কোলকাতার ভদ্রলোক শ্রেণী ও ভাষা-সাম্প্রদায়িকতা

0

শাহনওয়াজ আলী রায়হান, টিডিএন বাংলা, লন্ডন: আজকে কোলকাতার প্রথম শ্রেণীর একটি দৈনিক ভাষা-দিবসকে কেন্দ্র করে একটি প্রতিবেদনে হিজাবকে কেন্দ্র করে ‘একুশের ঢাকায় কোনও আবরণ নেই হিজাবের’ শিরোনাম দিয়ে লিখেছে। আর কাকতলীয়ভাবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শাহনওয়াজ আলী রায়হান গতকাল ফেসবুকে নীচের পোস্টটি লেখেন-

কোলকাতার ভদ্রলোক শ্রেণী ও ভাষা-সাম্প্রদায়িকতা

“কলকাতার ভদ্রলোক শ্রেণীর বাঙালিদের বাংলা প্রেম অনেকটা বিলেতের সাহেবদের মধ্যবয়সে মাতৃ-পিতৃ প্রেমের মতো। এরা এখানে বুড়ো মা-বাপকে পাঠায় কেয়ার হোমে, আর সারাদিন কুকুর-বিড়ালকে আদর করে! কিন্তু ফাদার্স – মাদার্স ডে’তে কার্ড কিনতে ভুলেনা! কলকাতার আকাশে সারা দুনিয়ার টিভি চ্যানেলের প্রবেশাধিকার, শুধু ওপারের বাংলা চ্যানেলগুলো বাদ!

অথচ ২১শে ফেব্রুয়ারি এলেই ভাষা দিবস -ভাষা শহীদ স্মারক-সালাম-বরকত নিয়ে যত আদিখ্যেতা। জীবনেও কুশমুন্ডীর নাম না শোনা, কলকাতাকেই বাংলা মনে করা, ‘র’ আর ‘ড়’ গুলিয়ে ফেলা, সব শব্দকে গোল গোল করে উচ্চারণ করা এমন একটা শহরের বাঙালি, যেখানে বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড বিরল। ভাষাদিবসে হঠাৎ এত সক্রিয় হয়ে ওঠে কেন?

তসলিমা বা শাহবাগ নিয়ে মাতামাতির মতো এখানেও একটা ‘গুড মুসলিম’ বনাম ‘ব্যাড মুসলিম’ গল্প আছে। বাহান্নতে সেদিন পাকিস্তানের ‘ব্যাড মুসলিম’ গুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সালাম-বরকতরা ‘গুড মুসলিম’ এ পরিণত হয়েছে। ভাষা আন্দোলন যদি নেপালি বা চীনাদের বিরুদ্ধে হতো তবে সেটা কলকাতার এত সমর্থন পেত কিনা সন্দেহ আছে ! যেমন বার্মায় রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন এখনো নন্দন-কফি হাউসের মনে তেমন আঁচড় কাটতে পারেনি । কিন্তু নির্যাতনকারীরা যদি ‘মুসলিম’ হত ? সালাম বরকতের মতো তবে হয়তো অন্তত ভিটেমাটি, ভাষা-সংস্কৃতি আরাকানে আঁকড়ে ধরে রাখতে গিয়ে শহীদ হওয়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলা একাডেমিতে মোমবাতি মিছিল হতো। আমি বলছিনা নির্যাতনকারী মুসলিম হলে ভালো আর অমুসলমান হলে খারাপ।

সেদিন পাক সরকার বাঙালিদের উপর যেটা করেছে সেটা শুধু অমানবিক নয়, অনৈসলামীও। সে যতই ইসলামের নামে পাকিস্তান তৈরি হোক না কেন! কোরানে বলা হয়েছে, ‘তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।’ (সূরা রুম, আয়াত 22) এই বৈচিত্র্যকে সেদিন পাক বাহিনী গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কলকাতার বাঙালিদের না বাংলায় কোরান পড়ার ধৈর্য্য আছে, না বাংলাদেশের চ্যানেল দেখার আগ্রহ। তাঁদের কৌতূহল কি করে সীমান্তের ওপারে একদল ‘গুড মুসলিম’ ইসলাম-উম্মাহ-মক্কা-মদিনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে কলকাতাকে নিজেদের কেবলা (যেদিকে মুখ করে নামাজ পড়া হয়) বানাচ্ছে।

যে কলকাতায় শিলচরের ভাষা শহীদদের ইতিহাস পড়ানো হয়না, বরাকে বাঙালী খেদাও অভিযানের প্রতিবাদ হয়না, মুসলিম আর বাঙালির পার্থক্য করা হয়, সেই শহর আবার ওপারের কিছু হীনমন্য বাঙালির কাছে আজও রোল-মডেল! ওদের চোখেই কলকাতা বাংলাদেশকে দেখে, ওদের মুখেই ওপারে মৌলবাদ-ধর্মনিরপেক্ষতার গল্প শোনে (গুম, হত্যা, রিগিং, তোলাবাজি এসবের না) । ওরা যেহেতু বলেনি তাই এটাও জানে না যে দাঁড়ি-টুপি-লুঙ্গির লোকগুলোই প্রথমে বাংলা ভাষার জন্য পথে নামে পূর্ব পাকিস্তানে। শান্তিনিকেতন ঝোলার অনেক আগেই তমদ্দুন মজলিসের প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমরা বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু করেন।

কোলকাতার ভদ্রলোক বাঙালিরা শুধু আত্মঘাতী না, ঢ্যামনাও। এদের সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্ক রক্তের না, আধিপত্যের। যতদিন না এরা কলকাতার আকাশে ঢাকার টিভি চ্যানেলগুলো দেখানোর দাবিতে পথে নামে , ততদিন এদের ভাষা-দিবসের ফেসবুক পোস্টগুলো ন্যাকামো ভেবে এড়িয়ে যান।”