বিপন্ন ভারতবর্ষের অতীত গৌরব

মহম্মদ আজহারউদ্দিন

মহম্মদ আজহারউদ্দিন, টিডিএন বাংলা:
দেশকাল ভেদে মানুষ অসভ্য, বর্বর থেকে সামাজিক প্রাঙ্গনে ফিরে এল। যুগ-যুগান্তরের স্রোতে মানুষ সভ্য হতে শিখলো। বিজ্ঞানের আবিস্কারও অগ্রগতির শেষ চূড়ায় পৌঁছালো। পৃথিবী প্রান্তে উচ্চশিক্ষার জন্য বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলো। ইতিহাস,
ভূগোল ও রাস্ট্রবিজ্ঞানের পাতা রোমন্থন করে জেনেছি বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য ভারতবর্ষের প্রধান বৈশিষ্ট। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের অধিকার এদেশের সংবিধান স্বীকৃত। ক্ষমতাই রাজনীতির শেষ কথাকে সম্বল করে বিভিন্ন অসাধু ও নীতিহীন রাজনীতিবিদরা বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করলেও এখনো এদেশের আমজনতার বিচারব্যবস্থার প্রতি অটুট আস্থা আছে।

২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার দেশের শাসনভার হাতে নেওয়ার পর দেশের অভ্যন্তরে জাত-পাত থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িকতা বিশেষ করে দলিত-আদিবাসি ও সংখ্যালঘুদের জান-মালের নিরাপত্তা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একদিকে দেশে শিল্প-কলকারখানার চাহিদা নিরিখে গড়ে না ওঠায় যুবশক্তি বেকারত্বে দেশ চরমভাবে ভূগছে অন্যদিকে চাষী তার ফলসের নায্যমূল্য না পাওয়ায় ঋণের দায়ে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। এর প্রাদূর্ভাব থেকে বাংলাও মুক্ত নয়। তারপরেও দেশের নীপিড়ীত মানুষ তা মেনে নিচ্ছে কিন্ত যখন সাম্প্রদায়ীকতা ও গনতন্ত্রহীনতার কালো ছায়া মানুষের মাঝে অবস্থান করে তখন দেশটা সত্যিকার অর্থে পঙ্গু হয়ে যায়।

একদিকে দেশে ফ্যাসিবাদী শক্তির অশুভ পরিকল্পনা অন্যদিকে বাংলার বুকে সততার প্রতীক হয়ে প্রান্তিক মানুষের সরকার বলে উচ্চস্বরে শ্লোগান দিলেও অধিকারহরণে ও নীতিহীনতায় পটু। ফলে দুইশক্তিই বাস্তবিকপক্ষে দেশের জন্য বিপজ্জনক।এক শাসক বাংলায় এল বদলা নয়, বদল চাই-এর শ্লোগানে অন্যদিকে আরেকটি দল দেশে ক্ষমতায় এল আচ্ছে দিনের শ্লোগানে। দুই শ্লোগানই দেশের সার্বিক উৎকর্ষসাধনে সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হয়েছে। দেশে অন্ধভক্তর সংখ্যা তো আর কম নয়, তাই দিন দিন তাদের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে।

একদল আচ্ছেদিনের নামে ফ্যাসিবাদকে মজবুত করে অন্যদলটি ফ্যাসিবাদের জুজু দেখিয়ে নাগরিক অধিকারকে গলাটিপে হত্যা করে। চলতি বছরে বাংলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনের দিনক্ষন ঘোষনা হওয়ার সাথে সাথে বাংলার শুরু হল অধিকার হরণের নারকীয় নাচ। সাংবাদিক থেকে সাধারন আমজনতা এমন কি মহিলা পর্যন্তও তা থেকে ছাড় পেল না। বাংলায় মহিলা নিগ্রহ, শীলতাহানি করে কন্যাশ্রীর চরিত্রকে নস্ট করা হল অপরদিকে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সিং এবং কাশ্মীরের আসিফা নামে একশৈশবকে মন্দিরদের পুরোহিত ও এক পুলিশ অফিসারসহ আরো কয়েকজন যেভাবে ধর্ষন করে হত্যা করলো তা থেকে প্রমানিত যে ‘বেটি বাঁচাও’য়ের শ্লোগান একটা ঢপবাজি। আসলে বর্তমান ভারতবর্ষটি দাঁড়িয়ে রয়েছে হিংসা-বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ও নারকীয় কর্মকান্ডের মধ্যস্থলে।

বাংলা বিপন্নের পথে, দেশ বিপন্নের পথে গনতন্ত্রও বিপন্নের পথে, যখন দেশে মানচিত্রে বুলেট ট্রেন চালানোর প্রস্তুতি প্রায় শেষ মুহুর্তেও মুম্বাইয়ের মতো বানিজ্যিক নগরীতে হাজার হাজার মানুষ রুটি-কাপড়া-মাকানের আন্দোলন করে কি প্রমাণ করেনি যে দেশটা আসলে অন্ধকারের মানচিত্র দিয়েই যাচ্ছে। যে দেশ নাগরিকের নুন্যতম বেঁচে থাকার ব্যবস্থাটুকুও করতে পারেনি সেই দেশ ডিজিটাল করার স্বপ্ন মূর্খামি ছাড়া আর কি হতে পারে? দেশের চলমান পরিস্তিতি একথা বহুবার প্রমান করেছে।

যে বাংলায়, যে ভারতে আদ্যপ্রান্ত বেজে উঠতো মিলনের সুর সেই মানচিত্রে শুরু হয়েছে বিভেদের উৎসব, হয়েছে নৈতিকতার পদস্খলন। আসানসোলের ঘটনা তার বড় প্রমাণ। আশার আলো যে দেরিতে হলেও কলকাতার রাজপথে প্রতিবাদের মিছিলে পা মিলিয়েছে।বাংলার ছেলে হারানোর শোকার্তবুকে বিভেদকে রুখে দিয়ে ইমাম রশিদী সম্প্রীতির বার্তা বাংলার শান্তিপ্রিয় মানুষের বুকে আশা আলো জাগিয়েছে।

কিন্ত যা যথেষ্ট নয়, আমাদের ও পথে নামতে হবে। এই বৃহৎ অপরাধ যেভাবে ছড়িয়ে রয়েছে তাতে গুটিকয়েক মানুষের শান্তির বার্তা মরুভুমির দুই এক ফোঁটা জলের মতো। অপরাধীরা যদি একত্রিত হয়ে দেশজুড়ে অপরাধ সংঘটিত করে ক্ষমতা কায়েম করতে চায় তাহলে শান্তির পক্ষে আমরা কেন নই? পথে নামুন, আওয়াজ তুলুন, বাংলা রক্ষা করুন, দেশ রক্ষা করুন, নয়তো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অপরাধী হয়ে কাপুরুষের মতই বেঁচে থাকতে হবে আমাদের। ক্ষমা করবেনা তারাও। আমাদের পথে নামা কি বিবেকের দাবি নয়? আসুন আমরা বিবেকানন্দ, রবীন্দ্র, নজরুলের দেশকে রক্ষা করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে অতীত গৌরবান্বিত মর্যাদাকে রক্ষা করি।