সংরক্ষিত আসনের বাইরে ডাব্লুবিসিএস গ্রূপ সিতে আড়াই শতাংশ ও চাকরি পায়নি মুসলিমরা!

0

মোকতার হোসেন মন্ডল, টিডিএন বাংলা, কলকাতা: সাচার কমিটির রিপোর্টের এগারো বছর পরেও চাকরি ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের অবস্থা পাল্টায়নি। সংরক্ষিত আসনের বাইরে সাধারণ কোটায় তেমন চাকরি পায়নি মুসলিমরা, যা প্রমান করেছে রাজ্যের মুসলিমরা প্রতিযোগিতায় সাধারণ বিভাগে বেশি এগুতে পারেনি।

পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরিচালিত ডাব্লুবিসিএস গ্রূপ সি (২০১৬)-এর ফল প্রকাশিত হয়েছে মঙ্গলবার। তাতে দেখা গিয়েছে ৩২১ জন সফল পরীক্ষার্থীর মধ্যে মুসলিম হলেন ৪০ জন। এদের মধ্যে চার জন মহিলা। সব মিলিয়ে ১২.২ শতাংশ মুসলিম সফল হয়েছেন। এই হিসাব থেকে স্পষ্ট যদি ১০% সংরক্ষণ না থাকতো তবে চাকরির ক্ষেত্রে সেই দুই শতাংশের একটু বেশির মধ্যে আজও ঘোরাফেরা করতো। এতো বছর পর যা রাজ্যের জন্য লজ্জার। পিছিয়ে রাখা সম্প্রদায়টি যে এখনও পিছিয়ে তা এই ফলাফলে স্পষ্ট। উল্লেখ্য বিগত বাম সরকারের সময় মুসলিম ওবিসিদের জন্য ১০% সংরক্ষনের আইন পাশ হয়। মূলত মুসলিম ওবিসি এ সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য এই সুযোগ ছিল। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর ওবিসি বি তেও মুসলিমদের জায়গা দেওয়া হয়। কিন্তু চাকরি ক্ষেত্রে মুসলিম ওবিসি বি হাতে গোনা সুযোগ পেয়েছে বলে অভিযোগ।
এই ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, মুসলিমদের মধ্যে ৬ জন সাধারণ ক্যাটাগরিতে এবং ৩৪ জন ওবিসি তালিকাভুক্ত। ওবিসি তালিকাভুক্তদের মধ্যে ওবিসি-এ ৩৩ জন ও ওবিসি-বি ১ জন মুসলিম সফল হয়েছে। তবে, সমগ্র তালিকায় ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি মিলিয়ে মোট ৬৩ জন সফল হয়েছেন। ওবিসি -বি  তালিকায় রয়েছেন মোট  ৩০ জন। তার মধ্যে  মাত্র  একজন মুসলিম। আর ওবিসি-এ তালিকায় রয়েছেন ৩৩ জন মুসলিম। সাধারণ বিভাগ ও ওবিসি-বি তে মুসলিম সংখ্যা কম। হিসাব বলছে,ওবিসি সংরক্ষণ না থাকলে ৩২১ জনের মধ্যে
মাত্র ৬ জন মুসলিম চাকরি পেতো।

Advertisement
head_ads

আসুন সংরক্ষণ নিয়ে কিছু তথ্য জেনে নিই-
* ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী
পশ্চিমবঙ্গে এসসি লোকের সংখ্যা- ২৩.৫১%
*এসটি সংখ্যা ৫.৮%
*সব মিলিয়ে হিন্দু মোট জনসংখ্যা ৭০.৫৪%
*মোট মুসলিম জনসংখ্যা ২৭.১%

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সম্প্রদায়ের সংখ্যা ১৭৬টি। এর মধ্যে ওবিসি এ ৮১ এবং ওবিসি বি ৯৫ টি। মুসলিমদের ১১৬ টি গোষ্ঠী ওবিসি ভুক্ত। এর মধ্যে মুসলিম ওবিসি এ তে আছে ৭৩ টি ও মুসলিম ওবিসি বি তে ৪৩টি গোষ্ঠী আছে।
১৭% ওবিসি সংরক্ষনের মধ্যে ১০% ওবিসি এ এবং ৭% ওবিসি বি বিভাগের জন্য। ওবিসি এ তে ৮১টি কমিউনিটি আছে তার মধ্যে মুসলিম ৭৩টি ও হিন্দু ৮ টি। ওবিসি বি তে ৯৫টি কমিউনিটি আছে তার মধ্যে মুসলিম ৪৩ টি ও হিন্দু ৫২ টি।
দেখা যাচ্ছে,পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরিচালিত ডাব্লুবিসিএস গ্রূপ সি পরীক্ষায় মুসলিম ওবিসি বি সম্প্রদায়ের ৪৩ টি গ্রূপের মধ্যে থেকে মাত্র একজন চাকরি পাবে! শুধু তাই নয়, চাকরির ক্ষেত্রে মুসলিম মহিলাদের অবস্থা যে খুব খারাপ তা এই ফলাফল প্রমান করেছে।
এখন মহিলাদের বিষয়ে ভাবার সময় এসেছে। কেন মুসলিম মেয়েরা চাকরির ক্ষেত্রে এতো পিছনে তা খতিয়ে দেখতে হবে। আরও একটা বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে,রাজ্য সরকারের ব্যুরো অব ইকনমিক ও স্ট্যাটিস্টিকস প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মচারীদের বিষয়ে নানা খুঁটিনাটি তথ্যের উপর ভিত্তি করে ‘স্টাফ সেন্সাস’ তৈরি করে। এখান থেকে জানা যেত কত মুসলিম চাকরি পেয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেই সেন্সাস আর প্রকাশিত হচ্ছে না। ওই রিপোর্ট প্রকাশ্যে এলে দেখা যাবে, শুধু বিসিএস সি নয়, চাকরির প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবস্থা বদলায়নি। মুসলিম মহিলাদের অবস্থা আরও খারাপ। বামফ্রন্ট সরকারের সময়েও মহিলাদের চাকরি তেমন হয়নি। ২০০৭-০৮ সালে প্রতিচির সাবির আহমেদের করা তথ্য অধিকার আইন বলে জানা যায়, প্রায় পঁচিশ হাজার পুলিশ কর্মীর মধ্যে মুসলমান মাত্র ৯.১৩ শতাংশ। এর মধ্যে মহিলার সংখ্যা ছিল মাত্র ২২। যদিও তখন সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়নি।
এবার মূল কথায় আসি, আমরা জানি একজন সংরক্ষিত প্রার্থী প্রথমে সাধারণ বিভাগে প্রতিযোগিতা করবে। সেখানে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলে সংরক্ষিত আসনে প্রতিযোগিতা করবে। সেইমতো প্যানেল হবে। সংরক্ষিত প্রার্থী যদি প্রতিবন্ধী হয় তবে সে প্রথমে সাধারণ, তারপর গোষ্ঠীগত সংরক্ষিত আসন, তারপর প্রতিবন্ধী আসনে  প্রতিযোগিতা করবে। একজন সংরক্ষিত আসনের মহিলা প্রথমে সাধারণ বিভাগে প্রতিযোগিতা করবে, সেখানে না পারলে সাধারণ মহিলা আসনে, সেখানেও না পারলে সংরক্ষিত বিভাগে এবং শেষে  সংরক্ষিত মহিলা বিভাগে প্রতিযোগিতা করবে। সংরক্ষিত আসনের প্যানেল বের করার সময় এই নিয়ম মেনে চলতে হয়।

যাইহোক,এবারের পিএসসি বিসিএস ফলাফল ও  গতবছরের জুনিয়র সিভিল ইঞ্জিনিয়ার পদের ফলাফলের মধ্যে কিছু মিল আছে। গতবারেও একজন মাত্র মুসলিম ওবিসি বি ক্যাটাগরিতে সফল হয়েছিল। অথচ মুসলিমদের একটা বিরাট অংশ ওবিসি বি-র অন্তর্ভুক্ত। গতবছর পিডব্লিউডি বিভাগে মাত্র একজন মুসলিম ওবিসি বি প্রার্থী সফল হয়েছে। ইরিগেশন এন্ড ওয়াটারওয়েজ ডিপার্টমেন্ট, মিউনিসিপাল এফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট, ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট ,পঞ্চায়েত এন্ড রুরাল ডেভলপমেন্ট, ওয়াটার রিসোর্ট ইনভেস্টিগেশন এন্ড ডেভলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট, পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ার ডিপার্টমেন্ট এবং এফএএআরএফডি বিভাগে একজন মুসলিম ওবিসি বি প্রার্থীও সফল হননি!
অন্যদিকে গতবছর মিউনিসিপাল এফেয়ার্স বিভাগ ও ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্টে একজন মুসলিমও সাধারণ বিভাগে উত্তীর্ণ হয়নি!
বর্তমানে ৯৫% মুসলিম ওবিসি সংরক্ষনের আওতায় এসে পড়েছে। কিন্তু এসসি, এসটি ও ওবিসি মিলিয়ে কত শতাংশ হিন্দু সংরক্ষনের আওতায় এসেছে তা কিন্তু আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তফসিলী জাতি ৬০, তফসিলী উপজাতি ৪০, ওবিসি এ ৮ এবং ওবিসি বি ৫২ অর্থাৎ মোট ১৬০ টি জনগোষ্টি সংরক্ষনের সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কত শতাংশ মুসলিম এসসি বা এসটিদের চেয়েও বঞ্চিত বা পিছিয়ে পড়া? সেই হিসাব কিন্তু সরকারের কাছে নেই বা সেই মতো কোনও সংরক্ষনের ব্যবস্থা নেই।
এই বিপুল সংখ্যক মানুষ সংরক্ষনের ভিতরে থেকে সাধারণ ক্যাটাগরিতে লড়ায়ে টিকতে পারছেতো? তথ্য কিন্তু অন্য কথা বলছে। শুধু বিসিএস পরীক্ষা নয়, অতীতের অনেক পরীক্ষায় সংরক্ষণ নীতি মানা হয়নি বলে অভিযোগ। আর এর ফলে সাধারণ মানের সংরক্ষিত প্রার্থীরা নির্দিষ্ট গন্ডির ভিতরে থেকে গেছে। তাই বিভিন্ন রিপোর্ট যখন সামনে আসে তখন দেখা যায়, মুসলিম সম্প্রদায় আছে সেই আগের মতোই পিছনে। অথচ বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে ভালো উন্নতি করেছে সম্প্রদায়টি। একুশ শতকের ডিজিটাল ভারতে পাল্লা দিয়ে পড়াশোনা করছে। শিক্ষার জাতীয় গড় হারের থেকে মুসলিমরা কিন্তু বেশি পিছিয়ে নেই। তার পরেও দশকের পর দশক সেই দুই,আড়াই শতাংশের গল্পের মধ্যেই কি এই সমাজের চাকরির ইতিহাস লেখা থাকবে? প্রায় তিন কোটি জনগণ আবার কবে মূল স্রোতে ফিরবে? যে লক্ষ্যে সংরক্ষণ দেওয়া হয়েছে তা কি পূর্ন হয়েছে? যদি সাধারণ কোটায় এতো কম সংখ্যক মুসলিম সুযোগ পায় তবে এই আধমরা সম্প্রদায়ের জন্য রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের সুপারিশ মেনে কম পক্ষে কুড়ি শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়া হোক। কেননা, বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল প্রমান করে দিয়েছে, এই রাজ্যে চাকরির ক্ষেত্রে মুসলিমরা সন্তোষজনক অবস্থায় নেই। তাই দেশ ও রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নে একটি পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীকে হাত ধরে তুলে মূল স্রোতে নিয়ে আসা আমাদের নৈতিক কর্তব্য।

head_ads