ভারতীয় মুসলিমদের আধুনিক শিক্ষার অগ্রদূত স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁনের জন্মদিনে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন

আলি আকবর, টিডিএন বাংলা : ভারতীয় দার্শনিক। জন্মনাম সৈয়দ আহমেদ তাকভি, সাধারণত স্যার সৈয়দ নামে সমধিক পরিচিত।জন্ম : ১৭ অক্টোবর ১৮১৭। মৃত্যু : ২৭ মার্চ ১৮৯৮। ভারতের একজন বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ যিনি ভারতের মুসলিমদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেন। তিনি এই কাজের জন্যই মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিতি লাভ করে। তার চিন্তাধারা ও কাজকর্ম সেখানকার মুসলিমদের মধ্যে একটি নতুন চেতনার জন্ম দেয়, তার প্রভাবে প্রভাবান্বিত এই মুসলিম বুদ্ধিজীবীরাই পরবর্তীতে আলিগড় আন্দোলনের সূচনা করেন যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলিমদের অধিকার নিশ্চিত করা।

 

 

আলিগড় আন্দোলনের প্রবর্তক ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁ। পিছিয়ে পড়া মুসলমান সম্প্রদায়কে যুক্তিবাদী আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁ উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে যে আন্দোলনের সূচনা করেন তা আলিগড় আন্দোলন নামে খ্যাত। ভারতীয় মুসলমান সমাজ এযাবৎ সকল প্রকার সংস্কার আন্দোলন থেকে দুরে সরিয়ে রেখেছিলেন। ইতিপূর্বে ওয়াহাবি ও ফরাজি আন্দোলন হলেও তা রক্ষণশীল মুসলিম সমাজকে স্পর্শ করেনি। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহের পর অনগ্রসর মুসলিম সমাজে কিছু কিছু সংস্কারের প্রয়োজন অনুভূত হয়। হিন্দুদের তুলনায় অনগ্রসর পাশ্চাত্য শিক্ষায় উদাসীন মুসলিম সমাজের দুরবস্থার কথা স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁ অবগত ছিলেন। স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁ ইংরেজি ভাষার মাধমে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে প্রগতির যথার্থ সোপান বলে মনে করতেন, তাই তিনি মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রসারে উদ্যোগী হন।

শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে আলিগড় আন্দোলনের প্রভাবে বলা যায় যে, ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি গাজিপুরে একটি ইংরেজি স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেন। ইংরেজি ভাষায় লেখা মূল্যবান কিছু কিছু বই উর্দু ভাষায় অনুবাদ করে তা মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করার উদ্দেশ্যে তিনি বিজ্ঞান সমিতি নামে একটি সংস্থার প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি মুসলমানদের মন থেকে পাশ্চাত্যের ভয় ভীতি দূর করার জন্য ও মুসলমানদের মধ্যে উদারনৈতিক ভাবধারা প্রচারের জন্য ‘তাহজিব-উল-আখলাক’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে কমিটি ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অফ লার্নিং নামে একটি সংস্থারও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে মে মাসে আলিগড়ে তিনি মহামেডান অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজের প্রতিষ্ঠা করেন। এই কলেজটিই পরে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত হয়। ইংরেজ শিক্ষাবিদগণের তত্ত্বাবধানে এই কলেজে কলা ও বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও প্রগতিমূলক মনোভাবের উন্মেষ ঘটানোর ক্ষেত্রে এই কলেজের অবদান অস্বীকার করা যায় না। আন্দোলন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে তাদের আধুনিক যুগোপযোগী ভাবধারায় দীক্ষিত করেছিল।এই আন্দোলন ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে যুক্তিবাদের প্রসার ঘটিয়ে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামি পরিত্যাগেও সাহায্য করেছিল। এই আন্দোলন মুসলিম সমাজে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি, নারী শিক্ষা প্রসারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আলিগড় আন্দোলনের প্রভাবে বলা যায় যে, আলিগড় আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটাতে সাহায্য করে। মুসলমান সমাজের সংস্কার সাধনে স্যার সৈয়দ আহমদের অবদান স্মরনীয়। এক্ষেত্রে তিনি রাজা রামমোহন রায়ের সমগোত্রীয় ছিলেন। রাজা রামমোহন রায়ের মতো স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁও মুসলিম সমাজে বহু বিবাহ, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি তুলে দেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছিলেন। আলিগড় আন্দোলনের অবদান প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার মন্তব্য করে বলেছেন যে, ‘উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিন্দুদের কাছে যা ছিল, আলিগড় আন্দোলনও ছিল মুসলিমদের কাছে ঠিক তাই।’