অনুবাদক : সাংবাদিক সামাউল্লাহ মল্লিক

সামাউল্লাহ মল্লিক, টিডিএন বাংলা : চাকরি সূত্রে ট্রেন লাইনে বজবজ থেকে পার্ক সার্কাস এবং নলপুর থেকে সাত্রাঁগাছি আসা যাওয়া করছি বহুদিন। মাঝেমাঝে বাসেও আসা যাওয়া করেছি। বেশিরভাগ যাওয়া হয় বেসরকারি বাসে। তারপর কোনও কোনও সময় স্টেট বাস। এই রুটিন আমার মতো আরো হাজারো মানুষের। তো প্রতিদিনের চলাফেরায় আমার অভিজ্ঞতার কথাই বলছি। আমার এই লেখায় পুরুষেরা হয়তোবা ক্ষিপ্ত হবেন, রাগান্বিতও হতে পারেন। অনেকেই বলবেন, আপনি কি মশাই ধোয়া তুলসী পাতা? মোটেও না। নারী দেখলে আমারও দুর্বলতা আসে, যেমনটা সবার ক্ষেত্রে হয়। কেননা এটা স্রষ্টা প্রদত্ব একটি স্বাভাবিক ক্রিয়া। তাই বলে অচেনা অজানা কোনও নারী দেখলেই মন চনমন করে ওঠা মনে হয় পুরুষদের কাজ না, তবে হিজড়াদের হলেও হতে পারে। আমার লেখাটি পড়ে বিতর্ক চলুক সব পুরুষ এক না, আপত্তি নেই।

আমাদের দেশে একজন মেয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে কখনও না কখনও কোনো না কোনো পুরুষের লোভী হাত দ্বারা অপমানিত হয়নি। বাসে, ট্রেনে, মার্কেটে, ভিড়ে – সবখানে পুরুষরা ওঁৎ পেতে থাকে – কখন সুযোগ পেলেই কোন মেয়ের শরীর স্পর্শ করা যাবে? এতোই লোভনীয় জিনিস মেয়েদের শরীর যে কোনো ভাবেই লোভ সামলানো যায় না। মেয়ে! শুধু মেয়ে হলেই হলো! চিকন-মোটা, কালো-ফর্সা, লম্বা-বেঁটে, সুন্দরী-অসুন্দরী, বিবাহিতা- অবিবাহিতা, যেকোনো বয়সী, শারীরিক  বা মানসিক প্রতিবন্ধী, পাগল, এমনকি শিশু হলেও আপত্তি নেই। কুকুরের মত ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে। যেকোন ধর্ম, বর্ণ, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, যেকোন আর্থ-সামাজিক স্তরের, বিবাহিত বা অবিবাহিত যেকোন বয়সের বেশীরভাগ পুরুষ মেয়ে পেলেই খুবলে খেতে চায়।

একটা মেয়ে, তার প্রেমিক থাকুক কিংবা স্বামী, সবচেয়ে ভরসার পুরুষটি কিন্তু আজীবন বাবাই থাকবে। এই নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। সুতরাং যে কোন মেয়ে বাসে/ট্রেনে একটি অল্পবয়স্ক অচেনা ছেলের চেয়ে তার বাবার বয়সী কোন লোককে বেশি ভরসা করবে, তার পাশেই বসবে। এটাই কি তাঁদের সবচেয়ে বড় ভুল। বাবার বয়সী সব মানুষ বাবা না। অল্প বয়স্ক ছেলেগুলো বাসে উঠেই হেডফোন লাগিয়ে মাত কাত করে চোখ বন্ধ করে রাখে, ফেসবুকে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কোন মেয়ে তাদের পাশে বসলে তারা পা চাপিয়ে রাখার চেষ্টা করে, খুব সাবধানে থাকে যেন গায়ে গা না লাগে। পারতপক্ষে তারা মেয়েদের পাশে বসেই না! মেয়েরাও তাদের সাথে বসে না, বসলেও আতঙ্কে থাকে। যারা আতঙ্কে থাকেনা তারা একটা বাঘিনী টাইপ দৃষ্টি পাশের যাত্রীর দিকে নিক্ষেপ করে যাতে পাশের ছেলেটি আরো চুপসে যায়। আর কিছু ছেলে উল্টোপাল্টা করার আগে হাজারবার ভাবে কারণ সে জানে যে মেয়ে একবার কিছু বললে পুরো বাসের লোকজন তাকে পিটিয়ে লাশ বানিয়ে ফেলবে। তবে সব অল্পবয়স্ক ছেলেই যে সাধুপুরুষ, তা কিন্তু না!

