নাম বিকৃতির ফলে হারিয়ে যাওয়া মুসলিম মণীষী গন

সেখ সাদ্দাম হোসেন, টিডিএন বাংলা : জ্ঞান বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিল্প সাহিত্য ও বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমান দের যে শ্রেষ্ঠ অবদান রয়েছে তা আমরা অনেকেই জানিনা। জ্ঞান -বিজ্ঞানের প্রায় সকল ধারা বা শাখা প্রশাখা মুসলিম মণীষীদেরই আবিস্কার। বলা যেতে পারে তাঁদের মৌলিক আবিস্কারের উপরই বর্তমান জ্ঞান-বিজ্ঞানের অধিষ্টান। মুসলমান দের জ্ঞান চর্চা করেই অমুসলিম বিশ্ব আজ উন্নত। কিন্তু পাশ্চাত্ত্য সভ্যতার ধারক ও বাহক এবং তাদের অনুসারী ইউরোপীয় পন্ডিতগন ষড়যন্ত্র মুলক ভাবে মুসলিম মণীষীদের নাম মুসলমান দের স্মৃতিপট থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য ইসলামের ইতিহাস এবং মুসলিম বিজ্ঞানীদের নাম কে এমন বিকৃত ভাবে লিপিবদ্ধ করেছে যে নাম দেখে বোঝার উপায় নেই ইনি একজন খাঁটি মুসলমান। ফলে সঠিক ইতিহাস অবগত না থাকার কারনে, সভ্যতার উন্নয়নে মুসলমান দের কোন অবদান নেই বলে প্রচার করা হয়। অথচ সভ্যতার উন্নয়নের মূলেই অমুসলিম গন মুসলিম মণীষীদের কাছে ঋণী। তাই সঠিক ভাবে অতিতের ইতিহাসে পদচারণা করলেই ফুটে ওঠে অসাধারণ প্রতিভার গুনে গুনান্বিত কিছু অবিস্মরণীয় মুসলিম মণীষী ব্যাক্তিত্ব। তাদের মধ্যে উল্লখযোগ্য হল “দ্বিতীয় এরিস্টটল” বলে খ্যাত আবু নাসের মোহাম্মাদ (৮৭০-৯৬৬)। যিনি নাম বিকৃতির কুফলে হয়ে যান “আল ফারাবী’। পদার্থ বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র, গণিত শাস্ত্র, চিকিৎসা বিজ্ঞান সহ বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা বাকি ছিলনা যেখানে আবু নাসের মোহাম্মদের প্রতিভা বিস্তৃত হয় নি। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক দের মধ্যে অন্যতম আল ফারাবীই প্রথম পদার্থ বিজ্ঞানে “শূন্যতার” অবস্থান প্রমাণ করেছিলেন।

আবার চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্বন্ধে বলতে গেলে যার নাম প্রথমে ভেসে ওঠে তিনিও এক মুসলিম তাপস। “মানব দেহে রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা কে আবিস্কার করেছিলেন?” “ফুসফুসের নির্মাণ কৌশল কে সভ্যতাকে সর্ব প্রথম অবগত করিয়েছিলেন?” “শ্বাসনালির অভ্যন্তরীন অবস্থা কেমন?” “মানবদেহে বায়ু ও রক্ত প্রবাহের মধ্যে ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার ব্যাপারটা কী?” এসব প্রশ্নের উত্তরে যাঁর নাম এককভাবে উচ্চারিত হয় তিনি হলেন আলাউদ্দীন আবুল হাসান আলী ইবনে আবুল হাজম ইবনুন নাফিস আল কোরায়েশি (১২০৮-১২৮৮)। এয়োদশ শতাব্দীর চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিপ্লবের সূচনাকারী “ইবনুন নাফিস” ছিলেন অতি বিশিষ্ট দক্ষ এক ইমাম ও অতি উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞ হাকিম। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বহু গ্রন্থের প্রনেতা হিসাবে মৃত্যুরপূর্ব পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর অবদান সর্বাধিক। হৃদপিণ্ডের এনাটমি নিয়ে পূর্বের মতবাদকে খন্ডন করে তাঁর দেওয়া মতবাদ বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানে সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত বলে গৃহীত হলেও বিজ্ঞান জগতে তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় নি।
পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, জ্যামিতি, গনিত, চিকিৎসা বিজ্ঞান, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে শতাধিক গ্রন্থ রচনাকারী মুসলিম মণীষী আবু আলী আল্‌ হুসাইন ইবনে আবদুল্লা ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭) ই হলেন প্রকৃতপক্ষে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক। ইবনে সিনা নামে পরিচিত এই মণীষীকে “দ্বিতীয় জালিনুস” ও বলা হয়ে থাকে। পাঁচ খন্ডে বিভক্ত ও চার লক্ষাধিক সংখ্যা বিশিষ্ট তাঁর রচিত “আল কানুন ” গ্রন্থটি তৎকালীন চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুগে এক বিপ্লবের সুচনা করেছিল। এতে শতাধিক জটিল রোগের কারন, লক্ষণ পথ্যাদির বিস্তারিত বিবরন দিয়েছিলেন। জল ও ভূমির মাধ্যমে যে সকল রোগ ছড়ায় তা তিনি আবিস্কার করেছিলেন। “মেনেনজাইটিস” রোগের লক্ষণ সনাক্তকরণ তিনিই সর্ব প্রথম করেছিলেন। তাঁর রচিত “আশ শেফা” তো দর্শন শাস্ত্রের অমূল্য রত্ন।

