যুদ্ধের ভয়াবহতায় বিপর্যস্ত শৈশব

0

পাঠকের কলমে, টিডিএন বাংলা : “ইহাদের করো আশীর্বাদ। ধরায় উঠেছে ফুটি শুভ্র প্রাণগুলি, নন্দনের এনেছে সম্বাদ, ইহাদের করো আশীর্বাদ। ছোটো ছোটো হাসিমুখ জানে না ধরার দুখ, হেসে আসে তোমাদের দ্বারে।” -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২০১৫-র এক বিকেল। লাল জামা পরা ছোট শিশুর নিথর দেহটি উপুড় হয়ে পড়ে আছে ভূমধ্যসাগরের তুরস্কের উপকূলে সমুদ্র সৈকতে। এই শিশুটির চরম অমানবিক পরিণতি আজও সবার স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল। ঝাপসা হয়ে যায়নি নিশ্চয়। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। নাম তার আয়লান কুর্দি। সবে জীবনের পাঁচটা বছর পার করেছিল ছোট্ট ছোট্ট পায়ে। তারপরেই নিভে যায় জীবন-দীপ। যুদ্ধকবলিত সিরিয়া থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ইউরোপের পথে পরিবারসহ পাড়ি দিয়েছিল সে। পথে নৌকা ডুবে সলিল-সমাধি ঘটে তার। মরদেহ ভেসে উঠে সৈকতে।

তারপর ২০১৭ সাল। নাফ নদীতে একের পর এক রোহিঙ্গা শিশুদের ভেসে আসা মৃতদেহ। এরকম কত শত শত শিশু-কলি প্রস্ফুটিত হওয়ায় আগেই অকালে ঝরে যাচ্ছে তার হিসাব নেই। সমীক্ষায় জানা যায় এক-চতুর্থাংশ শিশু যুদ্ধপীড়িত। শিশুরা যে নিষ্পাপ তা বোঝে না সহিংস যুদ্ধ। শিশুরা মর্ত্যের দুনিয়ায় আসা এক টুকরো স্বর্গ। বিশুদ্ধ মানবতার মন। প্রাপ্ত বয়স্কদের মানবিক রাখার প্রেরণা। তাদের হত্যা মেনে নিলে মানবতার ধ্বংস অনিবার্য। অনেক সময় পৃথিবীর ন্যায়যুদ্ধেরও প্রধান শিকার শিশুরা।

বর্তমানে সিরিয়ায় যে জায়গাটা এখন মুসলমানদের লাশের স্তূপ সেখানে প্রতিদিন ঝরে যাচ্ছে তাজা তাজা প্রাণ।
রাজধানী দামাস্কের পার্শ্ববর্তী পূর্ব ঘৌটায়
গত এক মাসে সিরিয়ায় সিরিজ বোমা হামলায় নিহত প্রায় ৫০০ এরও অধিক, এদের মধ্যে শিশু রয়েছে প্রায় ২০০।

যখন নিরীহ মানুষের রক্তের স্রোত দেশ-কালের সীমানা অতিক্রম করে আমাদের সামনে প্রবাহিত হয়, তখন চোখ ফিরিয়ে নিই কিভাবে!  সুদূর সিরিয়ার যুদ্ধের ভয়াবহতায় শিউরে উঠি। সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও আগ্রাসনের ফলেই চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন সিরীয়বাসী। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।

সিরিয়ায় ঘন ঘন বোমা নিক্ষেপ, নির্মম হত্যালীলায় বিপন্ন শৈশব। একটি মাত্র অক্সিজেন মাক্সে ভাইয়ের জীবন সুরক্ষিত করতে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গনে রাজি হওয়া (প্রকৃত অর্থেই মাতৃতুল্য) একরত্তি দিদি। রক্তে রাঙানো সন্তানের লাশ কোলে নিথর বাবা, বন্দুকের নিশানায় খুদে (যার মধ্যে ভয়ের অনুভূতি কেমন, সেটাও সে জানে না), নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সন্তানকে নিয়ে ছুট, রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত শিশুমুখ, বাঁচতে চাওয়ায় আকুতি, ক্ষুধাতুর চাহনি ইত্যাদি নানা দৃশ্য যেন আমাদের সকলকে তাদের বিপন্নতার কথা, অসহায়তার কথা চিৎকার করে জানান দেয়। আর আমরা নিরুপায়ের মতো তাদের জন্য দোয়া-প্রার্থনা ছাড়া কিছুই করতে পারি না! আবার কখনো বা চোখ বন্ধ করে নিই। মস্তিষ্কের কোষগুলি যেন অবশ হয়ে আসে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, কুর্দি, বাশার আসাদ সরকার- এদের প্রত্যেকেরই স্বার্থে ছোট্ট সোনারা হচ্ছে বিপন্ন।

সিরিয়ার কচি কচি প্রাণগুলোর ঝরে যাওয়া, স্তূপীকৃত লাশের পাহাড় আমরা দেখতে পাই নি। সেই সময় আমরা আমাদের মিডিয়ার দৌলতে রহস্য উন্মোচনে ভীষণ ব্যস্ত  ছিলাম। তারপর বেশ কিছুদিন পরে অবশ্য, কিছু সংবাদ মাধ্যমে এই ব্যাপারটা জায়গা পায়। আর সংবাদ মাধ্যমে হয়ত সেই কচি কচি প্রাণ “সন্ত্রাসবাদী” আখ্যায়িত হবে, যারা এর বানানটাও শেখেনি। তবে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর খবর শুনে ভালো লাগলো। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, কোনো এক শিখ পাপাজি সিরীয়বাসীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। যেটা মনে করার কিছু পৃথিবীর মাটি থেকে মনুষ্যত্ব নামক দুর্লভ জিনিসটা একেবারে লুপ্ত হয়নি।

ভারতীয় প্রাক্তন ক্রিকেটার মোহাম্মদ কাইফ তার টুইটার একাউন্টে সিরিয়ার রক্তনদীর পোস্ট করে একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন বুদ্ধিজীবীদের প্রতি, যদি এই হত্যালীলা লন্ডন বা প্যারিসে হতো, তখনো কি এমন নিশ্চুপ, ভাবলেশহীন ভাবেই থাকত বিশ্ববাসী? সিরিয়া পশ্চিম এশিয়ার একটা মুসলিম অধ্যুষিত  দেশ বলেই কি এতো উদাসীনতা? তাঁর সাথে গলা মিলিয়ে আমরাও বলি, বিশ্ব-বিবেক চুপ কেন? মানবতাবাদী সংবেদনা কেটে ফেলে দিয়েছ কি? থরে থরে সাজানো অজস্র মৃতদেহ কি নাড়া দেয় না? সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও আগ্রাসনের সামনে মানবতা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না কেন? বসন্তে রঙের হোলির সমান্তরালে নরখাদকদের রক্তের হোলি কি মানানসই?

বিশ্ব বিবেক জাগবে কবে ?

ভাঙাও তোমার ঘুম।

সিরিয়ায় আজ চেয়ে দেখো

রক্ত লাশের ধুম।

সুরাইয়া খাতুন

উস্থি, ডায়মন্ড হারবার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা