তৃতীয় বিশ্বের দেশে “হোলি ডে’র কি সত্যিই প্রয়োজনীয়তা আছে?

0
সাহিত্য জানার জন্য চশার, মিল্টন, বার্নাড শ,
শেক্সপিয়ার, ডিকেন্স, সুইফট, ইলিয়ট, ব্লেক, ওয়ারওয়েল, পিন্টার, ক্লোরিজ, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, বায়রন, শেলি,কীটস, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল, বঙ্কিম, শরৎ, ত্রয় বন্দ্যোপাধ্যায়,  জীবনানন্দ, জসীমুদ্দিন প্রভৃতি সাহিত্যকদের জানলাম।
ইতিহাসের মানচিত্রে, সিন্ধ, হরপ্পা, মেসোপটেমিয়া, ব্যবেলিয়ন, রোম, স্পেন, তুরস্ক,গ্রীক,মিশর, ইউরোপ, সর্বোপরি ভারতবর্ষের ইতিহাস জানলাম। এই শাসকদের সম্পর্কে একটু একটু করে জেনেছি তারপরে জানলাম, যেটা সবার আগে জানা দরকার  সাহিত্য, বিজ্ঞান ও সমাজের নানা মতবাদ। যেখানে সমস্ত রহস্য উন্মোচিত হতে শুরু করলো। জগতের ছোঁয়া ছোঁয়া মানচিত্রের পথ পাড়ি দিয়ে হাজির হলাম ‘পোস্ট-কলোনিয়ালে’র ঘন অন্ধকার গলিতে।
এখানে এসে ধরা পড়ল যুগ-যুগান্তরের মানবসভ্যতার  নানা অজানা রহস্য।
একবিংশ শতাব্দীতে ডুরান্ড, ম্যাকমোহন, র‍্যাডকিলিপের সীমারেখার দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারলাম, আমাদের মানচিত্রটা  তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলা হচ্ছে কেন?  হ্যাঁ এটাই আমাদের প্রাপ্য। কন্ঠে আমাদের সারাজীবন উচ্চারিত হয়েছে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধের ধ্বনি,বিবিধের মাঝে মিলনমহান এবং তা বিশ্বে সমাদিতও হয়েছে।কিন্ত আমাদের বিজ্ঞানের আবিষ্কার, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, আমাদের সভ্যতা রঙ, জাত-পাত ও সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজাল থেকে বেড়োতে পারে নি। রঙের মিল না থাকার জন্য মেধার বিকাশ ঘটেনি। অশিক্ষিত,শিক্ষিত কেউ একশ শতাংশ কুসংস্কারকারের  বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেনি। যেটা ইউরোপে হয় না। এদেশের মানুষের কাছে মানুষের থেকে ধর্ম বড়ো। তাই মানুষ মেরে স্বর্গে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে তৃতীয় বিশ্বের দেশের মানুষের কাছে একটা ঐতিহ্যস্বরুপ।
আমাদের দেশে একটা শ্রেণি আছে যাদেরকে খুব উদার,বিজ্ঞানমনস্ক মনে হয় ধর্মের ব্যাপারে তারা বাড়াবাড়ি করেনা। তারা ধর্ম ও ধর্মান্ধ কোনোটাই  প্রশ্রয় দেয়না। কিন্ত তারা বিজ্ঞানের সব ধারণাকে স্থায়ী মনে করে। বিজ্ঞানের কিছু ধারণা যে চলমান।সেটা তারা মানতে পারে না। ফলে ধর্মান্ধের মতো বিজ্ঞানান্ধ হয়ে হয়ে। ধর্মের ঠিক-ভূলের সবটাকেই ভূল হিসাবে দেখায় আবার বিজ্ঞানের ভূল-ঠিককে ঠিক হিসাবে দেখায়। যার জন্য স্বাভাবিকভাবে দুইভাবনা দ্বন্দের দুই মেরুতে অবস্থান করে। আইনস্টাইনের মতো বিখ্যাত একজন বিজ্ঞানী কি বিজ্ঞান আর ধর্মের সমন্ময় ঘটায়নি? বস্তুবাদ যেমন জ্ঞানের জন্ম দেয় তেমনি অধ্যাতিকতা মানবিকতা বা বিবেকের জন্ম দেয়। ধর্মের সব গ্রহণ করে যদি মানুষ বেঁচে না থাকে তাহলে বিজ্ঞানের সবটা গ্রহণ করে মানুষ কিভাবে বেঁচে থাকে? আমরা ধারাপাতা ৯ য়ে নবগ্রহ পড়ে এসেছি এখনও কি ৯টায় গ্রহ আছে? তাহলে আজকে বিজ্ঞান যা বলল কালকে সেটা পরিবর্তন হতে পারে।পরিবর্তনশীল বিজ্ঞানকে স্থায়ী আসন দিয়ে নিজেকে বিজ্ঞানমনস্ক ভাবাটা বিজ্ঞানন্ধের সামিল নয় কি?
অপরপক্ষে সচেতন,উদার,ভরপুর সাহিত্যচেতনা, বিজ্ঞানমস্ক, চরম মানবতাবাদি কিছু মানুষ দেখা যায় যারা টয়লেট  করে কোনো জল  আর না টয়লেট পেপার কিছুই ব্যবহার করেনা বর্জ্যপদার্থ গায়ে মেখে ঘুরে বেড়ায়। অথচ তার বিজ্ঞানে অগাধ বিশ্বাস। আবার এই দেশে গোমূত্রের মতো  বর্জ্যপদার্থকে মহাঔষধ ও পবিত্র মনে করে । আসলে আমরা জ্ঞানের দরজা সব সময় খোলা রাখি না। তাই জ্ঞান বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে একদিকে যেমন ধর্মান্ধ বাড়ছে তেমনি আরাকদিকে বিজ্ঞানন্ধও বাড়ছে। আমরা কি পারি না বিজ্ঞানের ভালো দিক আর ধর্মের ভালো দিকগুলোকে কাজে লাগিয়ে সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে। কারণ ধর্মের জন্মতো মানুষ্য জাতিকে পথ দেখানোর জন্য যেটা আইস্টাইনের মত একজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানীও অস্বীকার করেনি।
আমাদের দেশ ভারতবর্ষে হাজার হাজার ঋষী-মনিষীর জন্ম হয়েছে  যেখানে তাদের সম্মান জানাতে গিয়ে মিটিং, মিছিল হরতাল বাদ দিয়েও ১৫০দিন ছুটি ঘোষনা করতে হয়। যেখানে ইউরোপে রবিবার ছাড়া ছুটি ঘোষনা করা হয় না। ইউরোপে কি মহান ব্যক্তিদের জন্ম হয়নি? আমাদের এত মহান ব্যক্তির জন্ম হয়েছে যে আবার ইউরোপ ছাড়া আমরা এককদম ও এগোতে পারি না কেন?  তাহলে আমাদের মহত্বের গুরুত্ব কি?এপিজে আব্দুল কালামের মতো মহান মানুষ কি বলে যায়নি  আমার জন্ম -মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা করবে না। তাছাড়া এত মহাপুরুষের জন্ম-মৃত্যু দিবস পালন করলেতো ৩৬৫ দিনই বন্ধ হয়ে যাবে। এই জন্য তো আমরা ইউরোপিয়ানদের থেকে অন্তত ১০০ বছর পিছিয়ে।
এখানেই কি তাহলে তৃতীয় বিশ্বের দেশের স্বার্থকতা?
আমরা পিছিয়ে পড়বো না কেন?  আমাদের দেশে জাতিবিদ্বেষ থেকে জাতীয়তাবাদের জন্ম হয় আর জাতীয়তাবাদ থেকে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম হয়। আমাদের দেশে বুদ্ধিজীবির একটা ধারণা আছে বেশ তাদের কদরও আছে। ইউরোপে কোনো বুদ্ধিজীবির ধারণা নেই। কারণ তাদের দেশে অনেক বুদ্ধি কে কাকে পরিমাপ করবে। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিদের বৈশিস্ট্য হল রাজনৈতিক পদ না পাওয়া পর্যন্ত পোস্টারে ম্যাগাজিনে সেটে থাকবে। বিধায়ক, সাংসদ, মন্ত্রী হয়ে গেলে বুদ্ধিজীবী থেকে মুক্তি। আমাদের দেশের সাহিত্য ও ইতিহাস কলহ, বিবাদ, হিংসা ও সাম্প্রদায়িকতার চারাগাছ হয়ে সামাজিক ভারসাম্য নস্ট করে।যে যত বড় খুনি, অর্থ আত্মসাতকারী, বড় সসমাজবিরোধী, বড় মূর্খ সে তত বড় পদের অধিকারি। এবার বলুন ইউরোপ এগোবে না এশিয়া এগোবে?
ভারত,পাকিস্থান ও বাংলাদেশের পাঠ্যক্রমের চাপে স্টুডেন্টসরা  হাঁসফাস করে। সকালে শিশু মানসিক উত্তেজনা নিয়ে ঘুমায় আর মানসিক উত্তেজনা নিয়ে বিছানা ছাড়ে। তাদের পরেও আমাদের  তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির শিক্ষার্থীকেন্দ্রীক। আমাদের বাচ্চাদের প্রতিভার কাউন্সিলিং না করে পিঠে বইয়ের বোঝা বহন করে।তাকে ইংরেজি পড়তে ভালো লাগলে জোর করে ভুগোল পড়া, ইতিহাস ভালো লাগলে রাস্ট্রবিজ্ঞান পড়ায়, ম্যাথ ভালো লাগলেও অবিভাবকের চাপে, বায়োলজি পড়গে হয়। কিন্ত সমস্যাটা হয় মাঝ পথে। রেল্ট খারাপ করে। খারাপ স্টুডেন্টের তকমা গায়ে সেটে যায়।মানসিক ডিপ্রেশন তৈরি হয়। পরিচেষ সেই ছাত্র আর বাড়তে পারে না। যেটা প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে এমনটা হয় না।
কানাডার মানুষ রাজনীতি করতে চাই না।সেই দেশের মানুষ কাজ বুঝে উন্নয়নের স্বার্থে তারা দেশের কর্মপদ্ধতি করে।আর আমাদের দেশের মানুষ রাজনীতিকে পেশা মনে করে। গদি দখলের লড়াইয়ে মানুষ হত্যা করে। রাজনীতিবিদরা পুঁজিপতিদের সুবিধা করে দিয়ে আমজনতার সম্পদ লুট করায়। যেমন আমরা বিজ্ঞানের চর্চা  করি তেমনি অযৌক্তিক ভাবনারব চর্চা করি।মানুষ রাস্তাঘাটে তাবু টাঙিয়ে ঘুমালেও গরু শীত-তাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চাপে।
আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, কানাডার মানুষরা আমাদের দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করতে আসে না কিন্ত আমরা ভারতবাসীরা সেই দেশগুলোতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করতে যায়। আমাদের সাহিত্য তাদের দেশে তেমন চর্চা না হলেও তাদের সাহিত্য আমাদের দেশে বহুলচর্চিত। আমাদের এখানেই উন্নয়নশীল  আর তৃতীয় বিশ্বের দেশের স্বার্থকতা। এরপরেও হইতো মেরা দেশ মহান হয়ে বেঁচে থাকবে গগনচুম্বী  গর্বে।
(মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। এ বিষয়ে টিডিএন বাংলা কতৃপক্ষ কোনওভাবে দায়ী নয়)