আরব বিশ্ব রোহিঙ্গাদের জন্য শুধু দোয়া করবে আর মুসলিমরা আগুনে পুড়ে মরবে?

সৈয়দ রশিদ আলম, টিডিএন বাংলা : ঢাকা থেকে প্রকাশিত একাধিক জাতীয় দৈনিকে মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের, মংডু শহরের রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর মায়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচারে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রোহিঙ্গারা যে সব গ্রামে বসবাস করেন সেখানে মায়ানমার সেনাবাহিনী শত শত ঘরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে, নারীদের ধর্ষণ করছেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আগুনে পুড়িয়ে মারছে। আর যারা রোহিঙ্গাদের হত্যার নির্দেশ দিচ্ছে ও হত্যা করছে তারা প্রত্যেকেই মহান গৌতম বুদ্ধের অনুসারী। গৌতম বুদ্ধের মূল শিক্ষা হচ্ছে জীবহত্যা মহাপাপ। মায়ানমারের প্রতিটি বৌদ্ধ জনগণ এই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। কিন্তু তারাই অসহায় মুসলমান রোহিঙ্গাদের হত্যা করছে, ধর্ষণ করছে ও আগুনে পুড়িয়ে মারছে। তাহলে কি রোহিঙ্গা মুসলমানরা কোনো জীবের মধ্যে পড়ে না? মায়ানমারের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সুকি শান্তিতে অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

বিশ্ববাসী ও মায়ানমারের জনগণ আশা করেছিল, সুকির দল যেহেতু ক্ষমতায় এসেছে মায়ানমারে শান্তি ফিরে আসবে। কারণ, যিনি মায়ানমারবাসীকে গণতন্ত্র উপহার দিতে পেরেছেন তিনি নিশ্চয়ই মায়ানমারে শান্তি কায়েম করবেন। কিন্তু বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে অং সান সুকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর অত্যাচারের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু অং সান সুকি কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন না, কারণ কি? মায়ানমারের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিমালা সামরিক কর্মকর্তারা তৈরি করলেও ক্ষমতার অন্তরালে থেকে মূল নির্দেশনাটা মায়ানমারে বৌদ্ধ পন্ডিতরা দিয়ে থাকেন। তারা যে নির্দেশ দেন সেই নির্দেশকে মায়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনী পালন করতে বাধ্য থাকে। প্রায় তিনশো বছর থেকে মায়ানমারের বিভিন্ন শহরে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বসবাস করছে।

মায়ানমারের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা পালন করছে। মায়ানমারের কৃষি উন্নয়নে রোহিঙ্গা মুসলমানদের অবদান সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তাদেরকে সবচাইতে বেশি অবহেলা করা হয়, কারণ রোহিঙ্গারা মুসলমান। রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক হলেও মায়ানমারের দানব শাসকেরা তাদের রোহিঙ্গা বলতে রাজি নন। তাদের ভাষায় রোহিঙ্গারা বাঙালি। গত ৩০ বছর থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর মায়ানমারের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনী সীমাহীন অত্যাচার চালিয়ে আসছে, কিন্তু বিশ্ব বিবেক এই বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন না, যার ফলে মায়ানমারের সেনাবাহিনীর সাহস অনেক বেড়ে গেছে। সুকির দল ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দুবার মায়ানমার সফর করেছেন। তিনি সব বিষয়ে কথা বলেছেন, শুধু রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে কথা বলতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, কারণ যুক্তরাষ্ট্র মায়ানমারে তার পণ্য ও সমরাস্ত্র বিক্রি করতে চায়। মায়ানমার সেনাবাহিনী কাকে হত্যা করল এটা দেখার সময় মানবাধিকারের প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি, যার বেশির ভাগ সদস্য মুসলিম দেশ তারাও নীরব। নীরবতার মূল রহস্য রোহিঙ্গা মুসলমানরা দরিদ্র। দরিদ্র মুসলমানদের পাশে বিত্তবান মুসলমান বা খ্রিষ্টান কেউই পাশে দাঁড়াবেন না, কারণ তাদের মধ্যে দরিদ্রের প্রতি মমতাবোধ বলতে কিছুই নেই। তারা যে ধর্ম বিশ্বাসী হন না কেন দরিদ্রদের, অসহায়দের প্রতি তাদের কোনো মমতাবোধ থাকবে না, এটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে।

বিশাল মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক মুসলিম দেশ ইচ্ছা করলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিতে পারত। কিন্তু তা তারা করবে না। তারা শুধু রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য দোয়া করে যাবেন, আর রোহিঙ্গা মুসলমানরা আগুনে পুড়বেন, দেশান্তরিত হবেন, ধর্ষিত হবেন আর সারা পৃথিবী তা দেখতে থাকবে। আর এরাই জাতিসংঘে গিয়ে বিশ্ব শান্তির জন্য বক্তব্য রাখবেন। শুধু রোহিঙ্গা মুসলমান নয়, সারা পৃথিবীর নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের হাহাকার ও কান্নার ধরন একই রকম। একই নোনাজলে তাদের চোখ ভরা। এই চোখের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব বিবেক কি তাদের দায়িত্ব কিছুটা পালন করবে না? (লেখকের লেখাটি ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর লেখা। ‘আমাদের অর্থনীতি’ তে প্রকাশিত প্রাসঙ্গিকতা থাকায় টিডিএন বাংলায় প্রকাশ করা হল)