আমার অকাল বসন্ত

0

পাঠকের কলম, টিডিএন বাংলা: জন্মের পর বছর যদি গুনতে যাই, বয়স আমার তেমন কিছুই না। এক বসন্ত কাটিয়ে অতিরিক্ত কয়েকটি বছর। জীবন সবে মাত্র শুরু হয়েছে, কেবল একটি বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে। এখন ও বেশ কিছু বসন্ত বুঝি আমার জন্য অপেক্ষমান। এই ফ্যাকাসে চোখে কত স্বপ্ন, যৌবন,বার্ধক্য এমনকী মৃত্যুকে নিয়ে। মাঝে মধ্যেই এই সব স্বপ্ন কে সফল করার জন্য উতালা হয়ে উঠি ।

আচ্ছা আমার কুড়ি পেরিয়ে অতিরিক্ত কয়েকটি বছর , আসলেই কী জীবনের সবে শুরু? উত্তরটা হ্যাঁ বা না হওয়ার বুঝি উপক্রম নাই। কিন্তু কিছু কিছু জীবন দেখলে মনে হয় আমার জীবন শুরু হয়ে কেবল মাঝ পথে না, মাঝপথ পথ পেরিয়ে অনেকটাই ধেয়ে গেছে অন্তিমের দিকে। জীবনের কুড়ি ও তার অধিক কয়টি বছর শুয়ে শুয়ে কেবল উড়ার স্বপ্ন দেখেই কাটিয়ে দিলাম, ভাবতেই বেশ অবাক লাগে। যে দিন আসমা বেলতাগী শহীদ হল সে দিন এই ব্যাপারটা বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল। তারপর এক এক করে প্রতিদিন পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার ফতিমাকে সর্গবে যেতে দেখে বেশ ভালো মতোই টের পাই “আমি বুড়িয়ে যাওয়া অকেজো একটি প্রাণ।”

কয়েকটি বাধা অতিক্রম করে যখন সংগঠনের জন্য বার হয় তখন নিজেকে বেশ বীরাঙ্গনা নারী মনে হয়। আহেদ তামিমের মুক্তির জন্য রীতিমতো হিমশিম খেয়ে মুক্তি আন্দোলন টা সবার চেষ্টায় যখন সফল করে তুলি, তামিমের সাহসের ছিটেফোঁটা না থাকা সত্ত্বেও দিনের অবশেষে নিজেকে তামিমের থেকে কম কিছু মনে করিনি সেদিন। স্বল্প বাধার পরিসরে দাঁড়িয়ে আর্তনাদের দ্বারা সবার সমানে নিজেকে পেশ করি ঠুনকো বীরাঙ্গনা বেশে।

বাস্তব জীবনে ও এরকম বয়ঃকনিষ্ঠদের সক্ষাত ঘটেছে বটে। হকের সাথে বাতিলের লড়াইয়ে মহিউদ্দীনের পায়ে বুলেট বিঁধার ও দেশ-বিদেশে জাহিদের উদ্ধার অভিযানের রোমাঞ্চকর কাহিনী শুনে, কত দিবা-স্বপ্ন দেখেছি রাজান-আল-নাজ্জারের মত স্বার্থক জীবন গড়ার , কত স্বপ্ন দেখেছি ক্ষুদ্র এই বাধার প্রাচীর ভেঙে বসন্তের সুবাসে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার। কিন্তু এই সব স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার বিন্দুমাত্র প্রয়াস আজ ও ঘটাতে আমি ব্যার্থ।

চারিদিকে রয়েছে এক মায়ার জাল যাকে ছিন্ন করে বার হওয়ার সাহস আজ ও রপ্ত করতে পারি নাই। তবে একটি জিনিস বেশ ভালো মতোই উপলবদ্ধি করেছি যে , মায়ের আঁচলের কোণ ছেড়ে যতদিন না বার হতে পারি ততদিন হাজার মহিউদ্দিন বা শত জাহিদ এর কাহিনী ও আমাকে ফতিমার মত রুখে দাঁড়াবার সাহস দেবেনা অথবা তামিমির মত নির্ভয়া হয়ে ওঠার সুযোগ দেবেনা। বেডরুমে অলস দুপুরে কয়েকটা গরম গরম আর্টিকেল লেখা ছাড়া আর কিছুই সম্ভব হবেনা। খুব বেশি হলে আহালান বা নাফ নদীতে ভাসমান সেই কন্যাটার ছবি দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য লোমটাই খাড়া হয়ে উঠতে পারে। মায়ার এই অন্ধ কূপে থেকে তামিমির জন্য কয়েক পা হেঁটে দিন শেষে নিজেকে তামিমি ই মনে হবে।

আসলেই এই বদ্ধ পরিসরে থেকে তুমি ভাবের কবি হতে পার কিন্তু তোমার সত্ত্বা থেকে আসমা বা রাজান এর জন্ম নিতে পারে না। এরা হল ভাঙার প্রতীক , কাপুরুষতা-স্বার্থপরতা কে ভাঙার প্রতীক। অলস দুপুরে কলমের কালি ঝরিয়ে হয়তো আহলান দের উদ্দেশ্যে দ্ব্যার্থ ভাষায় কিছু লেখা যায় কিন্ত হৃদয়ের সাহস ঝরিয়ে মিথ্যার বিরুদ্ধে একটা ঢিল ছোঁড়া যায় না। কুড়ি ও তার অধিক বছর গুলিতে আমি কেবল স্বপ্ন বুনেছি কিন্তু আসমা, ফতিমা, তামিমি, রাজান প্রথম বসন্তের ছোঁয়া পেয়ে প্রাচীর ভেঙে করেছে স্বপ্ন স্নান। আজ আমার এই এক বসন্ত তোমাদের অকাল চৈত্তির কাছে লক্ষ হীম শীতের সমান। স্বল্প হলেও স্বার্থক তোমাদের জীবন।

আফরিদা খাতুন আঁখি
পাঁচলা, হাওড়া