ভারতের মাটিতে সমকামিতার ছাড়পত্র আসলেই কী যুক্তিযুক্ত?

0
আফরিদা খাতুন আঁখি

আফরিদা খাতুন আঁখি, টিডিএন বাংলা : সম্প্রতি বিশ্বের কয়েকটি দেশের সাথে ভারতবর্ষের সুপ্রিম কোর্ট দিল সমকামিতাকে বৈধতার স্মারক। সমকামি সহ যারা এই রায়কে সমর্থন করছে তাদের কাছে এই রায় সম্ভবত দীর্ঘ ১৫৮ বছরের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের জয়। তাদের মধ্যে আজ বাঁধ ভাঙা খুশির জোয়ার। সমকামে লিপ্ত ব্যাক্তিরা গোপনীয়তার অবগুণ্ঠন ফেলে এসেছে প্রকাশ্যে।

সমাজের যে সিংহভাগ মানুষ আজ নিজেদের ‘মুক্তমানা’ হিসাবে পরিচয় দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের ৩৭৭ ধারার বৈধতার রায়কে সমর্থন করছে, তারা যে সকলেই সমকামী এটা ভাবাটা নিছক এক ভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই না। সমাজের গুটি কয়েক মানুষ সমকামী। আজ যে সমস্ত ভদ্রমহাদয়গণ নিজেদের ‘মুক্তমানা’ হিসাবে প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে এই রায়ের বৈধতা কে সমর্থন করে চলেছেন, তাদের অধিকাংশই সমকামিতার উপকারিতা বা অপকারীতা ব্যাপারে যে বিন্দুমাত্র অবগত নন তা জোর গলায় ব্যাক্ত করা যায়।

সমকামিতার উপকারিতা বিশ্লেষণ করা হলে, স্বল্প সংখ্যাক মানুষ সমলিঙ্গের সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে মানসিক সুখ লাভ করে, এটা ছাড়া আর কোন প্রকারই উপকারিতা বুঝি বিদ্যমান নয়। কিন্তু এই একটি মেকী উপকারিতাকে চূড়ান্ত প্রাধান্য দিতে গিয়ে কত প্রকার যে ভয়াবহ অপকারীতার আগমন ঘটানো হচ্ছে তা একটু বিশ্লেষণ করলেই টের পাওয়া যাবে। এই মারাত্মক পরিণতির ফলে একটি সুস্থ সামাজ যে ভয়ংকর পরিণতির সম্মুখীন হতে চলেছে তা স্মরণে আসলেই মারাত্মক আশংকায় ভিতরটা কেঁপে ওঠে।

সমকামিতার ফলে এইডস, গনোরিয়া,হেপাটাইটিস সহ বেশ কিছু মরণাত্মক রোগ মহামারি রুপে ছড়িয়ে পড়বে খুব সহজেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে দুই বিপরীত লিঙ্গের দুই ব্যক্তির যৌন মিলনের ফলে এইডস ছড়িয়ে পড়লেও তার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু সমলিঙ্গের দুই ব্যক্তির যৌন মিলনের ফলে এইডস মারাত্মক হারে ছড়িয়ে পড়ে। আমেরিকা থেকে প্রকাশিত Centre for Disease Control and Prevention (CDC) নামক মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালের পর থেকে অর্থাৎ আমেরিকাতে সমকামিতা বৈধতা স্বীকৃতি হওয়ার পর থেকে এইডস রোগের বৃদ্ধি ঘটেছে মারাত্মক হারে এবং আরো বিস্ময়কর এইডসে আক্রান্ত ৫৬ শতাংশের অধিক মানুষ সমকামী।

