্ত  একোন ভালোবাসা দিবস যে একদিনে সীমাবদ্ধ আর সেখানে ব্যবসা টিকলেও ভালোবাসা টিকছে না । তাই তো বুঝি প্রতিবছর ভ্যালেন্টাইন দিবস পালন করা প্রয়োজন?

যে দেশ বা সভ্যতায় যুগ-যুগান্তর ধরে ভালোবাসা দিবস পালন করে আসছে সেই সভ্যতায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়,নারী ধর্ষিতা হয়, শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়,  ক্ষমতারদম্ভে নিরপরাধ মানুষ কে অপরাধী আর অপরাধীকে নিরপরাধের ফাইলে বন্ধী করা হয়, যাদের নিজভুমে পরবাসি করা হয়।রঙের খেলায় মেতে ওঠে, জাত-পাতের গুরুত্ব দেওয়া হয়,যেখানে আমরা সবাই লাল রক্তের মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি সেখানে এই ভ্যালেন্টাইন ডে-এর কোনো মূল্য নেই।এর মূল্য শুধু পুঁজিবাদের কাছে।

হ্যাঁ ভালোবাসা একটি আবেগের নাম সেটাই হইতো  বিশ্বসভ্যতাকে যুগ থেকে যুগান্তর ধরে বাঁচিয়ে রাখবে।একটি শিশু পৃথিবীতে আসার  সাথে সাথে ভালোবাসার পরিমন্ডলে সে বেড়ে উঠে, তখন থেকেই তাকে ঘিরে চলে ভালোবাসার নানান আয়োজন চলতে থাকে। পৃথিবীর আলোতে চোখ রেখে তার কান্নার সূচনালগ্নে  তার স্থান হয়, ভালোবাসার শীতলছায়া মায়ের কোলে। এ ভালোবাসার নাম স্নেহ। মা-বাবা, ভাইবোন,আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে তার গড়ে ওঠে ভালোবাসার অটুট বন্ধন। তার অস্পষ্ট বুলির প্রভাবে তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে স্নেহের বিচরণক্ষেত্র । এই শিশু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কিশোর, যুবক, প্রবীণ এর সীমা ছাড়িয়ে অগ্রগামী হতে থাকে। সেও ভালোবাসার আকর্ষণ সৃষ্টি করে তার নিজের মাঝে। মায়ের ভালোবাসা, স্নেহের প্রতিদানে সেও মাকে ভালোবাসে। এ ভালোবাসার নাম শ্রদ্ধা। বুদ্ধি বিকশিত হওয়ার  সাথে সাথে তার ভালোবাসার পরিধিও বাড়ে। শুধু শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী  পরিবর্তন হয় ভালোবাসার প্রকারভেদ। শ্রদ্ধা, স্নেহ আর কোথাও বা প্রেম নামে । ভালোবাসার আকর্ষণ হতে সে কখনও বিচ্ছিন্ন হয় না। বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীরূপী মানব-মানবীর মধ্যে গড়ে ওঠে ভালোবাসা সূচনা। এ ভালোবাসার নাম প্রেম। ।  ভালোবাসা জন্য  সুবিশাল প্রসাদ গড়ে তুলতে হবে এমন কথাও নয়  ছোট্ট কুড়েতে  বাস করে জীবনকে প্রেমময় করা যায়  । পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই আছে যা দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। কিন্তু এ সবের অনুপস্থিতি পৃথিবীতে বিপর্যয় ডেকে আনে। যেমন মহাকর্ম ও মাধ্যকর্ষণ বল আমরা কেউ দেখি না। কিন্তু এই বলের অস্তিত্ব আছে বলেই টিকে আছে মহাবিশ্ব।

