স্কুল ও মাদ্রাসা শিক্ষার বেহাল দশা রাজ্যে, বিরোধীদের সাথে নিশ্চুপ বুদ্ধিজীবীরাও!

0

সুরাইয়া খাতুন, টিডিএন বাংলা : শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। মানুষ জন্মের পর থেকে আমৃত্যু শিখে চলে। “শিক্ষার শিকড়ের স্বাদ তেতো হলেও, এর ফল অত্যন্ত মিস্টি।” সেই মিস্টির লোভেই তো আমরা সবাই শিক্ষাগ্রহণ করি। এরিস্টটল বলেছিলেন,“সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হল শিক্ষা”। দেহ সুস্থ ও সবল না থাকলে শিক্ষা গ্রহণ সম্ভব নয়। তাই দরকার শিশুদের দরকার পুষ্টিকর খাবার। দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাসকারী শিশুদের শিক্ষার আঙিনায় আনতে ও ধরে রাখতে আমাদের দেশের সরকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিড-ডে-মিল।

এখন তো আমাদের পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার সীমা অষ্টম শ্রেণী থেকে বাড়িয়ে দশম শ্রেণী পর্যন্ত করতে ইচ্ছুক। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরনের ব্যবস্থা করার ফলে অভিভাবকরা চাপমুক্ত হতে পেরেছেন, একথা স্বীকার করতেই হয়। এসব ছাড়াও বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক প্রশংসনীয় প্রকল্প ‘কণ্যাশ্রী’র কথা ভুলতে পারি না। এই প্রকল্পটির দৌলতে উপকৃত বহু নাবালিকা মেয়ে ও তাদের মাতা-পিতা। কিন্তু এসবের মধ্যে কি কোথাও শিক্ষা ও তার মান হারিয়ে যাচ্ছে না!

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “শিক্ষা হল তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না, বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।” এই কাজে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা পালন করে আমাদের শিক্ষক। একটি স্কুলের পরিবেশে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সঞ্চালিত হয়। যেখানে শ্রেণীকক্ষে একাধিক শিক্ষার্থীদের জন্য একজন শিক্ষকের প্রয়োজন পড়ে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদানের জন্য। বেশিরভাগ দেশে আজ নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সব শিশুদের জন্য পূর্ণ-সময়ের শিক্ষা স্কুলে বা অন্যত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষার দুটি অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। এই শিক্ষার্থী তো বিদ্যালয়ে আসছে শিক্ষাগ্রহণের জন্য, কিন্তু শিক্ষাদাতা নেই।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের কাম্য অনুপাত (৩০:১) দেখা যায় না। সেটা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে সর্বত্র একই দৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে স্কুল বিল্ডিং, শিক্ষা উপকরণ সব কিছুই আছে শিক্ষার্থীদের কাছে, শুধু নেই তাদের শিক্ষাগুরু। কোথাও কোথাও অবস্থা আরো বেহাল! শিক্ষকের অভাবে বিদ্যালয়ের পড়াশুনা লাঠে উঠেছে। এ নিয়ে সরকারের কোনো হেলদোল নেই। বুদ্ধিজীবীদের কেউ রাস্তায় নামতে দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীরা তো দেশের ভবিষ্যত। এই ভবিষ্যতদের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে একটু ভাববার অবকাশ কি নেই?

এইসব শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদেরও করুণ অবস্থা। শিক্ষাদানের মহান ব্রত যাদের, যারা জাতি গঠনের কারিগর তাদের ভবিষ্যৎ আজ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত। শিক্ষকের ভূমিকা সম্পর্কে বলা যায়, একজন শিক্ষক তাঁর স্বীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করে, তাদের নৈতিক শিক্ষা দিয়ে, কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলে তাদেরকে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন। একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন তার অনুসারীদের জ্ঞান ও ন্যায় দীক্ষা দিতে, শিক্ষার্থীর মানবতাবোধকে জাগ্রত করতে।

একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকে সার্থকই করে তোলেন না, পাশাপাশি দেশের উন্নয়নকে ত্বরাণ্বিত করেন। এই শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে সরকারের তেমন উদ্যোগও চোখে পড়ছে না। যা হতাশ করেছে শিক্ষানুরাগীদের। গত ছয় বছরে যে-সব সরকারি এবং সরকার পোষিত স্কুল শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রেখে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের, অপরদিকে যুবসম্প্রদায়ের একাংশের, যারা শিক্ষকতার সাথে যুক্ত হতে চায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরীতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চায়, তাদেরও প্রভূত ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার মান কতটা উন্নত হবে, শিক্ষাবিদেরাও তা নিয়ে চিন্তিত।

শিক্ষক নিয়োগ না-করে যে-ভাবে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল গড়া হচ্ছে, তাতে শিক্ষার মান বাড়তে পারে না। চাকরি প্রার্থীরা ধৈর্যহীন হয়ে পথে নামতে, অনশন করতে বাধ্য হচ্ছেন। তার ফলস্বরূপ, লিখিত পরীক্ষার রেজাল্ট ও ইন্টারভিউ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু হচ্ছে না। হেলেন কেলারের মতে, “শিক্ষার চূড়ান্ত ফল হচ্ছে সহনশীলতা।” আমরা শিক্ষিত যুব সমাজ কি সেই সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছি না?