সামাউল্লাহ মল্লিক

সামাউল্লাহ মল্লিক : সিমির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে বিচারাধীন ভোপালের সেন্ট্রাল জেলে বন্দি থাকা কয়েদীদের সঙ্গে উৎপীড়নের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। নিজেদের তদন্তে এই অভিযোগের সত্যতা জানার পর জেল আধিকারিক ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনী তদন্তের কথা জানিয়েছে কমিশন। গত বছর ভোপাল সেন্ট্রাল জেলে সিমি (স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া) সংক্রান্ত মামলায় অভিযুক্ত ২১ বিচারাধীন কয়েদীর পরিবারের পক্ষ থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। সেই অভিযোগে বলা হয়েছিল, জেল কর্মচারীরা কয়েদীদের শারীরিক ও মানষিকভাবে অত্যাচার চালায় ও তাঁদের উপর অবর্ণনীয় আচরণ করা হয়। এরপর কমিশনের পক্ষ থেকে মামলার তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি সম্প্রতি তাঁদের রিপোর্ট তৈরী করেছে।

ভোপাল এনকাউন্টারে উত্থাপিত কিছু প্রশ্ন

Advertisement
head_ads

৩১ অক্টোবর ২০১৬। সেদিন রাতে ভোপাল সেন্ট্রাল জেলের ৮ জন সন্দিগ্ধ সিমি সদস্যকে জেল থেকে পালানোর চেষ্টা করার অভিযোগ করে এনকাউন্টার করা হয়েছিল। এই এনকাউন্টার এমন কিছু গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, যা হাজার লুকানোর পরও বারেবারে প্রকাশ্যে এসে গিয়েছে। এই এনকাউন্টারে প্রাণ হারানো কয়েদীদের আত্মীয়, মানবাধিকার সংগঠন, বিপক্ষীয় পার্টি ও কিছু সাংবাদিক লাগাতার প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। যার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। এই হত্যাকান্ড নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গল্প শোনানো হয়েছিল। এই কাহিনীর কিছু চরিত্র আজগুবি হওয়ায় তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক। এই চরিত্রে একমত হওয়াও অসম্ভব।

 

এনকাউন্টারের পর পুলিশের পক্ষ থেকে যে থিওরি পেশ করা হয়েছিল তা হল, কয়েদীরা জেল থেকে পালানোর জন্য রুটি ব্যবহার করেছিল! তাঁরা প্রায় ৪০ দিন ধরে খাওয়ার আগে অতিরিক্ত রুটি চেয়ে নিত। এই রুটিগুলি তাঁরা খাওয়ার বদলে শুকিয়ে রেখে দিত। এই শুকনো রুটিগুলির সঙ্গে টুথব্রাশ আগুনে জ্বালিয়ে তাঁরা এমন চাবি বানিয়েছিল, যা দিয়ে অনায়াসেই জেলের তালা খুলে ফেলা যায়। সেদিন রাতে তালা খোলার পর তাঁরা পাহারারত সিপাহি রমাশঙ্কর যাদবকে গলা টিপে হত্যা করে এবং অপর এক সিপাহি চন্দন সিংয়ের হাত-পা বেঁধে ফেলে। তারপর তাঁরা চাদরকে রশি হিসেবে ব্যবহার করে ২৫ ফুট উঁচু দেওয়াল টপকে পালিয়ে যায়।

 

একইভাবে এনকাউন্টার নিয়ে মন্ত্রী ও আধিকারিকদের দেওয়া বয়ানও একে অপরের সঙ্গে মিলছেনা। যেমন, মধ্যপ্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভুপেন্দ্র সিং দাবি করেছিলেন যে, এনকাউন্টারের সময় অভিযুক্তদের কাছে প্রচুর অস্ত্রসস্ত্র ছিল। কিন্তু রাজ্যের এটিএস প্রধানের বয়ান ছিল ঠিক তার উল্টো। এটিএস প্রধান নিজ বয়ানে বলেছিলেন যে, তাঁদের কাছে কোনও অস্ত্র ছিল না। সেইসময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পলাতক অভিযুক্তরা আত্মসমর্পণ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পুলিশ তাঁদের কোনও সুযোগই দেয়নি। অপর একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন আহত কয়েদীকে নিশানা করে গুলি ছুঁড়ছেন একজন পুলিশকর্মী।

 

এনকাউন্টারের পর যেভাবে পোস্টমর্টেম করা হয়েছিল, তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা, প্রশ্নও উঠেছে বিস্তর। ইংরেজি গণমাধ্যম ডিবি পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেডিকো লিগ্যাল ইনস্টিটিউট এর নির্দেশক ডা. অশোক শর্মা মাত্র ৪ ঘন্টায় একাই ৮ জন অভিযুক্তর ময়নাতদন্ত সেরে ফেলেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে একটি সাধারণ ময়নাতদন্ত করতেও ৪৫ থেকে ১ ঘন্টা সময় লাগে। সেখানে ৮ জন সন্ত্রাসীর (?) ময়নাতদন্ত মাত্র ৪ ঘন্টায় কিভাবে সম্ভব? এই ময়নাতদন্তের সময় সেখানে কোনও ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ তো ছিলই না, এমনকি আদালতকেও বিষয়টি জানানো হয়নি। যেহেতু কয়েদীরা বিচারাধীন বন্দি ছিলেন, সেহেতু নিয়মানুযায়ী মরদেহ পরীক্ষার আগে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে জানানো উচিত ছিল।

 

