অনিরুধ দেশপান্ডে, টিডিএন বাংলা, উপসম্পাদকীয়:

অনুবাদ: মলয় তেওয়ারী

যখনই ভারতীয় জনতা পার্টি পরিচালিত ন্যাশনাল ডেমক্র্যাটিক এলায়েন্স(এনডিএ) ক্ষমতায় আসে তখনই গণমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ইতিহাস রচনার বন্যা বয়ে যায়—সেসবের মূল প্রতিপাদ্য থাকে এটাই যে হিন্দু ও মুসলমান দুইটি পরস্পর শত্রুভাবাপন্ন সাংস্কৃতিক সম্প্রদায় যারা সেই দিল্লীর সুলতানী আমলের শুরুয়াত থেকেই সংঘর্ষের সম্পর্কে আবদ্ধ। মধ্যযুগের ‘হিন্দু’ হিরোদের নামে রাস্তার নামকরণ শুরু করা এই পরিঘটনার আরেক প্রকাশ। তেমনই আরেক ফলশ্রুতি হল ভারতের ইতিহাসে ভালো মুসলমান খোঁজা। সঙ্ঘ পরিবার অফিসিয়ালি যে ধরণের সাম্প্রদায়িক ইতিহাস রচনাকে প্রোমোট করে তাতে সামরিক সংঘাতের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। সুতরাং তাদের এই প্রতিপাদ্যকে বিরোধ ও খন্ডন করতে আমাদেরও অবশ্যই সামরিক ইতিহাসকে গুরুত্ব সহকারে বিচার করে দেখতে হবে।

মজার কথা হলো, অতীত ভারতে হিন্দু ও মুসলমানের রাজনৈতিক সহকারিতা ও সহ-অবস্থানের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণগুলি সামরিক ইতিহাসই আমাদের সরবরাহ করে।

মে মাসটা ভারতীয় সামরিক ইতিহাসে হিন্দু-মুসলমান উপাদান আবার বিচার করে দেখার জন্য উত্তম মাস। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার সর্বোত্তম নিদর্শন পরলক্ষ্যিত হয়েছিল ১৮৫৭’র মহাবিদ্রোহের সময় যা ১৮৫৭-এর মে মাসে শুরু হয়েছিল। এই ছোট্ট লেখাটি ভারত-ইতিহাসের কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরতে চায় যা বর্তমান সময়ে ব্যাপক ভাবে চালু হওয়া সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের মূল উপস্থাপনাকে ভুল প্রমাণ করবে।

