আগ্রাসন উর্দুর নাকি উগ্রত্ববাদীর?

0
সুরাইয়া খাতুন

সুরাইয়া খাতুন, টিডিএন বাংলা : বাংলা ভাষা ও বাংলা ভাষা শিক্ষকের এত মর্যাদা দেখে আবেগে চোখের জল থামছেই না। এত্তো কদর, এত্তো চাহিদা! বাংলা ভাষা এবার জাতে উঠেছে মনে হচ্ছে। এবার আমরা জামার কলার তুলে বলতে পারবো, “আমি বাংলা ভাষার ছাত্রী”। আর কেউ হয়তো কথাটা শুনে নাক সিটকাবে না। যোগ্য মর্যাদা পাবো বোধহয় এবার!


আমরা বাংলা ভাষার ছাত্রছাত্রীরা, নিজেদের বাংলা ভাষাকে যেমন ভালোবাসি, তেমনি অন্য ভাষাগুলোকেও সম্মান করি। কারণ আমরা ভাষাকে রাজনৈতিক ইস্যু বানাতে পারি না। ভাষার ট্যাগ দেখে তার ধর্ম বিচার করতে বসে পড়ি না। সংস্কৃত ভাষা মানেই হিন্দু; আরবি, উর্দু ভাষা মানেই মুসলিম। এ দেশের সাধারণ লোকজনও অনেকেই ভাবেন উর্দু হল মুসলমানি ভাষা। আর সংস্কৃত হল হিন্দুয়ানি ভাষা। সেই সব বোদ্ধারা জানে নিশ্চয়, রাজা রামমোহন রায় আরবী, উর্দু ভাষার সুপন্ডিত ছিলেন। তাঁর পত্রিকা ‘তুহুফাৎ-উল মুয়াহিদিন’ সম্পাদনা করেন উর্দু ভাষায়। তাহলে কি তিনি মোল্লাদের দলভুক্ত?

স্কুলের  গন্ডিতে তৃতীয় ভাষা সাহিত্য হিসেবে উর্দু ভাষা শিক্ষাকে ‘উর্দুর আগ্রাসন’ বলে অনেকেই বাজার গরম করেছেন। কিন্তু তারা জানে কি এটা সম্পূর্ন ঐচ্ছিক ব্যাপার? আমি মুসলিম হয়েও সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীতে সংস্কৃত ভাষাকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে নির্বাচন করি, বিকল্প হিসেবে আরবি ভাষা থাকা সত্ত্বেও। কারণ ওই কাঁচা বয়সেও আমার মধ্যে নতুন একটা ভাষা শেখার প্রতি একটা টান কাজ করেছে। আর তাতে বাড়ির সম্পূর্ণ সমর্থনও পেয়েছি। ঠিক তেমনি আমার কিছু মুসলিম বন্ধু সংস্কৃত ভাষায় সাম্মানিক (অনার্স) করেছে। কারণ আমরা ভাষার গায়ে কোনো ধর্মের গন্ধ পাই নি।

কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ অনেকেই পাচ্ছে ইসলামপুরের ঘটনায়। “উর্দু শিক্ষকের বদলে বাংলা শিক্ষক চাই বলে ছাত্ররা আন্দোলন করছে”। এই সুযোগে সুবিধাবাদীরা বাংলার ভাষার সেন্টিমেন্ট জাগিয়ে উর্দুকে ভাষা ‘ঘৃণিত’ আখ্যা দিয়ে  ‘বাংলা ভাষা বনাম উর্দু ভাষার’ লড়াই বলে ঘটনাটির নতুন মাত্রা দিতে তৎপর।তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের উর্দুর পরিবর্তে বাংলা ভাষার প্রতি এত দরদ দেখে মনে সন্দেহ আসা স্বাভাবিক। এই এরাই দেখবে নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরাজী মাধ্যমের কোনো স্কুলে পাঠায়। আর বাংলার জন্য রাস্তায় নামে!

সংকীর্ণ হিন্দুবাদিরা না কি উর্দুর আগ্রাসন থামাতে বদ্ধ তৎপর। কিন্তু সত্যি কথা বলতে উর্দু কখনওই আগ্রাসী ভূমিকায় নেই। কারণ হিন্দি আগ্রাসনের রাষ্ট্রীয় প্ল্যাটফর্ম আছে, উর্দুর তা নেই। রাজনৈতিক ক্ষমতালোভীরা যে ভাষাকে ঢাল করে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার নোংরা খেলায় মেতেছে, সেটা বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে। তাই দাড়ভিট স্কুলে সংস্কৃত আর উর্দু দুই বিষয়ের শিক্ষককে ঘিরে ঝামেলা হলেও সব রাগ গিয়ে পড়েছে উর্দুর ওপর। শুধুমাত্র উর্দু ভাষা আর তার শিক্ষক আজ হেনস্থার শিকার। পুলিশের জেরার মুখে পড়ে। কই সংস্কৃত শিক্ষককে তো এসবের মধ্যে পড়তে হয় নি। কারণটা খুব স্পষ্ট। বলার অপেক্ষা রাখে না, ধর্মের দিকটা এখানে জোরদার কাজ করছে। মুসলমানি গন্ধ পেলেই আপত্তি উঠে আসে।