সৃস্টিকর্তার আদেশে এই বল নিষ্ক্রিয় হলেই এক মুহূর্তের মধ্যে উলট-পালট হয়ে যাবে সাজানো-গুছানো এই মহাবিশ্ব। মানব-মানবী ও প্রাণিজগতের মধ্যে মহাকর্ষ ও মাধ্যকর্ষণ বলের মতোই ক্রিয়াশীল ভালোবাসার নাম বল বা শক্তি। যদি কোনো নির্দিষ্ট দিনের জন্য মহাকর্ষ ও মাধ্যকর্ষ বলের ক্রিয়াকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়, তবে কি এ মহাবিশ্ব টিকে থাকবে না? নিশ্চয়, মহাবিশ্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য সব সময় এ বলের উপস্থিতি প্রয়োজন। অনুরূপভাবে ভালোবাসাকেও কোনো নির্দিষ্ট দিনের ফ্রেমে বন্দী করলে এ সভ্যতাও টিকে থাকবে তো? তারপরও কেন ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস?কেন ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপন? এ দিনটির সাথে আমাদের সভ্যতা -সংস্কৃতিরই কোনো সম্পর্ক আছে। কোনো সম্পর্ক  থাকার কথা নই। তারপরও বেশি না ভেবে এ দেশের মানুষ এ দিনটিকে নিয়ে মাতামাতি করে।  ভ্যালেন্টাইনস ডে-এর যে ইতিহাস বর্ণনা করা হয় তা থেকেও জানা যায়, এ দিনের ইতিহাসের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।  মধ্য আশির দশকে পৃথিবী জুড়ে সেন্ট ভ্যালেনটাইনস ডে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়। তবে তা শুরু হয়েছে অনেক বছর আগে। এর ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে অনেক ধরনের অনেক কাহিনীর কথা জানা যায়। মূলত যে কাহিনীটি প্রচলিত আছে তা হলো রোমান খ্রিস্টান পাদরি বা সেন্টের কাহিনী অনুসারে তার নাম সেন্ট ভ্যালেনটাইন। তিনি ছিলেন একজন পাদরি এবং একই সঙ্গে চিকিৎসক। কিন্তু সে সময় রোমানদের দেব-দেবী পূজার বিষয়টি ছিল মুখ্য। তারা খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসী ছিল না। খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের অভিযোগে ২৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের আদেশে ভ্যালেনটাইনের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তিনি যখন জেলে বন্দী ছিলেন তখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাকে ভালোবাসার কথা জানিয়ে জেলের জানালা দিয়ে চিঠি ছুঁড়ে দিতো। বন্দী অবস্থাতেই সেন্ট ভ্যালেনটাইন জেলারের অন্ধ মেয়ের চিকিৎসা করে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। মেয়েটির সঙ্গে তার যোগাযোগ ঘটে। মৃত্যুদণ্ডের আগে মেয়েটিকে লেখা এক চিঠিতে জানান, ফ্রম ইওর ভ্যালেনটাইন।

অনেকের মতে, সেন্ট ভ্যালেনটাইনের নাম অনুসারেই পোপ জুলিয়াস ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেনটাইন ডে হিসেবে ঘোষণা করেন।

আরো একজন ভ্যালেনটাইনের নাম পাওয়া যায় ইতিহাসে। রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস যুবকদের বিয়ে করতে নিষেধ করেন যুদ্ধের জন্য ভালো সৈন্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই ভ্যালেনটাইন নিয়ম ভেঙে প্রেম করেন। তারপর আইন ভেঙ্গে বিয়ে করেন। ফলে তার মৃত্যুদণ্ড হয়।

এরপরও বহু বছর আগে থেকে রোমানদের দু’টি প্রথা চালু ছিল প্রেম-বিয়ে এবং সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা বিষয়ে উৎসবের জন্য। হুপারকালিয়া এসব উৎসবের অন্যতম। এটি অনুষ্ঠিত হতো ১৫ ফেব্রুয়ারিতে। দেবতা হুপারকাস রোম শহরকে রক্ষা করতেন নেকড়ের আক্রমণ থেকে অনুষ্ঠানের দিন তরুণরা প্রায় নগ্ন হয়েই দৌড়াদৌড়ি করতো এবং নববিবাহিতারা তাদের চাবুক দিয়ে পেটাতো। তরুণীরা মনে করতো এতে সন্তান উৎপাদন সহজ হবে। কেননা এটি ছিল সন্তান উৎপাদনের উৎসব। ১৫ ফেব্রুয়ারি এটি হতো। এর আগের দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি তরুণ-তরুণীরা নাচের পার্টনার লটারীর মাধ্যমে নির্বাচিত করতো। ৪০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে দু’দিনের উৎসবের সময় কমিয়ে একদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি পালন করা হতো। অনেকে মনে করতো ১৪ ফেব্রুয়ারি পাখিরা পার্টনার বেছে নেয়। ফলে এ দিনটি সবচেয়ে উপযুক্ত।

এ দিনটি পালনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোমানরা বক্সের ভিতর নাম লেখে লটারী করে তাদের প্রিয়তম বা প্রিয়তমা নির্বাচন করতো।

১৭০০ সালের দিকে ইংরেজ রমনীরা কাগজে তাদের পরিচিত পুরুষদের নাম লিখে পানিতে ছুঁড়ে মারতো  কাঁদা মাটিতে মিশিয়ে। যার নাম প্রথমে ভেসে উঠতো সেই হয় তো প্রকৃতপ্রেমিক। ষোড়শ শতাব্দী থেকে কাগজের কার্ড বিনিময় শুরু হয়।

উল্লিখিত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘ভ্যালেনটাইনস ডে’ সার্বজনীন  উদযাপনযোগ্য কোনো বিষয় নয়। পশ্চিমা বিশ্বকে অন্ধভাবে অনুসরণ করতে গিয়ে আমাদের ‘ভ্যালেনটাইন ডে’ তে হাওয়া লেগেছে। ভারতবর্ষের অনেক তরুণ-তরুণীও এ ফাঁদে পা দিয়ে অর্থ, শ্রম সময় নষ্টের সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে অপসংস্কৃতির অন্ধকারে।

পশ্চিমারা কেন বিশ্বব্যাপী ভ্যালেনটাইনস ডে-এর এত প্রচার করছে?  আপনি হয়তো কিন্ত বিষয়টিতে  মনোযোগ দেওয়ার সময় পান না আসলে তা ব্যবসা। কত কিছুর নামে পৃথিবীতে ব্যবসা চলছে। এমনকি ধর্মেকেও ব্যবসা  ব্যবসায় পরিণত করা হচ্ছে ইউরোপের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মধ্যযুগে খ্রিস্টান পাদরিরা মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতিটি গির্জাকে পরিণত করেছিল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। তাইতো তারা খুব সহজে স্বর্গের টিকিটে ব্যবসা গড়ে তুলেছিল। ধর্ম বুঝে না করলে মানুষ মুক্তির পরিবর্তে বন্দি হয়ে পড়বে।তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানুষ রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণের নামে গির্জার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তাদের অপকর্মের প্রভাবেই ষোড়শ’ শতাব্দীতে সেক্যুলারিজম নামের ধর্মহীন মতবাদের জন্ম হয়েছে। জন্ম হয়েছে পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার। রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে ধর্মের নির্বাসন বলতে গেলে তৎকালীন   খ্রিস্টান ধর্ম ব্যবসায়ীদের অপকর্মেরই ফল।

ভ্যালেনটাইন ডে উদযাপনের  জন্য যেসব উপকরণ অত্যাবশ্যকীয় তার মধ্যে রয়েছে ফুল, কার্ড, চকলেট। হাইফাইভাবে যারা উদযাপন করেন তাদের উপকরণের তালিকায় উল্লিখিত উপকরণছাড়াও মদ, মাংস, নাচ-গান যোগ হয়। তারা ভালোবাসার নামে এক দিনের জন্য ভেসে যান আদিম বর্বরতায়।

প্রতি বছর ১৪ই ফেব্রুয়ারী আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা সহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে পালিত হয়ে আসছে ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালবাসার দিন। এ দিনে প্রিয়জনকে ফুল, মিস্টি, চকলেট, কার্ড এবং অনান্য উপহার দিয়ে থাকেন সবাই।

