স্থাপত্যকলায় সর্বোচ্চ সম্মান ‘প্রিৎস্কার প্রাইজ’ অর্জন করেন প্রথম মুসলিম নারী জাহা হাদিদ

0
তাঁর নকশা করা ভবনগুলো সময়ের তুলনায় এতই অগ্রগামী যা আধুনিক স্থাপত্য কৌশলে বিপ্লবের নামান্তর। সেগুলোর বাস্তবায়ন করা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ছিল। তাঁর নকশা করা ভবনগুলোর অধিকাংশই প্রচলিত ভবনের চেয়ে বরং ভাস্কর্যের সাথে বেশি তুলনীয়। ভবনগুলোতে কোণ এবং সমতলের পরিবর্তে বক্রতলের ব্যবহারের জন্য ব্রিটিশ পত্রিকা ‘গার্ডিয়ান’ তাঁকে ‘বক্রতার রানী’ উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি জাহা মোহাম্মদ হাদিদ যিনি জাহা হাদিদ নামে পরিচিত। জন্ম ইরাকের বাগদাদে ১৯৫০ সালের ৩১ অক্টোবর।
স্থাপত্যকলার কিংবদন্তী স্থপতি ও শিল্পী, বিশ্বের সাম্প্রতিক কালের স্থপতি-তারকা (স্টার আর্কিটেক্ট) গোষ্ঠীর একমাত্র নারী স্থপতি, এবং প্রিত্জ্কার আর্কিটেক্ট ২০০৪-এ পুরস্কারপ্রাপ্ত স্থাপত্যশিল্পী হিসেবে যিনি তাঁর বিস্ময়কর সৃজনশীলতার  উপর ভর করে ছাড়িয়ে গেছেন সব সীমান্ত গন্ডির বেড়াজাল। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে করেছেন অনন্য সুন্দর সব সৃষ্টি সমগ্র বিশ্ব জুড়ে ।
স্থাপত্যচর্চায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য হাদিদ ২০১০ এবং ২০১১ সালে দু’দুবার আর্কিটেকচারে ব্রিটেনের সবচেয়ে সম্মানজনক ও অভিজাত পুরস্কার ‘রিবা স্টারলিং পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার পরের বছর ২০১২-তে তিনি ডেইম কমান্ডার অব দি অর্ডার অব দি ব্রিটিশ এম্পায়ার (ডিবিই) পুরস্কারে সম্মানিত হন এবং নিজের কৃতকর্মে অনন্যতার স্বাক্ষর রাখার জন্য রয়াল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস্ (রিবা) স্বর্ণপদক লাভ করেন। এই ডিবিই পুরস্কারটি হাদিদ স্থাপত্যশিল্পে নিদর্শন রাখার জন্য তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে লাভ করেছিলেন। এর আগে ২০০২-এ কমান্ডার অব দি অর্ডার অব দি ব্রিটিশ এম্পায়ারও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৫ সালে তিনি ব্রিটিশ-মুসলিম পুরস্কার পেয়েছিলেন বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে সার্বিক অবদান রাখার জন্য।
স্থান ও বস্তুর গঠনগত ধ্যান ধারণা ও গতানুগতিক জ্যামিতিক ভাবনা ও তার নিয়ম-কানুন সব ভেঙে চুরে তিনি সৃষ্টি করে ছিলেন স্থাপত্যশিল্পের নতুন এক ধারার । সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বিখ্যাত ছিলেন এই স্থপতি। স্থাপত্যকলার সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে জাহা হাদিদ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এক সীমাহীন উচ্চতায় ।
সমস্ত অর্থেই তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী এক চরিত্র। একই সাথে একজন মুসলিম ও নারী হিসেবে নয়, বরং তিনি তাঁর কর্মগুণেই ছিলেন ব্যতিক্রম। এক ও অদ্বিতীয়া। অন্যান্য অনেক কিছুর মতোই পুরুষশাসিত স্থাপত্যশিল্পের জগতে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সমকালে তাঁর কাছাকাছি যাবার যোগ্য স্থপতি খুব কমই আছেন।
বর্তমান স্থাপত্যশিল্পে উত্তর-আধুনিকতার সূত্রপাত হয় মূলত জাহা হাদিদের হাত ধরেই। সমকালীন আভা-গার্ড স্থাপত্য কলার সাথে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিকতার মিশ্রণে তিনি জন্ম দেন নতুন এক শিল্পভাবনার যাকে বলা হয় প্যারামিট্রিজম। এক্ষেত্রে তিনিই অগ্রদূত। স্থিতিমাপ নকশার ব্যবহার ও স্থিতিমাপ সমীকরণের সীমাবদ্ধতার উপর ভিত্তি করে উদ্ভভাবন করেন এই প্যারামিট্রিজমের। প্রথমে হাতে কলমে নকশা প্রণয়ন করলেও পরে বিশেষ ধরনের কম্পিউটার সফটওয়্যার ব্যবহার করে এই শিল্পকে আরও উন্নতরূপ দেন জাহা হাদিদ।
