ভাগাড়ের মাংস শরীরের পক্ষে কতটা ক্ষতিকর ও ইসলামের নির্দেশ

0

পাঠকের কলম, টিডিএন বাংলা: পশ্চিমবঙ্গের প্রধান আলোচ্য বিষয় ভাগা‌ড়ের মৃত ও পচা মাংস । পাড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, অলিতে গলিতে সর্বত্রই এই আলোচনা। রাজ্যের বিভিন্ন বাজারে, হোটেলে, শপিং মলে ও রেস্তোরাঁয় দীর্ঘ দিন ধরে মরা পশুর পচা মাংস বিক্রির কারবার যে রমরমা চলছিল তা এখন স্পষ্ট। আর এটা স্পষ্ট হবার পর থেকেই হোটেল গুলো থেকে কাস্টমারের সংখ্যা কমে গেছে। কিন্তু এতকাল ধরে সময় অসময়ে বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁই, রাস্তার ধারে ফাস্ট ফুডের স্টলে মাংস খেয়েছে অনেকেই। তাহলে কি তারা ভাগা‌ড়ের পচা মাংস খেয়েছে? অনেকের মনে আতঙ্ক এই পচা মাংস শরীরের কোনো ক্ষতি করেনি তো?
একটা প্রবাদ আছে, নিজের ভাল পাগলেও বুঝে। জেনে নেওয়া যাক ভাগা‌ড়ের পচা মাংসে কি কি ক্ষতি হতে পারে।

ডা: রাজা ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, পচা মাংসের মধ্যে বিভিন্ন পরজীবী, ছত্রাক জন্মায়। সেগুলো মানুষের পেটে গেলে বিভিন্ন রোগ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া কিছু ব্যাক্টেরিয়া জন্মায়। যেমন- সালভোনেলা, ইকোলি। এসব খেয়ে গ্যাস্ট্রোএন্টেবাইসিস বড় আকারে হলে সব অঙ্গই ক্ষতি হতে পারে। জিআই সিস্টেম, কিডনি, হার্টের উপর প্রভাব পড়ে। রোগী অচৈতন্য হয়ে যেতে পারে। যদি এই মাংসের সাথে টক্সিন থাকে তাহলে কিডনি ইনজুরি, এমনকি লিভার ড্যামেজও হতে পারে। এমনকি মালটিঅর্গান ফেলিওর হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

চিকিৎসক অভিজিত বন্দোপাধ্যায় জানিয়েছেন, টক্সোপ্লাজমোসিস হল একটা পরজীবী, এটা সাধারণত বিড়ালের মধ্যে থাকে এবং বিড়ালের বিষ্ঠার মধ্যে বেশি পাওয়া যায়। ইতিমধ্যেই গত ছ’মাসে প্রায় তিন শতাধিক রোগী এসেছেন যাদের মধ্যে টক্সোপ্লাজমোসিসের অস্তিত্ব মিলেছে। এই রোগের উপসর্গ হল ঘাড়ের কাছে ফুলে যাওয়া, আচমকা জ্বর, গ্রান্ড ফোলা। এই রোগ যদি শরীরে বাসা বাধে তবে গর্ভবতীর ক্ষেত্রে ভ্রণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। এছাড়াও ভাগা‌ড়ের মাংস তাজা রাখার জন্য ফরমালিন অথবা সোডিয়াম-মেটা-বাই সালফেট ব্যবহার করা হয়, যা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক । বিশেষজ্ঞদের মতে এধরনের কেমিক্যাল মেশানো মাংস খেলে শ্বাস কষ্ট, কাশি, আলার্জির মতো অসুখও হতে পারে।

আসুন, মৃত,পচা মাংস সম্পর্কে ইসলামের জীবন বিধান জেনে নিই। ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী মৃত পশুর মাংস এবং আল্লাহ্‌র নাম না নিয়ে জবাই করা পশুর মাংস খাওয়া অবৈধ। কোনো হোটেলে মাংস ভাত বা চিকেন বিরিয়ানি খাওয়ার আগে অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত, যে মাংস খাচ্ছি সেটা হালাল পশুর কিনা? ভাগা‌ড়ের মৃত পশু কিনা? সেটা আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে জবাই হয়েছে কিনা ইত্যাদি।

