অপব্যবহারে ধর্ম যখন ফোবিয়া

0
আফরিদা খাতুন

আফরিদা খাতুন, টিডিএন বাংলা: ধর্ম- যার অতলে খুঁজলে শান্তি এই একটি শব্দেরই সন্ধান পাওয়া যায়। প্রত্যেকটা ধর্মেরই প্রধান বার্তা শান্তি। মুসলিম, হিন্দু, খৃস্টান, জৈন, শিখ সকল ধর্ম শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করেছে বার বার। এমনকি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে পৃথিবীতে যখনই শান্তি দেখা গেছে তখনই বারে বারে ধর্মের মাধ্যমে শান্তির বাতাবরণ ছড়িয়েছে।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গীন হয়ে উঠেছে যে ধর্ম নামটা শুনলেই মানুষের মনে একটা ভীতির চিত্র ফুটে ওঠছে। ধর্ম যেই কথাটা ছিল শান্তির গূঢ়তত্ত্ব আজ সেই ধর্ম নামক শব্দ থেকে অশান্তির একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ বার হয়। কিন্তু এতে ধর্মের কোন দোষ নাই, ধর্ম তার জায়গায় স্থির। যত সমস্যা ধর্মের অন্ধ অনুসারীদের নিয়েই। কখনো তারা ধর্মকে ব্যবসায় পরিণত করে আবার কখনো তারা মানুষ মারার ঢালে পরিণত করে।  সমগ্র বিশ্বে ধর্মান্ধদের ধর্ম নিয়ে এই অপব্যবহারের  ফলে বিশ্বের প্রগতিশীল মানুষের কাছে ধর্মটা আজ পুঁথির মধ্যে আবদ্ধ কতগুলি তত্ত্ব কথাতে পরিণত হয়েছে।
ধর্মকে কাজে লাগিয়ে কিছু ভণ্ড ফকির বা সন্ন্যাসরা যেমন নিরীহ মানুষের ধর্মের প্রতি বিশ্বাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লুঠ করছে সর্বস্ব অন্য দিকে ধর্মের নামে একদল উন্মাদ সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে অহরহ।ধর্মকে ঢাল করে নাইজেরিয়ায় বোকাহারাম দিনের পর দিন চালাচ্ছে সন্ত্রাস। মায়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মুসলমানদের দেশ থেকে উৎখাত করার নামে রোহিঙ্গাদের পশুর ন্যায় জবাই করে চলছে অনায়াসে। ইসলামী শরিয়ার অপব্যাবহার করে আইএসআই মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশে চালাচ্ছে নৃশংসতার তাণ্ডব।
ধর্মান্ধতাদের উন্মাদনার এই বিষাক্ত বিষ থেকে ভারত আজও নিরাপদ নয়। এই বিষ আজ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ, যেখানে সমস্ত মানুষ সংবিধান অনুসারে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমান অধিকারের অধিকারী। সংবিধানের ৩২ নং ধারা অনুযায়ী সকল ধর্মের মানুষ স্বাধীন ভাবে ধর্মীয় আচার – অনুষ্ঠান পালন করার পূর্ণ অধিকার আছে। ধর্মান্ধতাদের কালো থাবায় আজ সংবিধানের ৩২ নং ধারা  ছিন্নভিন্ন। ভারতে হিন্দু ধর্মালম্বীর মানুষ সংখ্যায় গুরু।
কিন্তু ভারতকে সংবিধানে ‘ হিন্দুস্থানে’র পরিবর্তে ‘ভারত’ হিসাবে  উল্লেখ করা হয়েছে কেবল ভারত কে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে তুলে ধরার জন্যে। দলিত হিন্দু সহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে হয়ে উঠেছে  সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের একদল উন্মাদের শোষণ আর অত্যাচারে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে আজ তারা রামরাজ্য বানাবার প্রয়াসে এতটাই উন্মাদ হয়ে উঠেছে যে তাদের কাছে ধর্মের নামে খুন অত্যাচারটা সাধারণ থেকে  অতি সাধারণে পরিণত হয়েছে। কখনো তারা দলিত যুবকের প্রাণ নিচ্ছে উচ্চ শ্রেণীর প্রতীক ঘোড়ায় চাপার জন্য, কখনো  রীতিমত জ্ঞান অর্জনে তুখোড় দলিত ছাত্রদের বাধ্য করেছে মৃত্যু পুরীতে প্রবেশ করতে।
এই ভয়ঙ্কর অত্যাচার ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্প্রদায়ের মানুষদের রাতের ঘুমও কেড়ে নিয়েছে। তারা কখনো নিরীহ মুসলিমদের জীবন স্তবদ্ধ করছে গো হত্যার নাম করে , কখনো বা লাভ জিহাদের নামে। কিছু ধর্মান্ধ কট্টর হিন্দুদের পদতলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে নিরীহ দলিত আর মুসলিমদের জীবন। তারা ভারতের চিরাচরিত সম্প্রতিকে নষ্ট করে রচিত করে চলেছে এক কালো অধ্যায়। কট্টর হিন্দুদের খুন,ধর্ষণের মত অপরাধকে ঢাকা দেওয়া হচ্ছে ধর্মের নাম করে। পরোপকারী ডাক্তাকে কেবল মুসলিম  হওয়ার আপরাধে জেলের ঘানি টানতে হচ্ছে দিনের পর দিন। আজ রামের অন্ধ সেবকদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে দলিত আর মুসলিমদের জীবন। কিন্তু রাম কি তা কখনো চেয়েছিলেন?
যেই বুদ্ধদেবের কাছে পশু হত্যা ও মহাপাপ হিসাবে গণ্য ছিল। তার কাছে অহিংসাই হল সমস্তের মূল কথা। তার অনুচর তাহলে কীভাবে রোহিঙ্গাদের শিশু বৃদ্ধ নির্বিশেষে দিনের পর দিন  পশুর মত জবাই করে চলছে? যে ইসলামের দৃষ্টিতে নারী হল ঈশ্বর প্রদত্ত উপহার ,সেই ইসলামের কিছু বাণী আউড়ে বোকাহারাম কী ভাবে পারে নিরীহ কিশোরীদের দিনের পর দিন পণবন্দি করে রাখতে? যে কোরান এর পাতায় পাতায় মানুষকে সঠিক পদ্ধতিতে উর্পাজন করার বারবার হুকুম দিয়েছে সেই কোরানের আয়াতকে বিক্রি করে কীভাবে পারে কিছু মুসলমান উর্পাজনের পথ হিসাবে বেছে নিতে? যে কট্টর হিন্দুরা ভারতের মত বৃহৎ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে হিন্দু রাষ্ট্র পরিণত করার জন্য নিরীহ মানুষদের উপর চালাচ্ছে অকথ্য নির্যাতন তারা কী জানেনা তাদের উপনিষদ কী বলেছে? উপনিষদ বলছে এই বসুন্ধরার সকলেই তোমার কুটুম্ব অর্থাৎ পরমাত্মীয়।
আসলে এই সমস্ত ধর্মান্ধদের কাছে ধর্মের মূল্য ছিটেফোঁটাও নাই। এরা কেবল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মকে ঢাল স্বরূপ ব্যবহার করেছে মাত্র। এর যে শুধু পর ধর্ম অসম্মান করছে তাই না এরা নিজেদের ধর্মের আর্দশকে পায়ের  তলায় পিশছে দিনরাত। এরা না হতে পারে হিন্দু অথবা মুসলিম অথবা খৃস্টান অথবা শিখ অথবা বৌদ্ধ অথবা জৈন। এই সমস্ত ধর্মান্ধদের কারণে ধর্মকে ঘৃণা বা তুচ্ছের চোখে দেখা রীতিমত বোকামির পরিচয় হবে। ধর্ম কিন্তু তার নিজের জায়গায় স্থির। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে ধর্ম আজ  আশান্তির বেড়াজালকে ছিন্ন করে সহস্র প্রাণ কে পৌঁছে দিচ্ছে  শান্তি র দোরগোড়াতে।
ধর্মান্ধতাদের এই কালো থাবা থেকে মুক্তি পাওয়া তখনই সম্ভব যখন সকল মানুষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে গর্জে উঠবে এইসব ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে। যখন মানুষ এদের মুখে বিভেদের বুলি শুনে অন্যায়কে নীরবে মেনে না নিয়ে, ধর্মের কষ্টি পাথর দিয়ে যাচাই করে এদের ভুল গুলোকে রীতিমতো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে, যে দিন ধর্মের সত্যতা দিয়ে এদের বিষদাঁত কে ভেঙে দেওয়া হবে সে দিন ই ভারত তথা সমগ্র বিশ্বে রাম-রহিম-জেকব এক অপরকে ঘৃণা করার পরিবর্তে একে অপরের প্রাণের দোসরে পরিণত হবে।
সেদিনই ভারত আবার তার আসল সত্ত্বা ফিরে পাবে, সে দিনই ভারত আবার বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ আসন অর্জন করবে।
পাঁচলা, হাওড়া
tdn_bangla_ads