‘পদ্মাবত’ সিনেমা বানিয়া, মিডিয়া এবং ব্রাহ্মন্যবাদীদের সম্মিলিত চক্রান্ত

0

শরদিন্দু উদ্দীপন বিশ্বাস, টিডিএন বাংলা: পদ্মাবত সিনেমার প্রদর্শনী নিয়ে রাজপুত সমাজের কর্নি সেনা যে ভাবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় অবমাননা করে সন্ত্রাসের বাতাবরণ তৈরি করে চলেছে তা দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে এক চরম বিপদ সংকেত। বিশেষত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে যে ভাবে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং ছেলেমেয়েদের স্কুল বাসের উপর হামলা হয়েছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। রাজ্য প্রশাসনের মদত না থাকলে এমন গুণ্ডামি করা যায় না। মালিক মহম্মদ জয়সি’র রচিত কাল্পনিক রূপকথার চরিত্র পদ্মাবতীর “জহর” ব্রত পালনকে নিয়ে যে ভাবে হিন্দু আবেগ জাগিয়ে নৈরাজ্যের বাতাবরণ তৈরি করা হচ্ছে তা পরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্র।

পদ্মাবতী সিনেমা একটি বাহানা। আসল উদ্দেশ্য রাজনীতি এবং নির্বাচন। সম্প্রতি গুজরাট রাজ্যের নির্বাচন থেকে বিজেপি পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে যে ২০১৪ সালে তারা মানুষকে বোকা বানিয়ে যে আবেগ তৈরি করেছিল তা বুমেরাং হয়ে গেছে। কালোটাকা ফেরত নিয়ে আসা, দুর্নীতি বন্ধ করা, জিনিসপত্রের দাম কমানো, প্রত্যেকের আকাউন্টে ১৫০০০০০টাকা- প্রত্যেকটি প্রতিশ্রুতি নিছক ফাঁকা আওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে। “ সব কা সাথ, সবকা বিকাশ “ বা “মেকিং ইন্ডিয়া” নিছক কথারই কথা থেকে গেছে বরং “বিকাশ’ পরিণত হয়েছে বিনাশে।

Advertisement
head_ads

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনহীন ভাবে বেড়ে গেছে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। নোট বন্ধীর এবং জিএসটির মাধ্যমে যে ভাবে সাধারণ মানুষের সঞ্চিত টাকা কেড়ে নেবার চক্রান্ত হয়েছে তা অর্থনৈতিক অবরোধ ছাড়া কিছু নয়। মানুষের কাছে ধরা পড়ে গেছে যে এই অর্থনৈতিক অবরোধ আসলে ভারতীয় খাজানা লুট করে বানিয়াদের কর্জ মুকুব করা এবং আম্বানী, আদানী বা রামদেবদের কোষাগার স্ফীত করা। বিজেপির কাছে আগামী নির্বাচনগুলি পার হওয়ার জন্য এই রকম একটি ইস্যু খুব প্রয়োজন ছিল। তাই বানিয়া, মিডিয়া আর ব্রাহ্মন্যবাদীদের এই সম্মিলিত চক্রান্ত।
পদ্মাবত সিনেমার প্রযোজক Viacom 18 Media Pvt. Limited (owned by Reliance Industries) মুকেশ আম্বানী যার আসল মালিক। যে মুকেশ আম্বানী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি এবং বিজেপির নির্বাচনী বিতরণী সামলে দেবার অন্যতম কান্ডারী। এই মুকেশ আম্বানীরা জানেন কি ভাবে গিমিক তৈরি করে মানুষের ধর্মীয় আবেগকে উস্কে দেওয়া যায় এবং সেই আবেগ বেঁচে সম্পত্তির পাহাড় বানানো যায়। এতে দেশ গোল্লায় গেলেও তাদের কিছু এসে যায় না। এতে সাম্পরদায়িক হানাহানি শুরু হলেও তারা মুনাফার পরিসংখ্যান নিয়ে মত্ত থাকে। আর এই মুনাফাবাজদের লোভকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িক বিষ ঢেলে চলে কায়েমী স্বার্থান্বেষী অমানবিক শক্তি।