প্রায় সব ধর্মই সমকামিতাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে বহু পূর্বেই। কেবল ধার্মিক নিষেধাজ্ঞার জন্যে নয় সমকামিতা স্বাস্থ্যহানীকরের সাথে একটি সুষ্ঠ পরিবার তথা সমাজের জন্য বিরাট হুমকির থেকে নেহাত কম কিছু নয়। যা সম্পূর্ণ রূপে বদলে দিতে পারে একটি সমগ্র জাতির পরিচয়। এই বিশ্বসংসারে যা কিছুই বৈধ তারই গোপনে লুকিয়ে আছে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অতি বিচক্ষণ এক তত্ত্ব, যা একটু পর্যালোচনা করলেই আমাদের সামনে এসে খুবই স্বচ্ছ ভাবে ধরা দেয়।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে- ভ্রমর, প্রজাপতি সহ বেশ কিছু পতঙ্গ কেবল তাদের তৃপ্তি বা আশ মেটানোর কারণেই ফুলের মধু শোষণ করে- এটা ভাবা হবে সম্পূর্ণরূপে নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। পতঙ্গের ফুলের রস শোষণের মাধ্যমে পতঙ্গের চাহিদা পূরণ হওয়ার সাথে সাথে পরাগরেণুর মিলনের মাধ্যমে উদ্ভিদের বংশ বিস্তার ঘটাতে সহায়তা করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। অনুরূপ ভাবে মানব দেহের স্ত্রী এবং পুরুষ যৌনাঙ্গকে সৃষ্টি করা হয়েছে এরকম ভাবে যাতে দুই বিপরীত লিঙ্গের মিলনের ফলে তৃপ্তি লাভের সাথে সাথে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।

কিন্তু সমকামের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সম্পূর্ণ রূপে লঙ্ঘিত হয়। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম লঙ্ঘিত হলেই তার পরিণামের কুফল সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। সমকামে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে ক্ষণিকের প্রশান্তি লাভ হলেও পরিবেশের ভারসাম্য কোন যুক্তিতেই রক্ষিত হয়না। আর সমকামীরা যে শুধু সমকামী তা না তারা সমকামীর সাথে সাথে উভয়কামীও এটা কোনভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

এই রায়ের সর্মাথকরা তাদের যুক্তিকে প্রাকৃতিক নিয়ম হিসাবে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যে কিছু পশুরা সমকামে লিপ্ত এই উদাহরণ উপস্থাপন করেছে। কিন্তু পশুরা চিরকালই জোর করে সঙ্গমে অভ্যস্ত আর মানব সমাজে জোর করে সঙ্গম ধর্ষণের সমান যা দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই পশুদের সাথে মানব সমাজের তুলনা করা এক্ষেত্রে চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার সমকামিতার বৈধতার যুক্তিকে জোরালো করার উদ্দেশ্যে সমকামকে ‘By Born’ বা ‘জন্মগত’ প্রবৃত্তি হিসাবে যুক্তি খাড়া করা হয়েছে।

কিন্তু তথ্যসূত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিলক্ষিত হয় সমকামিতা এক প্রকার মানসিক ব্যাধি। সাধারণত ব্যাক্তি পরিপার্শ্বিক চাপ বা কোন ব্যক্তির প্ররোচনায় এই কর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়, CDC এর তথ্যসূত্রে পাওয়া গেছে যে সমকামিতাতে লিপ্ত সর্বাধিক মাত্র ১৩-২৪ বয়স এটা দেখলে ধরণাটা স্বচ্ছ হয়। ১৩ বছরের নেহাত যে শিশুরা স্বাভাবিক যৌনকর্ম ব্যাপারে সম্পূর্ণ রুপে অন্ধকারে থাকে সেখানে তারা কীভাবে সমকামিতার ব্যাপারে অবগত হতে পারে? কিছু মুক্তমনা বিজ্ঞানীদের মতে অপরাধ করার প্রবণতা সম্পূর্ণ রূপে জিনগত। কিন্তু তাদের এই যুক্তিকে খণ্ডন করা সত্ত্বেও কোন দেশের আইনই কোন মানুষকেই খুন করাকে বৈধতা স্বীকৃত দেয়নি ।