শুরুতেই আমাদের বুঝে নিতে হবে যে মধ্য যুগের ভারতীয় রাজনীতিতে, যেখানে মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের অভিজাতরা শাসন করত, একদম প্রথম দিক থেকেই মুসলমান যোদ্ধাদের, বিশেষত ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে, নিয়োগ করার প্রথা প্রচলিত হয়।
ঘোড়ায় সওয়ার ধনুর্ধরদের এবং পরবর্তীতে, অষ্টাদশ শতকের আগে থেকেই, টুফাং, বন্দুক ইত্যাদি তৎকালীন আগ্নেয়াস্ত্রধারীর চাহিদা ভারতে ছিল বিপুল। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যে ভারতের সুলতান ও বাদশাহরা তুর্কী, আরবী, পারসিক, পাঠান এবং মধ্য এশিয়ার উজবেক ও তাজিকদের মত মুসলমান গোষ্ঠির লোকেদের বিরাট সংখ্যায় নিয়োগ করছেন এমন তথ্য ভালো রকম নথীভূক্ত আছে।
মুঘলরা অটোমানদের বিশেষ ভক্ত ছিল এবং তাদের সামরিক কারিগরির ভিত্তি ও ব্যবস্থাপক ছিল “রুমি”-রা, অর্থাৎ অটোমান অঞ্চল থেকে আসা তুর্কীরা। যে তথ্য কম জানা তা হল তথাকথিত ‘হিন্দু রাজনীতি’-র পাঁচ-মেশালী সেনা বাহিনীতেও মুসলমানরা পদাতিক, ধনুর্বিশারদ,ঝটিকা ঘোড়সওয়ার বাহিনী এবং নৌ-সেনা-কাপ্তান হিসেবে কাজ করতেন।
ষোড়শ শতকে বিজয়নগর সেনাতে মুসলমান ধনুর্ধরদের একটি বাহিনী ছিল। ঐ শতকেই হলদিঘাটিতে রাণা প্রতাপকে সার্ভিস দিয়েছেন মুসলমান কমান্ডাররা। হলদিঘাটির যুদ্ধকে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ ভাবার যে মিথ চালু আছে তা এই বিশেষ তথ্যটি নাকচ করে দেয়। মারাঠা স্বরাজের স্থপতি শিবাজী সপ্তদশ শতকে তাঁর নয়া নৌবাহিনীতে এবং দ্রুতগামী সামরিক স্তম্ভে অনেক মুসলমান কমান্ডার নিয়োগ করেছিলেন আর উল্টোদিকে তাঁর বিরোধী শক্তি মুঘলেরা বিপুল সংখ্যায় রাজপুত সেনানায়ক ও তাদের দলকে নিয়োগ করেছিল। বিজাপুরের সেনাপ্রধান আফজল খাঁকে হত্যা করার পর শিবাজী তার সমাধিতে স্মৃতিসৌধ নির্মান করে পরিস্কার বার্তা দিয়েছিলেন যে দাক্ষিণাত্যের সুলতানী শাসনের সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব কোনভাবেই ধর্ম-সম্পর্কিত নয়।
দাক্ষিণাত্যে মুসলমান শাসকদের মধ্যে হিন্দু কমান্ডার নিয়োগ ও হিন্দু শাসকদের তার উল্টোটা করার ধারা অষ্টাদশ শতক অব্দি চলেছে। পেশোয়ারা তাঁদের ব্যক্তিগত বাহিনীর অঙ্গ হিসেবে মুসলমান যোদ্ধাদল রাখত।  বিভিন্ন মারাঠা সরদারদের দ্বারা সংগঠিত ও পরিপোষিত এবং গোত্র-নিয়ন্ত্রিত বাহিনীগুলির বিরুদ্ধে প্রতিষেধক হিসেবেই থাকত পেশোয়াদের এই নিজস্ব প্রাইভেট সেনা।
দাক্ষিণাত্যের সুলতান ও পরবর্তীতে হায়দরাবাদের নিজামদের প্রতিষ্ঠিত ধারায় এইসব যোদ্ধা দলের অধিকাংশই ছিল পরিযায়ি পাঠান যারা কালক্রমে দাক্ষিণাত্যেই বসবাস শুরু করেন সেখানকার সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়ে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে গাঙ্গেয় সমভূমি কর্তৃক আধিপত্য বিস্তারের আগ পর্যন্ত ভারতের সামরিক শ্রমের বাজার ছিল সুদূরপ্রসারিত ও বহু-বিচিত্র।
পর্তুগীজরাও মালাবারের মুসলমান ও‘টোপিস’দের মত মিশ্র জাত(হাফ-কাস্ট)-দের নিয়োগ করত  তাদের ভারত ভিত্তিক সেনাবহরে যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করেছিল।
ইব্রাহিম খাঁ “গর্দি” (আসলে আহমদ শাহ আব্দালির মতই একজন দুর্রানি) ও তাঁর ফরাসী-প্রশিক্ষিত গোলন্দাজ ও পদাতিক বাহিনীর কথাই বা কে ভুলতে পারে, যারা ১৭৬১র পানিপথের যুদ্ধে ইন্দো-আফগান জোটের বিরুদ্ধে নিজেদের সুন্দর বর্ণনা রেখে গেছেন। ইব্রাহিম খাঁ ও সদাশিব রাও “ভাউ”,১৭৬০-৬১র মারাঠা আর্মির দুই ডি ফ্যাক্টো কমান্ডার, পরস্পরের প্রতি গভীর বন্ধুত্বে আবদ্ধ ছিলেন। মুসলমান ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে নিয়োগ করার ধারা ভারতের স্থানীয় রাজন্যবর্গের দ্বারা উনবিংশ শতক অব্দি চলেছে।

