আফরিদা খাতুন আঁখি, টিডিএন বাংলা : বর্তমান পরিস্থিতিতে সমগ্র নারীকূলের কাছে ‘ভারত’ নামক ভূখণ্ডটি ত্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ বাসা গেড়ে আছে সেইসব নরপিশাচের দল যাদের কাছে নারী মানেই ভোগের বস্তু। এই সমস্ত নরখাদকের কাছে অপরিণত যৌবনের অধিকারী ৭ বছর বা তার কম বয়সী কোন শিশু বা প্রায় ঝরে পড়া যৌবনের অধিকারী ৯০ বছর বা তার থেকে বেশি বয়স্কা এর মধ্যে কোন পার্থক্যই বিদ্যমান নয়। এদের যৌন ক্ষুধা মেটাতে নারীর ছাপ আছে এমন কোন দেহ হলেই চলে যাবে। ভেঙে পড়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির অধিকারী বর্তমান ভারতবর্ষ আর সব দিক থেকে পিছিয়ে গেলেও বিশ্বের দরবারে ধর্ষণের কারণে বুঝি ‘শ্রেষ্ঠ আসন’ অলংকৃত করেছে। এ কথা একজন ভারতীয় নারী হয়ে নির্লজ্জের মত স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। আজ বিশ্ব দরবারের কাছে ভারত মানেই এমন একটা দেশ যেখানে রয়েছে ধর্ষকদের আস্তানা। আর এই কারণেই কমেছে ভারতের মত ঐতিহ্যবাহী দেশে বিদেশি নারীদের আনাগোনা।

তবে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা ধর্ষণ নামক এই জঘন্য অপরাধের ব্যাপারে দেশবাসী তথা বিশ্ববাসী যে সম্পূর্ণ রুপে নীরব এটা বলা কোন দিক থেকেই বাঞ্ছনীয় নয়। এই পৈশাচিক বর্বরতার প্রতিবাদে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সামিল হতে দেখা গিয়েছিল সকলকেই। দেশের আমলা থেকে সাধারণ, ধনী থেকে গরীব, ছোটো থেকে বড়ো, স্বাভাবিক থেকে প্রতিবন্ধী সকলেই সে দিন ‘জাস্টিস ফর আসিফা’ এই স্লোগানে মুখরিত হয়েছিল দেশের অলি আর গলিতে। বিদেশের মাটিতেও বয়েছিল ধিক্কার আর সমবেদনার সাইক্লোন। কিন্তু এত মিছিল আর প্রতিবাদ কী বাঁচাতে পারলো বিদ্যা কে? মৌন মিছিলের মৌনতা কী হিংস্রতাকে চৌচির করে রক্ষা করতে পারলো সংস্কৃতি কে? মোমবাতি মিছিলের আলো কি রুমাইয়া কে টেনে আনতে পারলো মৃত্যুর অন্ধকার গহ্বর থেকে? না! কোন কিছুই পারেনি ধর্ষণকে রুখতে।

এখন ভাবার বিষয় যে দেশের জনগণ এত সরব সেই দেশে ধর্ষণ নামক পৈশাচিক ঘটনা কমার পরিবর্তে কীভাবে বেড়ে চলেছে দ্রুত গতিতে? বিশেষজ্ঞরা হয়তো এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মতামত পেশ করবেন। কিন্তু একটু সময় নিয়ে ব্যাপারটা পর্যালোচনা করলে আপনার আমার মতো সাধারণ মানুষদেরও কারণটা বুঝতে খুব একটা জটিল হবেনা। গর্বের এদেশে ধর্ষণের শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদন্ডকে বলবৎ করা হয়নি। পর্ণগ্রাফী নামক মগজ ধোলাইয়ের উৎকৃষ্ট মাধ্যমকে নিষিদ্ধ করা হয়নি যার কারণেই ভারতবর্ষের বুকে ধর্ষণের মত বর্বর অপরাধ বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন। কিন্তু ধর্ষকদের অনুপ্রেরণা দানকারী পর্ণগ্রাফী নিষিদ্ধ করার মত সৎ সাহস সরকারের নেই।

আর হ্যাঁ সেই সমস্ত সিনেমার তারকাদের বলতে চাই আপনারা যারা আসিফার নিয়ে বড়ো বড়ো তত্ত্বকথা বলেছিলেন, সিনেমাতে চুম্বন দৃশ্য বা ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় না করলে আপনারা নিজেদেরকে সমাজের সামনে স্যেকুলার বা আলট্রা মর্ডান হিসাবে উপস্থাপন করতে পারবেন না এটা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বর্তমান নারী সমাজ এই দূষিত বাতাস থেকে একটু হলেও অক্সিজেনের সন্ধান পাবে। এটা খুবই খেদের সাথে জানাতে হচ্ছে যে পর্ণগ্রাফীকে যদি সমাজ থেকে নির্মূল না করা হয় এবং সিনেমাগুলিকে যদি মার্জিত না করা হয় তাহলে সেদিন খুব বেশি দূরে নয় যেদিন ধর্ষকদের দলে হাজির থাকবে একটি কন্যার পিতা, একটি মায়ের পুত্র, একটি বোনের ভাই। কারণ পর্ণগ্রাফী বদলে দেয় মানুষের চিন্তাভাবনা, বিবেক এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে। সে দিন হয়ত পিতৃক্রোড়ও নিরাপত্তা হীনতায় ভুগবে চরম ভাবে।

এটা ভাবলে অবাক হতে হয়, যে দেশে নিছক সন্ত্রাসবাদ সন্দেহ মাত্রই এনকাউন্টেরের আইন জারি করা আছে, সে দেশে দোষী সাব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও ধর্ষকদের সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে যাবৎ-জীবন কারাবাসের ঊর্ধ্বে কিছু নেই। যে পুরুষটা একটি নারীর দেহকে ছিঁড়ে খায় তার কীভাবে বাঁচার অধিকার থাকতে পারে? ধর্ষক হোক ছাই টিকির অধিকারী,
হোক সে টুপি-দাড়ির অধিকারী, হোক ছাই ক্রুসের অধিকারী, হোক ছাই সে গেরুয়া বসনের অধিকারী তার একমাত্র পরিচয় সে একজন নারীখাদক। আর নারীখাদকের এ দেশে তথা সমগ্র বিশ্বের কোথাও বাঁচার অধিকার থাকতে পারেনা। যুগের দাবি মেটাতে ‘বেটি বাঁচাও-বেটি পড়াও’ এই স্লোগানের পরিবর্তে ‘ফাঁসি পে লাটকাও-অউর বেটি বাঁচাও’ এই স্লোগানই বুঝি এখন বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।

ধর্ষণ নামক পৈশাচিক ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ভারতবর্ষের বুকে আজ শুধু নারীদের নিরাপত্তাই নয়, নিরাপত্তার সাথে অস্তিত্ব রক্ষাও বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। আর সবার মত আমিও এটা বলতে বাধ্য ধর্ষণকে না রোখা গেলে নারীকে স্কুল-কলেজ ছেড়ে সোপিসের মত আলমারী বন্দি হতে হবে। এ দেশের সরব নাগরিক হিসাবে এবার আসুন বিদ্যা, রুমাইয়া, আসিফা, নির্ভয়া বা জেসিকার জন্য ভিন্নভাবে না হেঁটে আর যাতে কোন যুবতীকে নির্ভয়ার বাস্তবতার সম্মুখীন না হতে হয়, আর কোন শিশুকে আসিফার মত দংশনের শিকার না হতে হয় তার জন্য গর্জে উঠি ‘আইন বদলের’ প্রতিবাদে। কাজটি কঠিন হলেও অসম্ভব কিছু নয়। তবে এই আন্দোলন হতে হবে লাগাতার। হুজুগের বশে মোমবাতি হাতে নিয়ে কয়েক পা হাঁটার পরবর্তিতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ। একশো ত্রিশ কোটি সরব জনগণ থাকা সত্ত্বেও যদি ভারতবর্ষের বুকে ধর্ষক নামক নরপিশাচদের বাঁচার অধিকার থাকে উচ্ছন্নে যাবে এ সমাজ তথা এদেশ। যে দেশের সমাজে নারীদেহকে ভোগ লালসা মেটানোর বস্তু হিসেবে দেখা হয় সে দেশের মাটিতে নারীর জন্মানোই অপরাধ। পৃথিবীর বুকে বেড়ে ওঠা এক নারীকে ছিন্নভিন্ন করার পরিবর্তে তাকে মাতৃগর্ভেই দাফন করা বুঝি কম নৃশংসতার পরিচয় দেয়।