বিমুক্ত আবার কখনো খন্ডিত জ্যামিতিক ভাবনা একই সাথে তরল অবয়ব সৃষ্টিকারী। জাহা হাদিদের অভিনব সব স্থাপত্য সৃষ্টিকর্ম অত্যন্ত ভাবপূর্ণ এবং সদূরপ্রসারী যেগুলোকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁর শিল্পগুলি আধুনিক জীবনের নানান জটিলতা ও নিরন্তর পরিবর্তনকেই নির্দেশ করে। তিনি যেমন একদিকে প্যারামিট্রিজমের অগ্রদূত অন্যদিকে নব্য-ভবিষ্যবাদের আইকন। ঠিক তেমনি একই সাথে মুক্তচিন্তা ও দুর্দান্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর এই যুগান্তকারী ভাবনা ও কর্মের নিদর্শন হিসেবে পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে।
শুরুতে হাদিদ যে ধরনের স্থাপনার কথা বলতেন সেগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করা হতো। তবে সে হিসাব পাল্টে দেয় হাদিদের চিন্তার প্রথম ফসলটি। জার্মানির ভাইল আম রাইন শহরে অবস্থিত আসবাবপত্র প্রস্তুতকারক ভিটরার দমকল অফিসটিই হাদিদকে আলোচনায় নিয়ে আসে।
তাঁর নানা কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলো হচ্ছে, রোমের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি আর্ট, হংকংয়ের দ্য পিক ক্লাব, কার্ডিফ বে অপেরা হাউস, সুইজারল্যান্ডের নিউ সিটি ক্যাসিনো অব ব্যাসেল, অস্ট্রিয়ার ব্রিগসেল স্কি জাম্প, জার্মানির বিএমডব্লিউ সেন্ট্রাল বিল্ডিং, আমেরিকার কনটেম্পরারি আর্টস সেন্টার অন্যতম। লন্ডনের মিলেনিয়াম ডোমে মাইন্ড জোনের মতো উঁচু মানের ইন্টেরিয়র ডিজাইন তিনি করেন। ফ্লুইড ফার্নিচার সৃষ্টি করা এবং জেড কার নামক হাইড্রোজেন কার তারই নকশায় তৈরি। ২০০৭ সালে ইতালির আসবাবপত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বি অ্যান্ড বি ইতালিয়ার ফার্নিচারেরও তিনি নকশা করেন।
পিতলের ট্রাই ফ্লো-তাঁরই সহযোগিতায় বাস্তবতা লাভ করে। লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত তাঁর  জাহা হাদিদ আর্কিটেকটসে ৩০০-এর বেশি কর্মী কাজ করছেন। বিশ্বের ৪৪টি দেশে ৯৫০টির মতো প্রকল্পে তিনি কাজ করেছেন। বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বস-এর সেরা ১০০ ক্ষমতাশালী নারীর তালিকায় নাম আছে জাহা হাদিদের। ২০০৯ সালে তিনি বিবিসির রেডিও সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠান টুডের অতিথি সম্পাদক হিসেবেও নির্বাচিত হন ।
মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছেন এমন কিছু কাজের মধ্যে একটি জাহাজ আকৃতির হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির একটি ভবন। সেখানে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অব ডিজাইন’ বিভাগটি অবস্থিত। হংকং যে দিন দিন এশিয়ায় ডিজাইন শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে, ভবনটির এ রকম নকশার মাধ্যমে সেটাই নাকি তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। এ ছাড়া ঢেউ খেলানো আজারবাইজানের ‘হায়দার আলিয়েভ সংস্কৃতি কেন্দ্রটি যে কাউকে চমকে দেবে। তাঁর নকশায় বিস্ময়ে দম বন্ধ করে দেওয়ার মতো ভবন রয়েছে ইতালিতে। যে ভবনের বারান্দা ঝুলছে ২ হাজার ২৭৫ মিটার উঁচুতে। ইতালির ক্রোনপ্লাৎস পর্বতের চূড়ায় পাহাড় কেটে একটি জাদুঘর তৈরি করেন।   এ ছাড়া রাইনহোল্ড মেসনার নকশা করেন হাদিদ। আধুনিক নকশায় তিনি অসাধারণ কৌশলগত  চমক দেখিয়েছেন। তেমনই একটি বেইজিং এর ‘গ্যালাক্সি সোহো’। ১৫ তলা বিশিষ্ট চারটি উঁচু ভবন। এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যাওয়ার জন্য হাঁটার রাস্তা ও ফুটব্রিজ তৈরি করা হয়েছে।