ময়নাতদন্তকারী ডা. শর্মার বারবার বয়ান পরিবর্তন নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। আর একারণে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়ে নানা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আগে তিনি বলেছিলেন, কয়েদীরা শেষবার রাত ১০টায় (ঘটনার ৪ ঘন্টা আগে) খাবার খেয়েছিলেন। পরে নিজ বয়ান থেকে নব্বই ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে তিনি বলেন, কয়েদীরা সম্ভবত সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ শেষ খাবার খেয়েছিল। উল্লেখ্য, ভোপাল সেন্ট্রাল জেলে কয়েদীদের সন্ধ্যা ৬:৩০টার সময় খাবার দেওয়া হয়। ডা. শর্মা আরও বলেছিলেন, ‘চারজন অভিযুক্তর শরীর থেকে বুলেট উদ্ধার হয়েছে এবং বাকি চারজনের শরীর এফোঁড়ওফোঁড় করে বুলেট বেরিয়ে গিয়েছে।’ এর মানে হল, কয়েদীদের খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। যখন এই নিয়ে প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়, তখন আবারও সুর বদলান ডা. শর্মা। তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই যে, তাদের কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে কিনা।’

ভোপাল এনকাউন্টারে মৃত ৮ বন্দি

এই ঘটনায় তিনজন পুলিশকর্মচারী আহত হয়েছিল বলে জানায় সরকার। বলা হয়েছিল, ওই পুলিশকর্মচারীদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার ফলে তাঁদের হাত ও পায়ে গুরুতর আঘাত লেগেছে। কিন্তু ২০১৬ সালের ১১ নভেম্বর হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওইদিন কোনও পুলিশকর্মচারী গুরুতরভাবে আহত হয়নি। ভোপাল  এনকাউন্টার নিয়ে ভোপাল আদালতও প্রশ্ন তুলেছিল। কোর্টের কথায়, ‘এনকাউন্টার হওয়ার ৯ দিন পর সরকারিভাবে আদালতকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু এই এনকাউন্টারে মারা যাওয়া বন্দিরা যেহেতু বিচারাধীন ছিলেন, সেহেতু আদালতকে বিষয়টি আরও তাড়াতাড়ি জানাতে হতো।’ আদালত আরও বলেছিল যে, ‘অভিযুক্তদের ময়না তদন্তও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে করা হয়নি। এটা আইনি প্রবিধান লঙ্ঘন।’ একইভাবে এনকাউন্টারের স্থান সিল না করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল আদালত।

 

এনকাউন্টার নিয়ে এইসব প্রশ্ন ওঠা সত্বেও এনকাউন্টারের পক্ষেই মুখ খোলেন মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহ্বান। তিনি শুধুমাত্র এই প্রশ্নগুলিই এড়িয়ে যাননি, বরং জোরালো গলায় বিরোধীদের আক্রমন করে এই এনকাউন্টারকে সঠিক বলে মন্তব্য করেন। ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর রাতে ৮ জন বিচারাধীন কয়েদী মারা যাওয়ার পর এখনও সেখানে একই অভিযোগে ২১ জন বিচারাধীন রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠন সিমির সদস্য হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এনকাউন্টার হওয়ার পর ওই বন্দিদের পরিবারও আতঙ্কে রয়েছে।

 

শুধু ভোপাল জেলে না, মহারাষ্ট্রের অন্যান্য জেলেও প্রচুর সংখ্যক মুসলিম যুবক বন্দি রয়েছে। ২০১৩ সালে জামিয়া টিচার্স সলিডারিটি মারফত ‘গিল্ট বায় এসোসিয়েশন’ নামে একটি রিপোর্ট পেশ করা হয়েছিল। এই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রদেশে ২০০১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ইউএপিএ-এর অধীনে দায়ের হওয়া ৭৫টি মামলার তদন্ত করে জানা গিয়েছে ২০০-র অধিক মুসলিম যুবক সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে রাজ্যের বিভিন্ন জেলে বন্দি রয়েছে। এদের মধ্যে ৮৫ জনের বিরুদ্ধে ইউএপিএ অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু রিপোর্ট বলছে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত থাকার যথোপযুক্ত প্রমাণ মেলেনি। এছাড়া এফআইআরে যে অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে তা নিয়েই রয়েছে ধোঁয়াশা।

 

আমাদের দেশে আন্ডারট্রায়ালে থাকা কয়েদীদের সন্ত্রাসবাদী বানিয়ে দেওয়ার ঘটনা অতি সাধারণ। আবার বিষয়টি যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হয়, তাহলে তো কেল্লাফতে। অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগেই যে কেউ বিচারপতি সেজে রায় শুনিয়ে দেয়। এই বিষয়ে মিডিয়া সবচেয়ে এগিয়ে। এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে বছরের পর বছর জেল খাটার পর মুক্তি পাওয়া যুবককে মিডিয়া লাগাতার সন্ত্রাসী বলে সম্বোধন করে এসেছে। প্রাণ হারানো ৮ কয়েদী ও বর্তমান ২১ কয়েদীর বিরুদ্ধে সিমি সদস্য হওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা এখনও প্রমাণিত হওয়া বাকি। কিন্তু আমাদের মিডিয়া তাঁদের সন্ত্রাসী লিখতে বা বলতে পছন্দ করে। এমতাবস্থায় ন্যায়বিচারের আশা করাটা বোকামী নয় কী? আপাতত সময়ের হাতেই সেই প্রশ্ন তুলে দেওয়া যাক।

head_ads