সিরিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষের লাশ আর শিশুদের কান্না প্রমান করেছে, বিশ্ব বিবেক মরে গেছে!

0
খবরে প্রকাশ, সিরিয়ার বিদ্রোহীদের আল-কায়েদার সঙ্গে সখ্য রয়েছে। যদিও সেটি ‘আমার শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ নীতিতে। কিন্তু বিদ্রোহীরা ক্ষমতায় এলে আল-কায়েদা যে সুবিধা পাবে না, তা বলা যায় না। মূল বিষয়টি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত পররাষ্ট্রনীতি। তারা আল-কায়েদার বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে ২০০১ সাল থেকে লড়াই করে আসছে। কিন্তু আল-কায়েদা ও তার সহযোগী আল-নুসরা ফ্রন্ট যে আসাদের পতনে আরও শক্তিশালী হবে, সে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র এড়িয়ে যাচ্ছে।

আজ সিরিয়াকে নিয়ে দাবা খেলা হচ্ছে। মাথার উপরে শকুন উড়ছে। লাশের স্তুপের মধ্যে হাঁটছে দেশ। প্রতিটি দিন দুঃসহ যন্ত্রণার স্বীকার হতে হচ্ছে মানুষকে। সামনে শুধু অন্ধকার। আমেরিকা, রাশিয়া, আরব, ইরান, তুরস্ক যায় বলিনা কেন, আসলে সিরিয়াতে যা হচ্ছে তা প্রমান করে দিয়েছে, বিশ্ব বিবেক মরে গেছে। জাতিসংঘ এখানে পরাজিত। জটিল দ্বন্দ্বের আবর্তে পড়ে জনগণ। একটু বাঁচার জন্য কেউ বিদ্রোহীদের সাথে আবার কেউ সরকারের সাথে থাকছে। আবার অনেকে হাতে বন্দুক তুলে নিচ্ছে। কলকাতার মানুষের মতো সংস্কৃতি প্রেমী লোক ওখানেও আছে। কিন্তু কবিতা, গান,গল্প বুলেটের কাছে মাথা নত করেছে। নাগরিক সমাজ নীরব। কেউ কেউ কথা বলছেন, কিন্তু সেই আওয়াজ কাজে আসছে না। সিরিয়ার মানুষের মুক্তি কোন পথে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক কোনও আলোচনাও হচ্ছে না জাতিসংঘের পক্ষ থেকে। একে অপরের বিরুদ্ধে দোষারোপ দিয়ে নিরীহ জনতাকে খুন করা হচ্ছে।

সিরিয়া সংকটকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো দু’শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে। এই বিভক্তির একটা কারণ নিশ্চয়ই মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের পুরোনো শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব, তবে এটা একমাত্র কারণ নয়। অন্য আরো অনেকগুলো কারণ আছে যার হিসেব বেশ জটিল।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিটি ইউনিভার্সিটি লন্ডনের মিডলইস্ট স্টাডিজের অধ্যাপক রোজমেরি হলিস বলেছেন, “আমার মনে হয় পশ্চিমা হস্তক্ষেপ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারবে না। এই যুদ্ধ অনেক বেশি জটিল এবং এতে বহু রকমের পক্ষ জড়িত হয়ে পড়েছে। এত শরণার্থী প্রতিদিন সীমান্ত পার হচ্ছে, অস্ত্রের চালান আসছে যাচ্ছে, ইরাক-ইরান-লেবানন এতে জড়িয়ে গেছে – যে এই দেশগুলো আর ঠিক পৃথক রাষ্ট্র নেই। তাই আমার মনে হয়, প্রথম মহাযুদ্ধের পর তৈরি মানচিত্র এখন হয়তো নতুন করে আঁকতে হতে পারে। আমি ঠিক এই রাষ্ট্রগুলো ভেঙে যাবার কথা বলছি না। বরং বলতে চাইছি, যে সীমারেখাগুলো দিয়ে সিরিয়ান, লেবানীজ, ইরাকী এভাবে এখানকার জনগোষ্ঠীগুলোকে ভাগ করা হয়েছে, তা যেন অর্থহীন হয়ে পড়ছে। দু বছরেরও বেশি আগে প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান দিয়ে সিরিয়ায় যে সংঘাতের শুরু, তাতে শুধু যে লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানি হয়েছে, তাই নয়। যত দিন যাচ্ছে ততই এই যুদ্ধ আর শরণার্ধী সমস্যায় আরো বেশি করে জড়িয়ে পড়ছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। এর পরিণতি কি হতে পারে তা অনুমান করা দিন দিন যেন আরো বেশি কঠিন হয়ে উঠছে। আসলে বিশ্ব চায়ছে না যে,সিরিয়া সমস্যার সমাধান হোক। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল,আপনি যদি সিরিয়া ইস্যুতে প্রতিপক্ষ দুই জোটে কারা আছে সেদিকে তাকান, তা হলে অনেকগুলো অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়বে। একদিকে বাশার আসাদের মিত্র হলো রাশিয়া, ইরান আর হেজবোল্লাহ। অন্যদিকে বাশার আসাদ বিরোধী কোয়ালিশনের পক্ষ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, আর ইউরোপীয় দেশগুলো – যেখানে ইসলামপন্থীরাও আছে, এবং আল-কায়দা নেটওয়ার্ক-সংশ্লিষ্ট কিছু গ্রুপও আছে।”