লন্ডনের ২০১২ অলিম্পিকের একুয়াটিক্স সেন্টার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রড আর্ট মিউজিয়াম, চীনের গোয়াংঝোউ অপেরা হাউজসহ বহু আশ্চর্য স্থাপনা তাঁর বিস্ময়কর সৃজনশীলতার সাক্ষ বহন করছে। কাতারে নির্মিত হচ্ছে তাঁর নকশা অনুযায়ী ২০২২ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম একটি ভ্যেনু আল-ওয়াকারাহ স্টেডিয়াম।
জাহা হাদিদ নতুন ধরণের বিপ্লবী চেতনার আধুনিক স্থাপত্যকর্মে বিশ্বাস করলেও ছিলেন ইতিহাস-সচেতন। পৃথিবীর যে দেশের জন্যই তিনি স্থাপত্য নকশা করেছেন সেই দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে জেনেশুনে এবং অন্যান্য প্রাচীন স্থাপনার কথা মাথায় রেখে রীতিমতো গবেষণা করেই তা করতেন। আর এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। নির্মিতব্য আল-ওয়াকারহ স্টেডিয়ামের নকশার অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন কাতারের ঐতিহ্যবাহী বিশেষ একধরণের নৌকার ডিজাইন থেকে যা কিনা কাতারি ‘ঢেউ নৌকা’ নামে পরিচিত।
তিনি কেবল বিপ্লবী ও সাহসী চিন্তার অধিকারীই ছিলেন না, বরং তাঁর ভাবনাকে তিনি কর্মের মাধ্যমে অবকাঠামোগত রূপ দান করতেও সক্ষম হয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, যেকোন নতুন বা বিপরীত ভাবনা ও পরিবর্তনকে প্রথমেই মানুষ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। ইরাকি-ব্রিটিশ স্থপতি জাহা হাদিদকেও নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাঁর নতুন ধরনের স্থাপত্যশিল্পকে তারই সমসাময়িক অন্যান্য স্থপতিদের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। এমনকি দীর্ঘদিন তাঁর প্রণীত নকশাগুলো আলোর মুখ দেখেনি। নানা বাধার মুখে সেগুলোর বাস্তবায়ন বন্ধ ছিল অনেকদিন। এমনকি ৯০এর দশকে কাডির্ফ বে অপেরা হাউজ নকশা তৈরির প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হবার পরেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি, কারণটা সেই একটাই: গতানুগতিক ধারার বাইরের নতুন ধরনের সুপ্রশস্ত এই স্থাপত্য নকশাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি তাঁর সমসাময়িক বিরোধী অন্যান্য সঙ্কীর্ণতাবাদী স্থপতিরা। এর ফলে মানসিকভাবে আহত হলেও পিছু হটেন নি জাহা হাদিদ। তিনি তাঁর নতুন ভাবনা নিয়েই কাজ করে যেতে লাগলেন। ফলাফল ১৯৯৪ সালে তাঁর প্রথম নকশাটি বাস্তবায়িত হয় জার্মানিতে। ভেইল আম রেইনের ‘ভিটরা ফায়ার স্টেশন’। অনেকটা বিধ্বস্ত বিমানের মতো দেখতে ঐ নকশাটি ছিল একটি সাহসী জ্যামিতিক ভাবনার ফসল। স্থাপত্যবিশারদদের মতে, “এটি স্পষ্টতই স্থাপত্যকলার আলঙ্কারিক শক্তির একটি যথার্থ উদারহরণ, একই সাথে বিনয়ী ও চিত্তাকর্ষক” যার সূচালো বারান্দার জ্যামিতিক নকশাটি বেশ সঙ্কেতপূর্ণ। বারান্দাটি দেখলেই মনে হবে, সে চিৎকার করছে অগ্নিনির্বাপক যোদ্ধাদের উদ্দেশ্য করে, যেন বলছে, “জরুরী”! কেননা, এই বারান্দা দিয়েই অগ্নিযোদ্ধারা দ্রুতবেগে ছুটে বেরিয়ে যাবে দুর্ঘটনাস্থলের উদ্দেশে। ভবনটি এখন জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রক্তেই ছিল তার বিপ্লব। ব্যতিক্রমী আর যুগান্তকারী ভাবনাতো তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রেই বর্তেছে। ইরাকের বাগদাদ নগরীর এক অভিজাত পরিবারে জন্ম  জাহা হাদিদ-এর। পিতা মোঃ আলহাজ্ব হুসায়েন হাদিদ ছিলেন মশুলের একজন অবস্থাপন্ন ব্যবসায়ী। একজন রাজনীতিবিদ। মা ওয়াইজা আল-সাবুনজি একজন নামকরা চিত্রশিল্পী ছিলেন। ১৯৬০ এর দশকে কিশোরী জাহা উন্নত শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ইউরোপে। ইংল্যান্ড আর সুইজারল্যান্ডের বোর্ডিং স্কুলে পড়াশুনা করেন। লেবাননের বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সটিতে গণিতের পাঠ চুকিয়ে লন্ডনের স্কুল অব আর্কিটেকচার-এ অধ্যয়ন শুরু করেন। এই সময় তিনি বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ স্থাপত্যবিদ ও বিশেষজ্ঞদের অধীনে কাজ করার সুযোগ পান। এরপর থেকেই শুরু হয় বর্ণাঢ্য সৃষ্টিশীল কর্মজীবন। ১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে সেদেশের নাগরিকত্ব দেয়। একজন প্রভাববিস্তারকারী সম্ভাবনাময় স্থাপত্যবিদ হিসেবেই তিনি নাগরিকত্ব লাভ করেন। আশির দশকের শেষ দিক থেকে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করতে থাকেন। ১৯৮৮ সালে নিউইয়র্ক শহরে মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট-এ স্থাপত্যকলায় তাঁর নতুন ভাবনাগুলি নিয়ে এক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ঐ এক প্রদর্শনীর মাধ্যমে পৃথিবী পরিচিত হয় এক যুগান্তকারী স্থপতির সঙ্গে।
এখন ইউরোপ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া এশিয়া সবখানেই নির্মিত হয়েছে তাঁর নকশায় চোখ ধাঁধানো অভিনব সব স্থাপনা। তবে এই সাফল্য পেতে তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে এক বন্ধুর পথ।শেষ পর্যন্ত নিজের কর্মগুণ আর যোগ্যতা বলেই হাসিল করতে পেরেছেন শ্রেষ্ঠত্বের সেরা আসনটি।
জাহা হাদিদের নকশা করা স্থাপনাগুলো প্রতিটিই একটি থেকে আরেকটি সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। এমনকি একটি অভিন্ন কাঠামোর নির্মাণশৈলী এমন যে এর নিজের একটি অংশের সাথে অন্য অংশের কোন মিল নেই। পুরো স্থাপনাটাই এমন গতিশীল যে শুরু থেকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে পরিবর্তন হতে হতে একটি নির্দিষ্ট অবয়ব লাভ করে যা কিনা মানুষকে নিয়ে যায় ঘোর লাগা প্রথাবিরোধী এক পরাবাস্তব জগতে ।
শহুরে একঘেয়ে নিম্নমানের নকশার অসংখ্য ভবনের চেয়ে সুপ্রশস্ত সুবিশাল নান্দনিক ভবন স্থাপন ও এর জন্য বিনিয়োগ করাকে তিনি ফলপ্রসূ মনে করতেন। ফলে জাহা হাদিদ ঐসব ভবনের জন্যই নকশা করতে পছন্দ করতেন যে ভবনগুলি মানুষের নগর জীবনের অংশ হয়ে উঠবে। যে ভবন ব্যবহার করবে নগরের সকল মানুষ। করেছিলেনও তাই। হতে পারে সেটা ব্যয়বহুল তবুও ব্যক্তিগত অসংখ্য ঘিঞ্চি স্থাপনার তুলনায় সমষ্টির ব্যবহার আর সুবিধাভোগের জন্য একটি সুবিশাল সুন্দর স্থাপনাকে তিনি গুরুত্ব দিতেন। এর ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জয়ী হয়ে নিজের নকশাকে বাস্তব অবয়ব দিতে হয়েছে। জাহা হাদিদের নকশার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বেশিরভাগ সময়ই সেগুলো থাম বা স্তম্ভবিহীন থাকে। ছাদ রক্ষা করে ভবনের জেড আকৃতির কোণগুলো। ভবন নির্মাণে মূল উপকরণ হিসেবে তিনি বেছে নেন কাচ, স্টিল, কংক্রিট, ফাইবার গ্লাস। হাদিদ সবসময় প্রথমে ভবনের অভ্যন্তরীণ নকশা করতেন। তারপর করতেন ভবনে মানুষের চলাচল ও যাতায়াতের পথের নকশা। আর এসবের উপর ভিত্তি করে বাইরের নকশাটা করতেন। বহুমুখী প্রতিভার সমন্বয় ঘটেছিল হাদিদের ব্যক্তিত্বে। তাঁর সৃষ্টিকর্মগুলিতে গণিত, জ্যামিতি, অ্যালগোরিদমের জ্ঞান, স্কেচ আর অংকনশৈলির নিপুণতা, নিখুঁত রেপ্লিকা নির্মাণ, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির উপযুক্ত ব্যবহার ও স্থানিক অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত হয়েছিল প্রকৃতিকে দেখার অনন্য এক দৃষ্টিভঙ্গি আর বিশ্লেষণের ক্ষমতা।
পৃথিবীর বিশাল বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল তাঁর স্থাপত্যসমূহ। আরবের মরুভুমি ও বালির সঙ্গে ইউরোপের পর্বতমালা, উপত্যকা, নদী ও সমুদ্রের জল, ঢেউ, সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল তাঁর প্রতিটি কাজে। দেখা মেলে মহাকাশের নক্ষত্রের স্নিগ্ধতা আর উজ্জ্বলতার। এছাড়া আছে আলো-আঁধারের খেলা। বাঁক আর রেখাচিত্রের বিশালতা ছিল তাঁর স্থাপনাগুলির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই জন্য তাঁকে বাঁকের সম্রাজ্ঞী ( Queen of the Curve) বলা হয়।
ইউরোপের প্রাচীন ক্যাথেড্রেলগুলি থেকে প্রেরণা নিয়ে জার্মানির উলফসবার্গ ফিয়ানো সায়েন্স সেন্টারের ভবনটির নকশা করেছিলেন জাহা হাদিদ। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থাপত্য কলার এ এক সম্মোহনী সৃষ্টি। যে-কারো মনে হতে পারে ভবনটি বুঝি আধুনিক একটি চার্চ। জাহা হাদিদ চার্চ বানিয়েছেন বটে, তবে এটি বিজ্ঞানের চার্চ। এমনকি তাঁর শৈল্পিক ভিন্ন ধরণের জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার করে ভবনের অভ্যন্তরীণ সজ্জাতেও নান্দনিক পরিবর্তন এনেছেন। তিনি এসব নকশার ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন ধরনের আসবাব, নৌকা, গৃহ সজ্জার সামগ্রী, পেইন্টিংস ও নানা প্রকার গহনা ও জুতা তৈরিতে। সম্পূর্ণ নতুন ডিজাইনের এসব উপকরণ তাঁকে আরো জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল।
পৃথিবীর প্রায় সবকটি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে তিনি স্থাপত্যকলার উপর পড়িয়েছেন। শিক্ষক হিসেবে তরুণ স্থপতিদের কাছে তিনি ছিলেন  অত্যন্ত জনপ্রিয়। শিক্ষকতাকে ভালবাসতেন জাহা। একজন অগ্রজ হিসেবে নিজের অর্জিত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা অনুজদের মাঝে বিলিয়ে দেয়াই ছিল তাঁর শিক্ষকতার মূল উদ্দেশ্য যাতে নতুনেরা আরো বেশি যোগ্য ও কর্মক্ষম হয়ে উঠতে পারে যতটুকু যোগ্য বলে তারা নিজেদের ভেবে থাকে। একজন নন-ফিকশন লেখক হিসেবেও জাহা হাদিদ ছিলেন অনবদ্য। স্থাপত্য কলায় তাঁর অর্জিত জ্ঞান অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি রচনা করেছেন এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি গুরত্বপূর্ণ গ্রন্থ।
২০০৪ সালে স্থাপত্যকলায় সর্বোচ্চ সম্মান প্রিতজকার পুরস্কার অর্জন করেন যা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত। প্রথম কোন মুসলিম এবং নারী হিসেবে জাহা হাদিদ এই পুরস্কার জয় করেন। এবং অবশ্যই নিজের যোগ্যতা বলেই তিনি তা অর্জন করেন ।
