রাতকে দিন করতে অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর ব্যাবহারে বিপর্যয়ের মুখে নিশাচর প্রাণী

সামু সেখ, টিডিএন বাংলা : মনুষ্য সভ্যতার অগ্রগতির পথে, প্রকৃতির মৌলিক নিয়মকে অনেকাংশেই লঙ্ঘন করে গড়ে উঠেছে পৃথিবী জুড়ে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা। শহর গঠনে মানুষ পরিবর্তন ঘটিয়েছে অনেককিছুর। শহরেকে সুসজ্জিত করতে প্রকৃতির ভারসাম্য প্রদানকারী গাছ কেটে, জলাশয় ভরাট করে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে অনেক কিছু নিজের অনুকূলে রূপান্তরিত করেছে।

 

শিল্পায়নের জন্য পরিবেশের মৌলিক সত্ত্বাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। সারা পৃথিবী জুড়ে বেড়ে চলেছে রাত্রিকালীন কৃত্রিম আলোর ব্যবহার।আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা, হোটেল, কলকারখানা, রাস্তাঘাট, শহরের সৌন্দর্যায়নে প্রভৃতি কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে আলোর দূষণ।অনেকাংশে ব্যবহৃত হচ্ছে অত্যাধুনিক এলইডির নীল আলোর ব্যবহার, যা আলোর কারণে বদলে যাচ্ছে রাতকে দিন করার প্রচেষ্টা।

 

 

ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ছে রাত্রিকালীন জীবজন্তু, বিভিন্ন প্রজাতির কীটপতঙ্গ, পোকামাকড়, বিভিন্ন পরাগবহনকারী পতঙ্গ ও প্রাণীসম্পদের উপর, শস্যের উপর, উদ্ভিদের উপর।কৃত্রিম আলোর ক্রমবর্ধমান দূষণের প্রভাব নৃতাত্ত্বিকভাবে বিস্তার লাভ করে চলেছে পরাগ বহনকারী প্রজাতির বাসস্থানের পরিবর্তনে, নিবিড় কৃষিতে, কীটনাশকে, আক্রমণাত্মক কীটনাশক পরক প্রজাতির ওপর, জীবাণুর ওপর, জলবায়ুর ওপর। যা স্থলজ স্থায়ী বাস্তুতন্ত্রের জন্য চরম হুমকি স্বরূপ।

 

বিজ্ঞানীদের মতে কৃত্রিম আলোর পরিসর বেড়ে যাচ্ছে দুই শতাংশ হারে। রাত্রিকালীন আলোর তীব্রতা পরিমাপকারী নাসার স্যাটেলাইট রেডিও মিটারের চিত্রে সম্প্রতি এমনই চাঞ্চল্যকর ছবি উঠে এসেছে। সায়েন্স এডভান্সড নামের একটি জার্নালে এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। রাতের স্যাটেলাইট চিত্রে পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠকে উজ্জ্বল ও মাকড়সার জলের মতো আলোক সুন্দর দেখালেও তা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর অত্যান্ত ক্ষতিকারক। আমেরিকার মেডিক্যাল এসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চ তীব্রতা সম্পন্ন এল ই ডি তে নীল আলোর বিচ্ছুরণ সম্পর্কিত ক্ষতিকারক দিকগুলি তুলে ধরেন ২০১৬ সালে।

 

 

জার্মান রিসার্চ সেন্টারের জিওসায়েন্স এর প্রধান গবেষক ক্রিস্টোফার কিবা বলেন, বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম আলোর ব্যবহার মনুষ্য সভ্যতার মধ্যে লক্ষণীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে পরিবেশে। জার্নাল নেচার গবেষণা বলছে, কৃত্রিম আলো রাতজাগা কীটপতঙ্গ , পোকামাকড় প্রভৃতি (nocturnal pollinators) পরাগবহনকারীদের কার্যক্রম কমিয়ে আনছে।রাতের অন্ধকার এইভাবে হারিয়ে যাওয়া মনুষ্য ও প্রাণীজগতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে আলোকিত দেশগুলির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, যেখানে আলোর তীব্রতা একইরকম আছে। দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়াতে আলোর ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে ইউরোপের যে কোনো জায়গায় প্রাকৃতিক রাতের আকাশ দেখতে পাওয়া দুষ্কর।মানুষ অভিযোজনগতভাবে এসব মানিয়ে নিয়েছে , তবে অধ্যাপক গ্যাসটনের মতে পরিবেশের সাথে মানুষের সংঘাত সবসময় বিপর্যয় নিয়ে আসে। আলোর দূষণ তেমনই একটা ঘটনা বিভিন্ন প্রজাতির জীব (nocturnal animals) যেমন 1) Indian flying fox, 2)Barn owl, 3) Gray Wolf, 4)Eyelash viper 5)Raccoon , 6) Red Panda, 7)Red eyed Tree Frog , 8) Luna Moth, 9) Slow Loris ,10) Sugar Glider প্রভৃতি নিশাচর প্রাণীর পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষায় অবদান অপরিহার্য। বিগত কুড়ি বছরে, আলোর নিঃসরণ পৃথিবী জুড়ে ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় ৩০০ পোকামাকড় প্রজাতি প্রায় ৬০ টি উদ্ভিদ প্রজাতির ফুলের পরিদর্শন করে শুধুমাত্র রাত্রে।মানুষ নিজ স্বার্থে প্রকৃতির বাধা অপসারণ করে নিজের অনুকূলে রূপান্তর করতেই পারে। অন্য কোনো প্রাণীর বলার কিছুই নেই। পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী অন্যান্য জীব প্রজাতির অবলুপ্তির কারণে মানুষও কোনোদিন বিবর্তনের পথে হারিয়ে যাবে, কিছুই করার থাকবে না।