দেশের সামনে নতুন বিপদ

0

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত, টিডিএন বাংলা : বিজেপি-আরএসএস জোটের শাসনকালে দেশের নানা প্রান্তে যে ধরনের স্বৈরাচারী আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে, তা চরিত্রগতভাবে জরুরি অবস্থার সময়কার স্বৈরাচারের থেকে আলাদা। দুটি স্বৈরাচার মূলগতভাবেও পৃথক। জরুরি অবস্থার সময় রাষ্ট্র আক্রমণ করেছিল বিরোধী দলকে। রাষ্ট্র আক্রমণ শানিয়েছিল সাধারণ মানুষের ওপর। আর বর্তমান সময়ের স্বৈরাচার সংখ্যালঘুদের আক্রমণ, দলিতদের আক্রমণ, বুদ্ধিবেত্তাকে আক্রমণ, যুক্তিবোধকে আক্রমণ এবং সত্যকে আক্রমণ। এই বহুমুখী আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যই হলো ফ্যাসিবাদী ধারণার বিকাশ ঘটানো। ভারতসহ দুনিয়াজুড়ে ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান হলেও ভারত বা অন্যান্য দেশ এখনো ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি। দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদপ্রতিম নেতা প্রমোদ দাশগুপ্তের জন্মদিনে প্রমোদ দাশগুপ্ত মেমোরিয়াল ট্রাস্টের তরফে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক প্রভাত পট্টনায়ক। ‘স্বৈরাচারের রাজনীতি-স্বৈরাচারের অর্থনীতি’ শীর্ষক বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি।

স্বৈরাচারের রাজনীতির কথাই হোক কিংবা স্বৈরাচারের অর্থনীতির কথাই হোক, আপাদমস্তক বামপন্থি ঘরানার বিশিষ্ট চিন্তাবিদ প্রভাত পট্টনায়েকের ঘণ্টাখানেকের নাতিদীর্ঘ ভাষণে যেসব প্রেক্ষাপটে বিচরণ করলেন, তা সবটাই হয় জাতীয় পর্যায়, নয় তো আন্তর্জাতিক। কিন্তু যে শহরে দাঁড়িয়ে তিনি বক্তৃতা দিলেন, যে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে মূলত বামপন্থি মানুষজন যে সভায় আগ্রহী শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সেখানকার জ্বলন্ত পরিস্থিতির কথা একবারও মুখে আনলেন না অধ্যাপক পট্টনায়েক। অথচ সভা শেষে অনেক শ্রোতাকেই আক্ষেপ করতে শোনা গেল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বৈরাচার কিংবা নরেন্দ্র মোদির স্বৈরাচার এসবের বিরুদ্ধে তো লড়াই করা যায়, লড়াই হচ্ছেও বটে। কিন্তু যে মাটিতে দাঁড়িয়ে এসব হিল্লি-দিল্লির কথা চর্চিত হলো, সেখানে মমতা ব্যানার্জি নামক এক বেনজির স্বৈরাচারী মুখ্যমন্ত্রী ও ততধিক বেনজির তার দল তৃণমূল একটানা গত সাত বছর যাবৎ গোটা রাজ্যবাসীর বুকের ওপর দিয়ে স্বৈরশাসনের যে স্টিমরোলার দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, প্রভাতবাবু না করলেন তার উল্লেখ, না ব্যাখ্যা করলেন এ স্বৈরাচারের স্বরূপ। মমতা ব্যানার্জির স্বৈরাচারের স্বরূপ কি শুধুই রাজনৈতিক ক্ষমতালিপ্সার মদমত্ততা? নাকি এ স্বৈরাচারেরও অন্তরালে আছে গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের ওপর বড়লোকের শোষণকে আরও জোরালো করার কাজে মদদ দেওয়ার উদ্দেশ্য? তা যদি হয়, তাহলে মমতার স্বৈরাচারের অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যের স্বরূপ পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থি কর্মী ও সমর্থকদের অন্তরে প্রবিষ্ট করানোই ছিল ওই ধরনের আলোচনা সভার তাৎপর্যবাহী উদ্দেশ্য। সম্ভবত প্রভাতবাবুর বক্তব্যে এ বিষয়টি ফাঁকাই রয়ে গেল।

প্রভাত পট্টনায়েক তার ভাষণে বলেন, দুনিয়াজুড়ে ক্রমবর্ধমান সংকট থেকে যেমন ১৯৩০ ও তার পরবর্তী সময় ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটেছিল, তেমন এখনো পুঁজিবাদের ক্রমবর্ধমান সংকট থেকে ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর উত্থান হচ্ছে বিশ্বজুড়েই। সংকট থেকে মুক্তির কোনো পথ উদারনৈতিক বুর্জোয়াদের সামনে নেই। উল্টো তারা স্বীকারই করতে চায় না বর্তমান সংকটকে। একই সঙ্গে এ সময়কালে দুনিয়াজুড়ে দুর্বল হয়েছে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের ভূমিকা। আমেরিকার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্প ও হিলারির ভাষ্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এ সংকটকে স্বীকার করা ও সংকট মোকাবিলার কথা বলেছিলেন আরেক প্রতিদ্বন্দ্ব্বী বার্নি স্যান্ডার্স। নির্বাচনের দৌড় থেকে স্যান্ডার্স ছিটকে যাওয়ার পর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আর কোনো চ্যালেঞ্জই তুলে ধরতে পারেননি হিলারি। কারণ তিনি সংকটটাকে স্বীকারই করতে চাননি। অথচ ২০০৮-এর সময় থেকে দেখা গেছে মার্কিন মুলুকে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ক্রমেই কমেছে। অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিত্জ দেখিয়েছেন, ১৯৬৮ সালে একজন মার্কিন শ্রমিকের প্রকৃত আয় যা ছিল, তার থেকে ২০১১ সালে প্রকৃত আয় দাঁড়িয়েছে অনেকাটই কম। পট্টনায়েকের কথায়, ভয়ঙ্কর এ সংকটের জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে দায়ী না করে, দায়ী করা হয়েছে মিথ্যা আর যুক্তিবোধের বাইরের কিছু উপাদানকে। যেমন ট্রাম্প বলে থাকেন, আমেরিকানদের দুর্দশার জন্য দায়ী মেক্সিকানরা বা অভিবাসী মুসলিমরা বা চীনের লোকেরা। তেমনি ভারতে দায়ী করা হয় মুসলিমদের, কিংবা দলিতদের। সংকট মোকাবিলায় উদারবাদী বুর্জোয়াদের কাছে কোনো বিকল্প না থাকায় ফ্যাসিবাদীরা তার সুযোগ নিয়েই ক্ষমতায় আসে এবং ফ্যাসিবাদীদেরই মসনদে বসায় যাতে লগ্নিপুঁজির লুট অক্ষুণ্ন রাখা যায়। পট্টনায়েক বলেন, চারটি কারণে বর্তমান সময়ের স্বৈরাচারকে ফ্যাসিবাদী বলা যায়। প্রথমত, এ ধরনের ফ্যাসিবাদী শক্তি সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ শানায় ও সব ধরনের সংকটের জন্য সংখ্যালঘুদের দায়ী করে। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের শক্তি সবসময়ই একচেটিয়া পুঁজি এবং আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির প্রতি বিশ্বস্ত। মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স জিও  ইন