উল্লেখিত আছে যে, সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের নাম অনুসারে এ দিনের নামকরন। খৃস্টান এবং রোমান ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে এই দিনের পেছনে। ক্যাথলিক চার্চ অনুযায়ী কমপক্ষে তিনজন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের নাম পাওয়া যায়। এই তিনজনের প্রত্যেকেই শহীদ হন।

প্রচলিত একটি ধারনা হল যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন তৃতীয় শতাব্দীতে রোমে বাস করতেন। তখনকার রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস- ২ বিশ্বাস করতেন যে বিবাহিত পুরুষেরা ভাল যোদ্ধা হয় না। তিনি ফরমান জারী করেন যে যুবকেরা বিয়ে করতে পারবে না। সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন এই অন্যায় মেনে নিতে পারেন নি। তিনি সম্রাটের ফরমান অগ্রাহ্য করে গোপনে যুবক যুবতীর বিয়ে দিতে থাকেন। সম্রাট তা যানতে পেরে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেন।

সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের গল্প কোনটা সত্যি তা নিয়ে হয়ত দ্বিমত আছে তবে মধ্যযুগ থেকেই সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন ইংল্যান্ডে এবং ফ্রান্সে প্রবাদ পুরুষ। তিনি ভালবাসা, প্রেম, বীরত্ব এবং সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন সেই সময় থেকেই।

অন্য একদলের বিশ্বাস যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপনের জন্য খৃস্টানেরা মধ্য ফেব্রুয়ারীতে “ ভ্যালেন্টাইন” ভোজ এর আয়োজন করতেন।

রোমান ঐতিহ্য অনুসারে মধ্য ফেব্রুয়ারীতে পালিত হত পৌত্তলিক রোমানদের উৎসব “ লুপারসেলিয়ায়” (Lupercalia)। ফেব্রুয়ারী মাসের ১৫ তারিখ বা মধ্য ফেব্রুয়ারীতে পালিত হত এ উৎসব। নতুন জন্মের এ উৎসব নিবেদিত হত রোমান কৃষির দেবতা “ফোনাস”র উদ্দেশ্যে । রোমান পূরোহিতদের বলা হত “লুপারসি”। কথিত আছে রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রেমুস এবং রোমুলাস কে পাহাড়ের গুহাতে লালনপালন করে নেকড়ে বাঘ “লুপা”সেই পবিত্র গুহাতে লুপারসিরা মধ্য ফেব্রুয়ারীতে সমবেত হতেন।সেখানে নতুন জন্মের আশীর্বাদ চেয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে পাঠা বলি দেওয়া হত আর আত্মশুদ্ধির প্রতীক হিসেবে বলি দেওয়া হত কুকুরের। পাঠার সে চামড়া রক্তে ভিজিয়ে তা দিয়ে যুবতীদের এবং শস্য ক্ষেত্রকে স্পর্শ করা হত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে এই স্পর্শ ভূমি এবং যুবতীদেরকে আরো ফলদায়ীনি করবে। বিকেলের দিকে কুমারী যুবতিদের নাম লিখে রাখা হত এক বড় পাত্রে যেখান থেকে অবিবাহিত পুরুষেরা তাদের সঙ্গী বেছে নিত। লুপারসেলিয়া টিকে ছিল খৃস্ট ধর্মের গোড়ার দিনগুলোতে । লুপারসেলিয়া উৎসবকে খৃস্টান ধর্মের সাথে অসামঞ্জস্য পুর্ন বিবেচনা করে ৫ম শতাব্দীতে পোপ গেলাসিয়াস ১৪ ই ফেব্রুয়ারীকে ‘ সেইন্ট ভ্যালন্টাইন দিবস” হিসেবে ঘোষনা করেন। এ দিনকে ভালবাসার দিন হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে সময় লেগেছে আরো অনেক বছর। মধ্যযুগে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে বিশ্বাস ছিল যে ১৪ ই ফেব্রুয়ারী থেকে সে দেশে পাখীদের প্রজনন শুরু। সে বিশ্বাস সাহায্য করেছে ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে ভালবাসার দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে । ১৪ই ফেব্রুয়ারির ভ্যালেন্টাইন দিনের সবচে পুরনো লেখা হল লন্ডনের বৃটিশ লাইব্রেরীতে রক্ষিত অর্লিয়ান্সের ডিউক, চার্লসের কবিতা। এজিনকোর্টের যুদ্ধে পরাজয়ের পর টাওয়ার অফ লন্ডনে বন্দী থাকা অবস্থায় ডিউক ১৪১৫ সালে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে লিখেন সে কবিতা। এর কয়েক বছর পর ইংল্যান্ডের রাজা হেনরী-৫ প্রেমিকা ক্যাথরিন ভালোয়ার উদ্দেশ্যে ভ্যালেন্টাইন দিবসে কবিতা লেখান লেখক জন লিন্ডগেটকে দিয়ে। প্রতিবছর এই দিনে পৃথিবীতে ১৫ কোটি বেশি ভ্যালেন্টাইন কার্ড বিক্রি হয়।খৃসমাসের পর এটাই দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্ড দেওয়া নেওয়ার দিন

পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দেশের লোক তাদের পোষা প্রানীদেরকে ভ্যালন্টাইন ডে’র উপহার দিয়ে থাকেন। তাদের বক্তব্য হল পশু পাখির ভালবাসা মানুষের ভালবাসার চেয়ে অনেক খাটি। তাই তাদেরকেও দেওয়া উচিৎ।

মা দিবস এবং ভ্যালেন্টাইন দিবস হল সবচেয়ে বেশী ফুল উপহারের দিন । এ দিন সারা পৃথিবীতে ৫ কোটির ও বেশী লাল গোলাপ উপহার দেওয়া হয়ে থাকে। সর্বোত্রই ব্যবসা।অতীতে ছিল পাদ্রী- পুরোহিতদের ব্যবসা বর্তমানে কর্পোরেট শ্রেণীরর ব্যবসা।

শেক্সপেয়ারের নাটক “রোমিও জুলিয়েট” এর রোমিও এবং জুলিয়েট ইতালীর ভেরোনা শহরের বাস করতেন। সেই নাটকের সূত্র ধরেই আজও জুলিয়েট এই দিনে প্রায় এক হাজার ভ্যালেন্টাইন ডে’র কার্ড পেয়ে থাকেন। ভ্যালেন্টাইন ডের উপহার হিসেবে প্রখ্যাত চকোলেট নির্মাতা ক্যাডবেরী, প্রথম হৃদয় আকৃতি’র বাক্সে চকোলেট উপহারের প্রচলন করে।

কোন কোন দেশে যুবকরা পানি প্রার্থনা করে যুবতীদের কাপড় চোপড়ের উপহার বাক্স পাঠিয়ে থাকেন। যুবতী বাক্স গ্রহন করলে ধরে নেওয়া হয় যে তিনি প্রেরনকারী যুবকের সাথে বিয়ে তে রাজী আছেন। কোরিয়া তে যুবতীরা এ দিনে কোন উপহার না পেলে শোকের চিহ্ন হিসেবে রেস্তোরাতে গিয়ে কাল স্যুপ খেয়ে থাকেভ্যালেন্টাইন ডে’র প্রতীক- এ দিনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল ভালোবাসা। বেশ কিছু প্রতীক ব্যবহার করা হয় ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে-কিউপিড বা বামুন- রোমান পৌরানিক উপাখ্যানমতে কিউপিড ছিলেন প্রেমের দেবতা ভেনাসের পূত্র। কিউপিড হলেন খর্বাকৃতির বালক, হাতে তার তীর ধনুক, পিঠে তুন এবং এক জোড়া পাখা লাগানো। তিনি তার তীর ছূড়ে যুবক যুবতীর মনে প্রেমের সঞ্চার করেন।