মহারাজা পাঞ্জাব কেশরী রঞ্জিত সিং বিশাল সংখ্যক মুসলমানকে সামরিক ক্ষেত্রে সুযোগ দিতে পিছপা হননি, যদিও মুঘলদের বিরুদ্ধে গুরু গোবিন্দ সিংহের বিদ্রোহের স্মৃতি তখনও অমলিন। ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাই, যিনি লর্ড ডালহৌসির স্বত্ব বিলোপ নীতির ফলশ্রুতিতে ১৮৫৭র মহাবিদ্রোহে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যাওয়া এক ব্রাহ্মণ রাণী, ১৫০০ ঘোড়সওয়ারের সুশৃঙ্খল আরব বাহিনীকে নিয়োগ করেছিলেন যাঁরা তাঁর নেতৃত্বে ঝাঁসির বাইরে ব্রিটিশদের সাথে প্রবল লড়াই করেছিল।

১৮৫৭তে ঝাঁসির বিদ্রোহের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ রেখে গেছেন বিষ্ণুভাটজী গোডসে ‘মাঝা প্রভাস'(আমার ভ্রমণ) গ্রন্থে। সেখান থেকে দেখা যায়, অগ্রসরমান ব্রিটিশদের রুখতে আরব বাহিনীর ৪০০ জন প্রাণ হারায় কিন্তু তবু তাঁরা দৃঢ়তার সাথে কেল্লায় তাঁদের নিয়োগকর্ত্রীর পাশে থাকেন।  ১৮৫৮র মার্চ মাসের শেষে যখন রাণী ঝাঁসি থেকে পালিয়ে কাল্পির দিকে রওনা হন নানা সাহেব ও তাতিয়া টোপির সাথে ফোর্স নিয়ে যোগ দিতে তখন তাঁর মিশ্রিত সঙ্গীদলে  অঙ্গরক্ষক হিসেবে ছিল অনেক মুসলমান যোদ্ধা।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এই হিন্দু মুসলমান ঐক্য, যা এমনকি ঝাঁসির মত এক ব্রাহ্মণ শাসিত রাজ্যেও আরব যোদ্ধাদের সংযুক্ত করেছিল, স্যার সৈয়দ আহমেদ খান ১৮৫৮ সালে প্রথম বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থ  1857 Baghaavat, The Causes of the Indian Revolt (Asbab e Baghaavat e Hind) তে বলেছেন। গ্রন্থটি যখন প্রকাশিত হয় তখনও অভিযান চালিয়ে ঝাঁসির রাণীকে হত্যা করার ঘটনা বেশীদিন পেরোয়নি।

বর্তমান সময়ে আবোলতাবোল সাম্প্রদায়িক বুকনিতে লালিতপালিত ভারতেতিহাসের ছাত্রছাত্রীরা ১৮৫৭র গদরের আরেক বার্ষিকীর প্রাক্কালে এই তথ্যগুলি নিশ্চয় স্মরণে রাখবেন। তাদের একথাও অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে ভারত-ইতিহাস তথা সমাজে সমান ভোগ ও অংশীদারিত্বের(কমিউনিটরিয়ান) স্মৃতি ১৮৫৭-পরবর্তী ‘রাজ’-এ বিবিধ জাতীয়তাবাদের উত্থানের সাথে সাথে নাটকীয় ভাবে পাল্টে যায়।

আমাদের সময়ের অন্ধ ইতিহাস অনুরাগী আর সঙ্ঘী প্রকারভেদের সপ্তাহান্তিক ইতিহিসবিদেরা তাদের অনৈতিহাসিক সাম্প্রদায়িক প্রতিপাদ্য নিয়ে মিডিয়ার কাছে অগ্রসর হওয়ার আগে উপরে উল্লিখিত তথ্যগুলিতে একবার অবশ্যই মনোনিবেশ করবেন। ভারতের ইতিহাস ও সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি মোটেই পরস্পর খাপ খায়না। আমাদের সভ্যতার তথ্যভিত্তিক ইতিহাস “সভ্যতাগুলির সংঘাত” তত্ত্ব সমর্থন করেনা।
(লেখক অনিরুদ্ধ দেশপান্ডে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক।টিডিএন বাংলার পাঠক পাঠিকাদের জন্য অনুবাদ করেছেন মলয় তেওয়ারী)