কার্নি সেনার প্রতিষ্ঠাতা লোকেন্দ্র সিং কালভি, সুরজ পাল সিং আমু বিজেপির দায়িত্বশীল নেতা। বিজেপির হয়ে এরা নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করেছেন। পদ্মাবত সিনেমার প্রাথমিক প্রদর্শনের সাথে সাথে এই নেতারা চিত্রনাট্য রচয়িতা এবং পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনসালীকে হত্যা করা এবং পদ্মিনীর ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য দীপিকা পাড়ুকোনের নাক কাটার জন্য ১০কোটি টাকার ইনাম ঘোষণা করে। এঁরা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকেও সূর্পণখার সাথে তুলনা করে হুমকী দেয়। আলাউদ্দীন খিলজীর সাথে পদ্মিনীর সম্পর্ক নিয়ে মিথ্যে কাহিনী বানিয়ে তারা রাজপুত জাতিকে তাতাতে শুরু করে এবং হিন্দু আবেগকে উস্কানি দিতে থাকে। প্রকাশ্যে এভাবে মানুষকে খুনের হুমকি এবং দাঙ্গার জন্য উস্কাতে থাকলেও এদের বিরুদ্ধে কোন প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যায় নি। বরং একেবারে বীরের মত এঁরা কিছু পোষা টিভি চ্যানেলে এসে সমগ্র দেশে নৈরাজ্য ছড়িয়ে দেবার জন্য চেষ্টা করে যায়। কোন মুসলমান বা দলিত নেতা এই ধরণের হুমকি দিলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসন এমন অপদার্থতা দেখাত কি?

সম্প্রতি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্ট নির্বিঘ্নে এই ছবি প্রদর্শনের জন্য নির্দেশিকা জানায় এবং রাজ্য সরকারগুলিকে ব্যবস্থা নিতে আদেশ দেয়। বিজেপির এই নেতারা সুপ্রিমকোর্টের সেই আদেশকে সম্পূর্ণ অবমাননা করে বিভিন্ন রাজ্যে শুরু করে দেয় তান্ডব ! ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং দেশের সম্পত্তি চরম ক্ষতি। বাদ যায়না স্কুল থেকে বাড়ি ফেরত ছোট ছোট শিশুরা। ভাবতে অবাক লাগে এই দেশের ভাবী শিশুরাও কর্নীসেনাদের শত্রু?

পদ্মাবতী সিনেমার চিত্রনাট্য বনসালী রচনা করলেও অন্য চিত্রনাট্য রচিত হয়েছে বিজেপির দপ্তর থেকে। এই চিত্রনাট্যের পিছনে রয়েছে মুসলিম বিদ্বেষ এবং হিন্দু জাগরণের জিগির। যে কোন মূল্যে তারা এই সিনেমার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষকে হিন্দু আবেগের মধ্যে জারিত করতে চায় এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভুলিয়ে দিয়ে মানুষকে নৈরাজ্য এবং অস্থিরতার মধ্যে ফেলে ভীত, সন্ত্রস্ত এবং দুর্বল করতে চায়। রোহিত ভেমুলার প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা, সাহিত্যক দাভোলকর, পানসারে, কালবুর্গী এবং অসুর কন্যা গৌরী লঙ্কেশের হত্যা এই চিত্রনাট্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একলাখ, নাজিব, জুনায়েদ আর্ত চিৎকার এই চিত্রনাট্যের গতিপথ। উনার চর্মকারদের উপর গোরক্ষক বাহিনীর নির্মম অত্যাচার এই চিত্রনাট্যের প্রয়োগ। ভীম আর্মির প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রশেখর আজাদের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ এই চিত্রনাট্যের অভিসন্ধি। কানাইয়া কুমার, উমর খলিদ, অনির্বাণদের উপর দেশদ্রোহীতার মামলা এই চিত্রনাট্যের কৌশল। ভীমা কোরেগাঁওয়ের শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর আক্রমণ এই চিত্রনাট্যের বীভৎস উপস্থাপন আর দেশ জুড়ে প্রলয় নামিয়ে আনা এই চিত্রনাট্যের ক্লাইম্যাক্স। এটা করতে পারলেই ব্রাহ্মন্যবাদ কায়েম হবে। সাধু পরিত্রাণ পাবে। দুষ্কৃত বিনাশ হবে এবং ধর্ম সংস্থাপন হবে। তাই একেবারে পরিকল্পিত ভাবেই দেশের ৬৯তম সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাগকালে পদ্মাবতী বা পদ্মাবত সিনেমার এই ব্যপক আয়োজন। দেশের সংবিধান, গণতন্ত্র এবং শান্তিপ্রিয় মানুষের স্বার্থে বানিয়া, মিডিয়া এবং ব্রাহ্মন্যবাদীদের এই দেশ বিভাগের চক্রান্তকে ধিক্কার জানাই।

(মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখক বিশিষ্ট তাত্ত্বিক দলিত নেতা ও এসসি এসটি ওবিসি সংগ্রামী মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক)

head_ads