অসাধারণ মেধা এবং সৃষ্টিশীল মননশীলতার সঙ্গে কঠোর অধ্যবসায় ও পরিশ্রম তাঁর অর্জনের তালিকায় যোগ করেছে একের পর এক সম্মাননা পুরস্কার ও খেতাব। তবে স্থাপত্যশিল্পের মতো একটি পেশায় নারী হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জনের জন্য সবচেয়ে বেশি যে গুণটি তাকে সাহায্য করেছে তা সম্ভবত তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা আর মনোবল। সর্বশেষ মৃত্যুর কিছুকাল আগে ২০১৬ রিবা’স গোল্ড মেডেল লাভ করেন।  সেটিও প্রথম নারী হিসেবেই। এই স্বর্ণপদক যতটা না প্রাপ্তি তারচেয়ে বেশি তাঁর অধিকার। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিতা জাহা হাদিদ ছিলেন ভীষণ রুচিশীল। পোষাকে আভরণে সুসজ্জিত স্টাইলিশ। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক জরিপে তিনি ‘বেস্ট ড্রেসড’ খেতাবও জয় করে নিয়েছিলেন । জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও তিনি ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী নারীদের একজন। ছিলেন সেরা অনুপ্রেরনাদায়ক ব্যক্তিত্বদের অন্যতম। ফোর্বস ম্যাগাজিন, বিবিসি’সহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের জরিপে বিভিন্ন সময়ে উঠে আসে তাঁর নাম।
ব্রঙ্কাইটিসের চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩১ মার্চ ২০১৬ তারিখের সকালে ফ্লোরিডার মিয়ামি হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে জাহা হাদিদ এই পৃথিবী ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে যান।
সময়ের তুলনায় পৃথিবীর সৌন্দর্যকে তিনি অনেকখানি এগিয়ে রেখে গেছেন। ব্যাপারটা বিস্ময়করই বটে। ৩১ অক্টোবর ২০১৫ তে নিজের ৬৫তম জন্মদিন পালনের পাঁচ মাস পর জাহা হাদিদ মারা গেলেন ৩১ মার্চ ২০১৬তে। জন্ম মৃত্যুর তারিখের সংখ্যাগত এই কাকতালীয় মিলের মাঝের সময়টুকুতে তিনি সেইসব কাজ করে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন যা তাঁর সমকালে খুব কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। এই সময়ের ভেতরে তিনি আমাদের ভবিষ্যতের পৃথিবীকে দেখিয়ে গিয়েছেন। তাঁর স্থাপনাগুলি বলে দেয় ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অবকাঠামোগত রূপ কেমন হবে। সেগুলি আমাদের নিয়ে যায় সুদূর ভবিষ্যতের মহাকাশ যুগে।
মারা যাবার মাসখানেক আগে বিবিসি রেডিও’কে দিয়ে যান তাঁর সর্বশেষ সাক্ষাৎকার। নিজের স্থাপত্যকর্ম সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার কখনো মনে হয় না আমি এই প্রতিষ্ঠানিকতার অংশ। আবার এও মনে হয় না আমি বাইরের কেউ, আমি ঠিক এর প্রান্তে অবস্থান করি। অনেকটা কিনারা ধরে ঝুলে থাকার মত আনতশিরে। এবং আমি এটাই পছন্দ করি…আমি কখনোই এই প্রতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে নই। আমি শুধু তাই করি যা আমি করতে চাই, ব্যস এতটুকুই”।
জাহা হাদিদের আকস্মিক মৃত্যু ছিল বর্তমান পৃথিবীর স্থাপত্যকলার আকাশ থেকে সূর্যের ন্যায় এক নক্ষত্রের পতন। তাঁর মৃত্যুর পরদিন পৃথিবীর তাবৎ গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের জানানো শোকবার্তায় ভরে উঠেছিল দ্য নিউইয়র্কার, দ্য গার্ডিয়ান-এর মতো পত্রিকাগুলোর পাতা।সমগ্র পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাঁর  অনুসারী নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান স্থপতিরা। তাদের কর্মেই টিকে থাকবেন জাহা। সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা চিরকালের আপোষহীন অনন্য প্রতিভাধর এক সত্ত্বা।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, দ্য নিউ ইয়র্কার, জাহা হাদিদ অফিসিয়াল ওইয়েবসাইট ও অন্যান্য।