সমকামিতা গুটি কয়েক মানুষের প্রশান্তি বা তৃপ্তির কারণ আর এই গুটি কয়েক মানুষের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে সমগ্র দেশে এটিকে বৈধতা ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের কোন দিক থেকে যুক্তিযুক্ত হতে পারে? সমকামিতাকে বৈধতা দেওয়া হলে ধর্ষণ ও পর্ণগ্রাফীকেও তাহলে বৈধতা দিতে হয়! সমকামীদের মতোই ধর্ষকরাও তো ধর্ষণের মাধ্যমে এবং পর্ণগ্রাফীর দর্শকরা পর্ণগ্রাফী দেখে আত্মিক শান্তি লাভ করে। স্বাধীনতা বা প্রগতিশীলতা কখনোই অবাধ হতে পারে না। এর একটা মাপকাঠি থাকা প্রয়োজন। আপনার বাক স্বাধীনতা আছে তার মানে এটা না কাওকে আপনি বাক স্বাধীনতার নামে গালি দেওয়ার স্বাধীনতা রাখবেন।

ভারতবর্ষের মাটিতে সমকামিতাকে বৈধতা ঘোষণা করার মাধ্যমে নিজেদের পাশ্চাত্য রঙের মোড়ক দেওয়া বৈ আর কী হতে পারে? সমকামিতাকে বৈধতা স্বীকৃতি দেওয়ার আগে সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনা করা একান্ত প্রয়োজন ছিল যে দেশ ভেদে আইনের তাৎপর্যের মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা। ২০১৭সালের ২১শে নভেম্বর ফ্রান্সে ‘পেডোফিলিয়া’ নামক এক ধরনের যৌন পদ্ধতিকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। ‘পেডোফিলিয়া’র মাধ্যমে কোন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যাক্তি কোন শিশুর সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত হওয়ার অধিকার পায়। কিছু নীচ মানসিকতার মানুষের যৌন লালসার ইচ্ছাকে ফ্রান্সের মাটিতে বৈধতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ‘পেডোফিলিয়া’র জনক রির্চাড ডিক্নেসের মতে শিশুদের সাথে অল্প পরিমাণে যৌন কর্মে লিপ্ত হলে কোন প্রকার অপরাধের বিষয় নয়।

ভবিষ্যতে ফ্রান্সের মত ভারতকে ‘মুক্তমানা’র মোড়কে মুড়তে গিয়ে যদি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট ‘পেডোফিলিয়া’ কে ভারতের মাটিতে বৈধতা ঘোষণা করে তাহলে সেটা কী সুপ্রিম কোর্টের নিকৃষ্টতার পরিচয় হবে না উৎকৃষ্টতার পরিচয় হবে? অতীত থেকেই ভারতে সমকামীতার প্রচলন ছিল তা অস্বীকার করা সম্ভব নয়, কিন্তু তা সংঘটিত হত গোপনে। আর নিষিদ্ধ কাজ যখন বৈধ হয় তখন তা গোপনীয়তার অবগুণ্ঠন ছিঁড়ে ফেলে প্রকাশ্যে পূর্বের তুলনায় অধিক পরিমাণে সংঘটিত হয়।

যে ভারতবর্ষে আজও প্রতিনিয়ত দেনা মাঝির মত মানুষদের অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে অসুস্থ প্রিয়জনের লাশকে হাসপাতাল থেকে ফেরত আনতে হয়, সেই দেশের মাটিতে বৈধতার স্মারক দিয়ে এইডসর মত মরণাত্মক রোগকে মহামারি রুপে আহ্বান করা কোন দিক থেকে যুক্তিযুক্ত? যে ভারতীয় সমাজে পর্ণগ্রাফীর ভয়াবহ ফলস্বরুপ আজ পরিবারের কন্যারা নিজ গৃহেই যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, সেই দেশে সমকামিতাকে বৈধ ঘোষণা করে পরিবারের সন্তানদের সমলিঙ্গের হাতেই নির্যাতিত হওয়ার পথ কী উন্মুক্ত করলনা মহামন্য সুপ্রিম কোর্ট? স্বল্প পরিমাণ মানুষের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আজ ভারতের ঐতিহ্য, সমাজ , পারিবারকে ঠেলে দেওয়া হল ধ্বংসের মুখে।