ভ্যালেন্টাইন ডে’র কুসংস্কার- ভ্যালেন্টাইন ডে তে যুবতী মেয়ে যে পাখি প্রথম দেখবে তার স্বামী হবে সেই অনুসারে যেমন- চড়ুই দেখলে তার স্বামী হবে গরীব, পেচা দেখলে তার কোনদিন বিয়ে হবে না। নীল পাখী দেখলে স্বামী হবে সুখী মানুষ, কালো পাখি দেখলে স্বামী হবে পাদ্রী, দোয়েল দেখলে স্বামী হবে নাবিক, গোল্ডফিঞ্চ পাখি দেখলে স্বামী হবে ধনী কোটিপতি, আর ক্রসবিল পাখী দেখলে স্বামী হবে ঝগড়াটে।

একটা আপেল অর্ধেক করে কাটলে সে অর্ধেকে যতগুলো বিচি পাওয়া যাবে সেই মেয়ের ততগুলো ছেলেমেয়ে হবে।

সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে ম্যাসাকার- ১৯২৯ সালের এই দিনে আমেরিকার শিকাগো শহরে ৭ ব্যাক্তি কে গ্যারাজের মধ্যে নৃশংস ভাবে গুলি করে হত্যা করা হয় যা ভ্যালেন্টাইন ডে ম্যাসাকার হিসেবে খ্যাত।

এন্টিভ্যালেন্টাই ডে- পৃথিবীর অনেক দেশে আবার ভ্যালেন্টাইন ডের বিরুদ্ধে মতবাদ গড়ে উঠছে।   বিরোধী আখ্যা দিয়ে তা পালন করা থেকে বিরত থাকার জন্য আহবান জানানো হচ্ছে’ গত বছর মালয়েশিয়ায়তে এই দিন পালন করার অপরাধে ১০০ জন তরুন তরুনীকে গ্রেফতার করা হয়। এইদেশেও উগ্র হিন্দুবাদী সংঠন শিবসেনা,আর,এস,এসও  ভ্যালেন্টাইন ডে পালনের ব্যাপারে হুশিয়ারী দিয়ে থাকে। সব কিছুর পর ও কিন্ত ভ্যালেন্টাইন ডে ‘র জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এমন কি পাকিস্তানেও এই দিন আরো বেশী করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একদিকে যেমন প্রলেপ দেওয়া ভালোবাসাকে মুছে ফেলা যায় না অন্য পুঁজিবাদকেও উতখাত করা যাচ্ছে না।  অনেকটা যেন সেই  প্রচলিত প্রবাদের মত – “ঘোড়াকে পানির কাছে টেনে নিয়ে যেতে পারেন কিন্তু তাকে দিয়ে পানি খাওয়ানোর নিশ্চয়তা দিতে পারেন না”

ভালোবাসাহীন কামনার খেলায় মেতে উঠে তারা। এসব কামনার উপকরণের যোগানদার ব্যবসায়ীরা বিশ্বব্যাপী জমজমাট বাজার গড়ে তুলতেই চোখ ধাঁধানো প্রচারণার ফাঁদ পাতে। আর বোকার দল  ঐ ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে। সাধারণ স্বতঃসিদ্ধ হলো ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট স্থান কালের ফ্রেমে বন্দী করা যায় না। ভালোবাসা সব সময়ের। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রতিক্ষণ ভালোবাসাকে যারা ধরে রাখতে পারেন তারাই এই সভ্যতাটাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

আসুন আমরা পৃথিবীকে প্রেমময় করতে ভ্যালেন্টাইন ব্যবসা বন্ধ করি।  আমাদের  সংকীর্ণতা  ও নগ্নভাবনার দৃস্টি এড়াতে হবে। অতএব আমরা আওয়াজ ওঠায় ভালোবাসা প্রতিদিন-প্রতিমুহূর্ত -প্রতিক্ষণ, তবে কেন  আলাদা ভ্যালেনটাইনস দিন উদযাপন। আসুন এ বিশ্বকে সুন্দর-শুভ্র  করতে ভালোবাসাকে নির্দিষ্ট দিনের জন্য সীমাবদ্ধ  না রেখে প্রতিদিন ভালোবাসি এবং মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলি,মমত্ববোধ প্রতিষ্টিত করি আর ভালোবাসার নামে পুঁজিবাদের ব্যবসাকে উতখাত করি।

tdn_bangla_ads