গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তামা কাঁসার ও পিতলের জিনিসপত্র

0

মুহাম্মদ নূরে আলম, টিডিএন বাংলা: আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্য পিতল-কাঁসা শিল্প। নিত্য নতুন সিরামিক, মেলামাইন, কাঁচ ইত্যাদির সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ পিতল-কাঁসার ব্যবহার একেবারেই কমিয়ে দিয়েছেন। নিকট অতীতেও পিতল-কাঁসা সামগ্রী গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নিত্য ব্যবহৃত হিসেবে দেখা যেতো। বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়ার সাথে সাথে এসবের ব্যবহারে ভাটা পড়েছে।
এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সাথে জড়িত শিল্পী ও ব্যবসায়ীরা বর্তমানে অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছে।  পিতল-কাঁসা শিল্পে জড়িত শিল্পীরা পৈতৃক পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
কাঁসার জিনিসপত্র আমাদের ঐতিহ্য ও বাঙালী সামাজিক জীবনের অন্যতম কালচারের অংশ। প্রায় একদশক আগেও গ্রামগঞ্জে গেলে এসব কাঁসার জিনিসপত্র চোখে পড় তো। বাঙালির গৃহস্থালি ও কৃষ্টির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে তামা, কাঁসা ও পিতলশিল্প। একসময় বিয়ে, খৎনা, জন্মদিন প্রভৃতি অনুষ্ঠানে প্রধান উপহার সামগ্রী ছিল কাঁসার গ্লাস, বাটি, ফুলদানি, চামচ, রেকাব শানকে, গামলা, বেলিবগি, পানদানি, থালা, পিতলের টব, কলসি, বালতি, কড়াই, পানের থালা, ধূপদানি, তামার কলস, হাঁড়ি-পাতিল, পুষ্পপাত্র ইত্যাদি। যেকোনো অনুষ্ঠানেও দেওয়া হতো নাম খোদাই করা এসব কাঁসার । সেসব উপহার স্থান দখল করে নিয়েছে আধুনিক ডিজাইনের চীনামাটি, পাইরেক্স, মেলামাইন, প্লাস্টিক, কাঁচ ও স্টিল। কাঁচামাল কারিগরের অভাবে বাংলা ঐতিহ্য তামা, কাঁসা ও পিতলশিল্প হারিয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে।
বাংলায় এ মিশ্র ধাতব শিল্পটি কখন, কোথায় শুরু হয়েছিল, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়না । তবে শিল্প গবেষক ও নৃবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ একে পাহাড়পুর মহাস্থানগড় সভ্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চান। এই শিল্পকে রামায়ণ-মহাভারতের যুগের বলেও মনে করেন অনেক অভিজ্ঞ লোকশিল্পী।
১৫৭৬-১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল শাসনামলে এ দেশে তামা, কাঁসা ও পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। এসব ধাতু দিয়ে তারা ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুক, বন্দুক ও কামান তৈরি করত। ব্রিটিশ শাসনামলে এ শিল্পের প্রসার ঘটে এবং বাংলার ঘরে ঘরে এর ব্যবহার খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আর এ শিল্পের ছোট-বড় বহু কারখানা গড়ে ওঠে।
নৃবিজ্ঞানীদের তথ্যসূত্রে জানা যায়, এ শিল্পের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সে সময়ের রাজা প্রদ্যুৎ কুমার ঠাকুর। তিনি প্রথম এই হস্তশিল্পের সামগ্রী নিজে ব্যবহার করেন এবং বিভিন্ন রাজা-বাদশা থেকে শুরু করে লন্ডনের রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত এ স্বর্ণোজ্জ্বল রাজকীয় নকশার ডিনার সেট উপঢৌকন হিসেবে রাজপরিবারে পাঠিয়েছিলেন।
১৯৪২ সালে লন্ডনের বার্মিংহাম শহরে সারা বিশ্বের হস্তশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সে প্রদর্শনীতে জামালপুরের ইসলামপুরের কাঁসার বাসন দর্শকের বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর ফলে শিল্পী জগৎচন্দ্র কর্মকার তাঁর হাতে গড়া তৈজসপত্রের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ কাঁসাশিল্পী হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন। এতে করে সারা বিশ্বে কাঁসাশিল্পের পরিচিতি লাভ করে এর চাহিদা দিন দিন আরও বেড়ে যায়।
এসব শিল্পের পণ্যের মধ্যে ছিল পূজার ঘট, ঘণ্টা, তাম্রকু-, জাহাজের ঘণ্টা, গামলা, প্রদীপ গাছা, পিতলের মূর্তি, সংগীতের যন্ত্রপাতি, সন্দেশ পেয়ালা, বেলিবগি, টেডিগ্লাস, রাজভোগ, রাধাকান্তী, হাতঘণ্টা, স্কুলের ঘণ্টা, চাদরে ঘটি, গিনি গ্লাস, বেলেশ্বরী ইত্যাদি।