সমাজ বিজ্ঞানের পিতা বলে পরিচিত আবু জায়েদ ওয়ালীউদ্দিন ইবনে খালদুন (১৩২২-১৪০৬)ও ইতিহাসের পাতায় ইবনে খালদুন হয়ে দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেছেন। দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে অসাধারণ পান্ডিত্যের অধিকারি আবু জায়েদ ওয়ালীউদ্দিন সমাজ বিজ্ঞান ও বিবর্তন বাদ সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য আবিস্কার করেন। তাঁর রচিত “কিতাব আল ইবর” তো বিশ্বের প্রথম এক সর্ব বৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ।

আবার বর্তমান বিজ্ঞান যাঁর মৌলিক আবিস্কারের উপর অধিষ্ঠান তিনি হলেন রসায়ন বিদ্যার জন্মদাতা আবু আবদুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ান। ইউরোপীয় পন্ডিত গনের নাম বিকৃতির ষড়যন্ত্রের রোসানলে পরে তিনি হয়ে গেছেন “জিবার”। ফলে বোঝার উপায়ই নেই যে রসায়ন বিদ্যার জনক হলেন একজন ধর্মপ্রাণ খাঁটি মুসলমান। মুসলিম স্মৃতিপটে তাঁর ছায়াও এখন পড়ে না। তিনিই সর্বপ্রথম “নাইট্রিক এসিড” ও “সালফিউরিক এসিড” আবিস্কার করেন। স্বীয় গ্রন্থ “কিতাবুল ইসতিসমাস” এ তিনি নাইট্রিক এসিড প্রস্তুত করার ফর্মূলা বর্ণনা করেন। পাতন, পরিস্রাবণ, দ্রবণ, কেলাসন, ভস্মীকরন, গলন, বাস্পীভবন ইত্যাদি রাসায়নিক সংশ্লেষণ বা অনুশীলন, গবেষনার ফলে কী কী রুপান্তর হয় এবং তার ফল কী তিনি তা বিস্তারিত বর্ণনা করে নামকরণ বা সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন। স্বর্ন গলানোর “একোয়া রিজিয়া” নামক পদার্থটি তারই আবিস্কৃত। এছাড়াও দুই হাজারের বেশি গ্রন্থ রচনাকারী জাবির ইবনে হাইয়ান বিজ্ঞানের শাখায় আরও অনেক কিছু আবিস্কার করেন। বর্তমান প্রজন্মের অনেকর কাছেই তিনি অজ্ঞাত অথচ বিজ্ঞানে তাঁর অবদান চিরস্মরনীয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানেও মুসলিম মণীষীদের অবদান অনস্বীকার্য। যে বিজ্ঞানী সর্ব প্রথম এক সৌর বৎসরের নির্ভুল পরিমাপ করে দেখিয়ে ছিলেন তিনি হলেন আবু আবদুল্লাহ ইবনে জাবির ইবনে সানান আল বাত্তানী (৮৫৮-৯২৯)। যিনি “আল বাত্তানী” নামেই পরিচিত। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র প্রভৃতির প্রকৃতি, গতি ও সৌর জগত সম্বন্ধে তাঁর দেওয়া সঠিক অভিনব তথ্য গুলি জ্যোতির্বিজ্ঞানে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। টলেমি সহ বহু জ্যোতির্বিজ্ঞানীর ভুল সংশোধন করে তিঁনি বলেন, “সূর্য স্থীর নয়, আপন কক্ষপথে গতিশীল।” অংক শাস্ত্রেও ছিল তাঁর গভীর পান্ডিত্যে। তাঁর অসাধারণ প্রতিভার বলেই নির্জীব ত্রিকোণমিতি হয়ে ওঠে সজীব। তিঁনি বলেন, “ত্রিকোণমিতি হচ্ছে একটা স্বয়ং স্বাধীন বিজ্ঞান।” ত্রিভুজের বাহুর সঙ্গে কোনের ত্রিকোণমিতির সম্পর্ক তারই আবিস্কার। সাইন, কোসাইনের সঙ্গে ট্যানজেস্টের সম্পর্ক আবিস্কার করে ত্রিকোণমিতির কিছু কিছু সমস্যার অত্যন্ত বিস্ময়কর সমাধান দিয়েছিলেন। এক কথায় তাকে ত্রিকোণমিতির জনক বলা যেতে পরে।