মহান আল্লাহ্‌ বলেন- “তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে মৃতজীব, রক্ত, শূকরের গোস্ত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর নামে যবেহকৃত জীব এবং কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে, আহত হয়ে, ওপর থেকে পড়ে গিয়ে বা ধাক্কা খেয়ে মরা অথবা কোন হিংস্র প্রাণী চিরে ফেলেছে এমন জীব, তোমরা জীবিত পেয়ে যাকে যবেহ করে দিয়েছো সেটি ছাড়া।…তবে যদি কোন ব্যক্তি ক্ষুধার জ্বালায় বাধ্য হয়ে ঐগুলোর মধ্য থেকে কোন একটি জিনিস খেয়ে নেয় গুনাহের প্রতি কোন আকর্ষণ ছাড়াই, তাহলে নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী।”[সূরা মায়িদা : ৩]

আল্লাহ্‌র নাম না নেওয়ার মধ্যে গোশতের গন্ধ, স্বাদ কিংবা ফিজিক্যাল কোন পার্থক্য হয়তো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু সৃষ্টিগত দিক থেকে জীবনের সাথে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই বিশ্ব জগতে যা কিছু আছে সকলেই আমরা আল্লাহ্‌র সৃষ্টি। সৃষ্টি হিসেবে ভেড়া, ছাগল, মুরগি সকলের প্রাণই সমান। একজন সৃষ্টির অধিকার নেই আরেক সৃষ্টিকে হত্যা করার। তা করতে পারা যায় কেবল স্রষ্টার বিধান অনুসারে। সে বিধান হল এক সৃষ্টির জন্য আরেক সৃষ্টিকে হালাল/বৈধ করা। আমরা যে ছাগল, মুরগি খাচ্ছি সেটা স্রষ্টা স্বয়ং এই অধিকার আমাদের দিয়েছেন। স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টি বলয়কে চলমান , অব্যাহত রাখার জন্যেই এক সৃষ্টিকে আরেক সৃষ্টির ভোগ্য বানিয়েছেন। মানুষ খাবে মুরগি, মুরগি খাবে পোকা-মাকড়, পোকা-মাকড় বাঁচবে অন্য কিছু খেয়ে । এভাবে সৃষ্টির সবাই বাঁচবে, সৃষ্টি জগৎ থাকবে চলমান। সুতরাং আমরা যে সমস্ত হালাল পশুর মাংস খাচ্ছি তা স্রষ্টার দেয়া বিধান অনুসারে খাচ্ছি। এই বিধানকে স্বীকৃতি দেয়া, স্মরণ করার জন্যেই ভোগ্য প্রানীকে জবাই করতে আল্লাহ্‌র নাম নিতে হয়। এই অপরূপ সৃষ্টি দর্শন প্রতিটি মুসলিম মেনে চলে।

আজও বেশ কিছু মুসলিম ভাই-বোনও এব্যাপারে উদাসীন। তারা অসচেতন ভাবেই যে কোনো হোটেলে দিনের পর দিন মাংস ভাত, চিকেন বিরিয়ানি খেয়ে চলেছে। এটা ছাড়তে হবে। একমাত্র জীবন বাঁচানোর তাগিদে আল্লাহ্ ছাড় দিয়েছেন। আপনার খিদে পেয়েছে আপনার রুচি সম্মত যে কোনো হোটেলে খান, কিন্তু যদি সন্দেহ হয় মাংসটা ভাগা‌ড়ের মৃত ও পচা কিংবা আল্লাহ্‌র নাম নেওয়া হয়নি তাহলে এড়িয়ে চলুন, দূরে থাকুন। আপনি মাছ,সব্জি, ডাল দিয়ে খান। কেন আপনি শুধু শুধু আল্লাহ্‌র বিধান লঙ্ঘন করবেন?

পরিশেষে, সকলের উদ্দেশ্যেই বলছি কোনো হোটেলে বা বাড়িতে যে মাংস খাচ্ছেন অবশ্যই আপনার সচেতন হওয়া আবশ্যিক মাংসটি হালাল হচ্ছে কিনা? মাংসটি মৃত পশুর কিনা? যে পশুর মাংস সেটা আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে জবাই হয়েছে কিনা? সকলেই সচেতনতা অবলম্বন করুন, সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

আতিফ আসলাম রাজু
থানারপাড়া, নদীয়া