ইতোমধ্যেই পাঁচ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, আরো অন্তত পাঁচ লাখ আহত হয়েছে, দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ। বন্দুকের বদলে বন্দুক দিয়ে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছে কিছু রাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর পৃথিবীকে নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ত্ব নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ গঠিত হয়েছিল। মনে করা হচ্ছিল যুদ্ধ থেমে যাবে। কিন্তু নিরাপত্তা যাদের দেবার দায়িত্ত্ব ছিল তাঁরাই আজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির নায়ক।

আধুনিক যুগেও এ কথা মনে করিয়ে দিতে হবে যে,সামরিকভাবে সিরিয়া সঙ্কটের সমাধান হবে না। সমাধান করতে হবে আলোচনার টেবিলে বসে। এই যুদ্ধের ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বেড়েছে। তারা দেশ ছাড়তেও পারছে না, থাকতেও পারছে না। আয়লান কুর্দিদের নিয়ে এখন আর তেমন মাতামাতিও হয় না মিডিয়ায়। ইউরোপে শরণার্থীর ঢল কমে যাওয়ায় আগের মতো আর যুদ্ধ নিষ্পত্তিতে আগ্রহী নয় ইউরোপ। মোট কথা, সবাই নিজের জন্য ভাবছে।আমাদের ভারত বর্ষ বা কলকাতার মানুষও কিন্তু নীরব। কিংবা ভিতরে ভিতরে বলছে,যা হচ্ছে হোক।আবার কেউ কেউ আন্দোলন করছে আমেরিকার বিরুদ্ধে। যেমন কলকাতায় বুধবার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিল কলকাতার বামেরা। দলটি মনে করছে,আমেরিকার জন্যই সিরিয়া সংকট তৈরি হয়েছে। আবার কেউ মনে করছে বাসার আল আসাদ ও রাশিয়াও কম দায়ী নয়। কিন্তু আমেরিকা, রাশিয়া, সিরিয়া এইসবের বাইরে এসে মানুষের জন্য একটা সমাধান খুবই প্রয়োজন সিরিয়ায়। আমরা যদি মানবতার কথা বলে থাকি,আমরা যদি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, গান্ধীজীকে ভালোবাসি তবে অবশ্যই সিরিয়া সমস্যার সমাধানে বিশ্বমোড়লদের ভাবতে বাধ্য করতে পারি। সিরিয়ার জন্য কলকাতায় আন্দোলন হোক সেই সাথে ভারত কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করুক। ভারত দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা অর্জন করুক। এখন ছোট ছোট শিশুদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভারতকে অবশ্যই একটা ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে সিরিয়ার জন্য। কিন্তু সত্যিই কি সিরিয়া ফের আগের মতো হাসবে? এই রক্ত খেলা কি বন্ধ হবে? হলে তা কবে? সেই প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই।

আমার বাবা কিংবা কোনও ইজতেমায় হয়তো শুনছিলাম, সিরিয়ার দামাস্কাস থেকে নাকি ঈসা (আ:) নবী আসবেন। সিরিয়ার মানুষ যখন বিশ্ব প্রভুর কাছে দুহাত তুলে ফরিয়াদ করে বলবে, হে আল্লাহ বাঁচাও ঠিক সেই সময় ঈসা (আ) আসবেন। সাম্রাজ্যবাদী, যুদ্ধবাজ শক্তি সেদিন পরাজিত হবে। সেদিন সিরিয়া সহ গোটা দুনিয়াতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। সেদিন সিরিয়া শিশু দুহাত তুলে ফুলের মতো হাসবে। সেদিন আমাদের মতো শয়তান মুখগুলি সিরিয়ার শিশুদের সামনে এসে দাঁড়াতে পারবেতো? তাই লজ্জা আর ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিণতির আগেই সিরিয়ার মানুষের জন্য আমাদের কথা বলতে হবে।