দশম-একাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়কালে যাঁর একান্ত সাধনায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক নব সূর্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয়েছিল তিনি হলেন আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আমদদ আল বিরুনী (৯৭৩-১০৪৮)। যিনি আল বিরুনী নামে অধিক পরিচিত। পৃথিবীর ইতিহাস জগৎ বাসীর সামনে রেখে গেলেও ইতিহাসের পাতায় তাঁর আত্ম পরিচয় পাওয়া যায় না। জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, রসায়ন, জীবতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, উদ্ভিদ তত্ব, গণিত, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, দিন পঞ্জির তালিকা ও ইতিহাস, সভ্যতার ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে তিঁনি ছিলেন অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী। তাঁর রচিত শতাধিক গ্রন্থের মধ্যে এ সমস্ত বিষয়ে গভীর ভাবে আলোচনা করেছেন। “প্রাকৃতিক ঝর্ণা” ও “আর্টেজীয় কূপের” রহস্য উদঘাটন তিঁনিই করেছিলেন। তাই বলা যেতে পারে আল বিরুনী শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নন, বরং তিঁনি হলেন সমগ্র বিশ্বের সর্ব কালের সর্ব শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী দের মধ্যে শীর্ষ স্থানীয় এক মহাপুরুষ। তাঁর ও অন্যান্য মুসলিম বিজ্ঞানীদের মৌলিক আবিস্কারের উপরই গড়ে উঠেছে আধুনিক বিজ্ঞান।

নাম বিকৃতির কদর্য ষড়যন্ত্রের স্বীকার কোরান, হাদিস, আইন, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, অংক শাস্ত্র, পদার্থ বিজ্ঞান প্রভৃতির উপর অসাধারণ পান্ডিত্যের অধিকারী আবুল ওয়ালিদ মোহাম্মাদ ইবনে আহমদ ইবনে মোহাম্মাদ ইবনে রুশদ। ইউরোপীয় পন্ডিতগন তাঁর নাম বিকৃত করে “এভেরাস’ নামে লিপিবদ্ধ করেছে।এছাড়াও অন্যান্য অমুসলিম মণীষীদের নাম, প্রচার, প্রসার ও আবিস্কারকে যেভাবে ইতিহাসের পাতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে,সেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়নি মুসলিম বিজ্ঞানী,শ্রেষ্ঠ ভৌগলিক “আল-মাসউদি”,শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ “ইব্রাহিম ইবনে সিনান”, অংক শাস্ত্রে শুন্যের জন্ম দাতা ও বীজগণিতের আবিস্কারক “আল খোয়ারিজমি”, তুলো থেকে সর্ব প্রথম কাগজ তৈরির কারিগর “ইউসুফ ইবনে উমার”, ম্যাংগানিজ-ডাই-অক্সাইড থেকে কাঁচ তৈরির পদ্ধতির আবিস্কারক “আররাজী”, জলের গভীরতা ও স্রোত মাপার যন্ত্রের আবিস্কারক “ইবনে আবদুল মাজিদ” ও আকাশ জগতের জন্য সর্ব প্রথম মানমন্দির তৈরির বিজ্ঞানীদ্বয় “হাম্মাদ ইবনে মাসার” ও “হুনাইন ইবনে ইসহাক” সহ আরও অনেককে। আর পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র “সুরাতুল আরদ” তো ৬৯ জন মুসলিম ভূগোলবিদ মিলেই আবিস্কার করেন।

সুতরাং বলা যেতে পারে যে এমন এক সময় ছিল যখন মুসলিম জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞান,শিল্প ও সাহিত্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তীতে ইউরোপের বিজ্ঞানীরা মুসলিম মনীষীদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প সাহিত্যকে চর্চা করে ক্রমান্বয়ে আজ উন্নতির শিখরে উঠেছে। কিন্তু মুসলিম জাতি তাদের পূর্ব-পুরষদের সুবিশাল জ্ঞান ভান্ডারকে উপেক্ষা করে আজ বিশ্বের বুকে অশিক্ষিত, দারিদ্র ও পরামুখাপেক্ষী জাতি হিসাবে পরিনত হয়েছে।