বেশিরভাগক্ষেত্রে মধ্যবয়স্ক পুরুষেরাই মেয়েদের সেক্সুয়ালি হ্যারাস করে। হ্যা, লজ্জাজনক হলেও এটাই সত্যি। যৌন হয়রানির ১০ জন ভিক্টিমের মধ্যে ৭ জন হয়রানির শিকার হয়েছেন মধ্যবয়স্ক পুরুষদের দ্বারা। বিশ্বাস না হলে হাতে কলমে জরিপ করে নিন। আমার একজন রিলেটিভ নিজেও একবার এক “বাবার বয়সী” লোকের খপ্পরে পড়েছিলেন। একজন ভিক্টিম হিসেবেই তাঁর হয়ে আমি একথা বলছি। তাছাড়া লোকাল বাসে, ট্রেনে ডিজিটাল পুরুষদের হাত ম্যাজিক দেখাতে থাকে সারাক্ষণ। কখনও কাঁধে, কখনও পিঠে, কখনও বুকে, কখনও পাছায়। জায়গা আরও আছে, যা উচ্চারন করে লিখতে লজ্জা লাগলেও হাতাতে তাদের বেশ মজায় লাগে। আর মুখের ভাষা? থাক সে কথা আর নাই বা বললাম। বেশিরভাগ মধ্যবয়স্ক পুরুষ বাসে উঠে এক তরুণীর পাশে বসে তারা তাদের হারানো যৌবন ফিরে পান এবং তারা তাদের সমস্ত সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি সেই মেয়ের বয়সী তরুণীর সাথে রিয়ালিটিতে পরিণত করা শুরু করেন। বাসযাত্রার এক পর্যায়ে তারা মাছের মতো মোচড় দেয়া শুরু করে দেন। পরের ঘটনা তো ইতিহাস!

মেয়েটা প্রথমে হতভম্ব হয়ে যায়। তার মধ্যে একটা ইতস্তত ভাব এসে যায়। পাশে বসা লোকটা তার বাবার চেয়েও বয়সে বড়, লোকটার চোখের চশমাটা তার প্রিয় বড় মামার মতো কালো ফ্রেমের, সেই লোকটা এসব কি করছে? কেউ ভয়ে লজ্জায় চুপ করে থাকে, আর কেউ অগ্নিবীণা রূপ ধারণ করলেও লাভ হয় না। কারণ, “থাক, বয়স্ক মানুষ। আপনার মনে হয় ভুল হয়েছে, কাকা তো আপনার বাপের মতো।” এই ধরণের অজুহাত দিয়ে তারা পার পেয়ে যায়। তখন পায়ের রক্ত মাথা থেকে আবার পায়ে নামানোর জন্য বাড়িতে এসে বালতির পর বালতি ঠান্ডা জল মাথায় ঢালা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। বাড়ির অভিভাবকরাও ভয়ে চুপ থাকতে বলেন। ফলে ফল হয় ভয়াবহ, নিজের মধ্যে চুপসে যেতে শুরু করে অনেক কিশোরী।

এসব মধ্যবয়সী পুরুষেরা কোন এক পুণ্যবতী নারীর স্বামী, একটা ফুটফুটে মেয়ের বাবা, ছেলের বউরের অতি শ্রদ্ধার শ্বশুর, কোন এক মায়ের ছেলে। এদের চোখে কি একটুও লজ্জা নেই? প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা চোখে পড়ে যেখানে অনেক সময় মেয়েটির বয়স এতটাই কম থাকে যে তাকে আসলে শিশুই বলা যায়, তবুও আমাদের হুঁশ হয়না, তবুও আমরা ধর্ষণের পক্ষে খোঁড়া যুক্তি খুঁজি, তবুও নানা দোহাই অজুহাত দিয়ে শালীনতার কথা বলি। এমন অজুহাতের জন্য ধিক্কার, এমন মানুষদের ধিক্কার! আমি পুরুষ, এই পুরুষদের জন্য আমি অত্যন্ত লজ্জিত।