ধর্মীয় উগ্রতা কোন পর্যায়ে পোঁছালে সমস্ত শুভবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা যায়! কোনো ধর্মের ঈশ্বরই মানুষ হত্যার অনুমতি দিতে পারে না। কারণ সব ধর্মানুসারে, পৃথিবী ও সমস্ত প্রাণীকূলের সৃষ্টিকর্তা হলেন স্বয়ং ঈশ্বর। তাই নিজের সৃষ্টি যদি তাঁর বিরোধিতাই করে, তার শাস্তি দেওয়ার মতো ক্ষমতাও রাখেন তিনি। তিনি কাউকে ‘সুপারি’ দিতে পারেন না। ধর্মরক্ষার সবথেকে বড়ো দায়িত্ব সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের।
এক্ষেত্রে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আবুল ফজল তাঁর ‘মানবতন্ত্র’ প্রবন্ধে সুচিন্তিত বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন, যা আমাদের ভাবাতে বাধ্য করে। সেই প্রবন্ধের প্রতিটি লাইনে ধর্ম ও মানবতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন প্রাবন্ধিক। বহুদিন আগে পড়া আজও আমি মনে করতে পারি। তিনি সেখানে ধার্মিক ও সাহিত্যিকের পার্থক্য তুলে ধরতে একটা উদাহরণের অবতারণা করেছিলেন। সেটা হলো, একজন ধার্মিককে যদি বলা হয় বিধর্মীকে হত্যা করলে সে স্বর্গলাভ করবে, তাহলে একাজ করতে সে ইতস্ততঃ করবে না। কিন্তু বিপরীতে একটা সাহিত্যিক তথা শুভবোধসম্পন্ন মানুষের কাছে মানব হত্যা করে স্বর্গলাভ তার চিন্তার বাইরে। সে বিশ্বাস করতে পারবে না সে ঈশ্বর এমন নির্দেশ দিতে পারে। কিন্তু ধার্মিক সম্ভব-অসম্ভবের বিচার করবে না। দুজনের মধ্যে ফারাক এক জায়গায়। আর তা হল অন্ধ বিশ্বাস আর অন্ধ অনুকরণ।
ধর্মরক্ষার জন্যেই  সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের উপর গুলি চালিয়েছিল বলে কর্নাটকের সিট বা বিশেষ তদন্তকারী দলের জেরায় স্বীকার করেছে শ্রীরাম সেনার সক্রিয় সদস্য পরশুরাম ওয়াঘমোরে। জেরার মুখে পরশুরাম যে কথা বলেছে, সে জানত না গৌরী লঙ্কেশ কে? তিনি নারী না পুরুষ। এমনভাবে তার মগজ ধোলাই করা হয়েছিল যে, সে এইসব প্রশ্ন করার কথা একবারও ভাবে নি। শুধু তাকে বলা হয়, এনার জন্য ধর্ম সঙ্কটে। আর সেই ধর্মরক্ষার জন্য ধর্মের ষাঁড় গোঁতা মারল নিরীহ লঙ্কেশকে। তাতে কিন্তু কট্টরপন্থী হিন্দুত্বের দিকটি আরো প্রকট হল। যারা তাকে লঙ্কেশ হত্যার নির্দেশ দিল, তারা কি প্রকৃত অর্থে ধার্মিক? তাদের ভিতরে কি সামান্য ধর্মবোধ আছে? এ ব্যাপারে বলা যায়, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান যাই হও না কেন, খাঁটি অর্থে যারা ধার্মিক তারা কখনও নিজের বা অপরের মনুষ্যত্বকে আঘাত হানতে পারে না। মানবতাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারেনা।