নারীর সম্মান যখন বদ্ধ  নীরবতার শৃঙ্খলায়

0

পাঠকের কলমে, টিডিএন বাংলা : একজন নারী সে নিজেকে যতটা হীন   মনে করে, তার থেকে তার স্থান যথেষ্ট উঁচুতে। জীবনের প্রত্যেকটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে তার রয়েছে নিজস্ব স্বাধীনতা। কোরান, হাদীসে তার মর্যাদা ঘোষণা করার পরও সে নিজেকে মর্যাদাবান একটি সত্ত্বা মনে করার ব্যাপারে এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও সম্পূর্ণ রুপে গাফিল। কোরান যখন তাকে জান্নাতের দ্বার রুপে মর্যাদা দিয়েছে সে তখনও নিজেকে ফ্যাসাদের কেন্দ্র হিসাবে মনে করে সমস্ত কিছু থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।

বিয়ে দুটি জীবনকে মিলিত করার স্রষ্টা প্রদত্ত এবং সামাজ সম্মত সব থেকে আর্দশ উপায়। বিয়ে যে শুধু দুটি জীবনের মিলন ঘটে তা নয়, জীবনের সাথে দুটি আত্মা ও দূটি স্বপ্নের মিলন ঘটে। বিয়ে প্রত্যেক মানুষের কাছে জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও বটে, যার মাধ্যমে দুটি  জীবন এক হয়ে সূচনা করে জীবনের নতুন পর্ব। আর বিয়ে নামক এই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমন্ধে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নর-নারী নির্বিশেষে সকলের জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত অধিকার।

স্বয়ং হজরত মুহাম্মদ(সাঃ) নিজের কন্যার বিয়েতে কন্যার মতামতকে অধিকতর প্রাধান্য দিয়েছেন। কৈশর পেরিয়ে যখন একজন নারী  যৌবনের দোরগোড়াতে পৌছায় তখন রীতিমত নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার জলাঞ্জলি দিয়ে পরিবারের পচ্ছন্দ মত পাত্রের সাথে নতুন জীবন শুরু করতে রাজি হয় নীরবে, এমন কী তার বিয়েটা যখন হয় বিনিময় তথা পণের মাধ্যমে। বিবাহ যখন তার জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সে তখন কীভাবে নিজেকে মত প্রকাশ থেকে দূরে রাখতে পারে? পবিত্র কুরআন-হাদীস যেখানে তাকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে সেখানে নিজেকে নীরব রাখাটা একটা বোকামিই বটে।

তার এই হীনমন্যতার মাসুল যে তাকে শুধু একাকে দিতে হয় তা নয়, তার সাথে সাথে তার জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা মানুষ গুলো কেও দিতে হয় তার অজান্তে। বিয়েকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে নানা রকম রশম-রেওয়াজ। বর্তমান প্রচলিত সমাজে বিয়ে কেন্দ্রিক এই রশম পালনের জন্য নেমে আসে আড়ম্বরের ঢল। একজন নারী তার বিয়ের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যখন আড়ম্বরতার ঢল নেমে আসে তখনও সে নীরব থাকে। আজকের সামাজে বিয়েকে কেন্দ্র করে জাঁকজমকের বহর যে শুধু বিত্তশালীদের মধ্যে আবদ্ধ আছে তা নয় এই জাঁকজমকের ব্যাপারটা মধ্যবিত্তদের মধ্যেও সমানভাবে বিরাজমান।

প্রত্যেক বাবাই চান তার মেয়ের ধুমধামের সাথে বিয়ে দিতে। আর প্রচলিত সমাজের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে এই জাঁকজমকের আয়োজন প্রচেষ্টায় অনেক সময় কন্যার বাবার টান পড়ে পকেটে।যখন তার পকেটে টান পড়ে সে তখন বেছে নেয় ঋণের পথ। একজন নারী বাবার এই দূরাবাস্থার  নিজের চোখে দেখেও, নিজের বাবাকে এই জাঁকজমকের আয়োজন থেকে বিরত রাখার পরির্বতে নীরবে তাকে উৎসাহ দিতে থাকে।

দুটি জীবন ও দুটো পরিবারের মিলনের জন্য কী আসলেই এত আড়ম্বরের প্রয়োজন? একজন বাবার কাছে তার কন্যার পণ দিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়াটা ভারি লাগার পরির্বতে কর্তব্যের মধ্যে পড়ে যায়। আর কন্যা নিজেকে হীন মনে করে ভালোমন্দ  সব কিছু মেনে নেয় নীরবে। কিন্তু সে হয়তো জানেনা তার মত প্রকাশ তার সম্মান বৃদ্ধি করার সাথে তার বাবাকে বাঁচাতে পারে ভবিষ্যতের  কঠিন পরিস্থিতির হাত থেকে।

পাত্র পক্ষ যখন পণের দাবি করে সে তখন কেন তাদের শক্ত কথায় বলতে পারেনা  যে সে অর্থের বিনিময়ে বিক্রির বস্তু নয়? নিজের পচ্ছন্দ-অপচ্ছন্দকে কুরবানী দিয়ে নিজের সত্ত্বার সাথে কীভাবে খেলে ধোঁকাবাজির খেলা? কীভাবে সে স্বপ্ন দেখে সেই নতুন জীবনের যেই জীবন তার বাবার গাঢ় দুশ্চিন্তা দিয়ে তৈরী? সে কী পারত না তার বাবার কাঁধ থেকে দুশ্চিন্তার পাহাড় নামাতে? হয়তো  এই জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠানে  বাধা দিলে তার বাবার সাথে তার বনিবনা ঘটতে পারে, হয়তো বাবার চোখে কয়েক দিনের জন্য সে অপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে কারণ তার বাবার কাছে  কন্যার বিয়ে ঘটা করে দেওয়াটা সেই মূহুর্তে একটা জেদ এ পরিণত হয়ে ওঠে । কিন্তু তার এই মত প্রকাশের কারণে তার বাবার রাতে ঘুমটা হয়তো নিশ্চিন্তে হতে পারে ।

নারীকে নীরবতার অবগুণ্ঠন ফেলে বার হতে হবে, কারণ শিক্ষা থেকে শুরু করে জীবনের প্রত্যেকটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে তার মত প্রকাশের স্বাধীনতা  স্রষ্টা প্রদত্ত।
যেদিন নীরবতার জাল ছিঁড়ে নারী মতপ্রকাশ করবে সে দিন পণপ্রথা নামক জঘন্য প্রথার অবসন ঘটবে। যে দিন নারী তার হীনমন্যতা দূর করে নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে উপলব্ধি করবে সে দিনই সে যোগ্য মর্যাদার অধিকারী হবে।

আফরিদা খাতুন
পাঁচলা, হাওড়া

tdn_bangla_ads