মাদ্রাসা শিক্ষার বেহাল অবস্থা অথচ রাজ্য সরকারের সুকৌশল নীরবতা

0

মোহাম্মদ হাদিউজ্জামান, টিডিএন বাংলা : ‘মাইনোরিটি স্ট্যাটাস’ থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি মাধ্যম মাদ্রাসাগুলিতে যদি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের দ্বারা শিক্ষক নিয়োগ করা যায় তাহলে বাংলা মাধ্যম মাদ্রাসাগুলিতে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের দ্বারা শিক্ষক নির্বাচন করা যাবে না কোন্ যুক্তিতে ?

রাজ্যে সরকার পোষিত ৬১৪ টি মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ করবে কে- সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলোর পরিচালন সমিতি না সরকার গঠিত মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন – এই নিয়ে পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি রহমানিয়া মাদ্রাসার পরিচালন  সমিতি মামলা করে কলকাতা হাইকোর্টে, ২০১৩ সালে। এই মামলায় হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চের বিচারপতি সম্বুদ্ধ চক্রবর্তী ২০১৪ সালের ১২ মার্চ রায় দেন পরিচালন সমিতির পক্ষে এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে। এই রায়ের প্রেক্ষিতে, গড়িমসি করে হলেও, রাজ্য সরকার আবেদন করে কোলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে। ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ডিভিশন বেঞ্চেও সরকার পক্ষ হেরে যায় (অনেকের মতে, এই হার ছিল ইচ্ছাকৃত)।

Advertisement
head_ads

(১) ইতিমধ্যে সরকার মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন কে দিয়ে ২৯৩১ শূন্যপদের জন্য ৮৮ হাজার চাকুরি প্রার্থীর পরীক্ষা গ্রহণ সম্পন্ন  করে ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে।

(২)  ডিভিশন বেঞ্চে সরকার পক্ষের আইনজীবী ছিলেন একরামুল বারি। তিনি নাকি উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ যুক্তি ও কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন ! এজন্য দিনের পর দিন তিনি সময় নিয়েছেন। তবুও পারেননি ! ফলে, ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ও প্রধানবিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুর বিরক্ত হয়ে আগের রায় বহাল রাখেন, শুধু তাই নয়, সরকারি সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিযুক্ত হওয়া কয়েক হাজার শিক্ষকদের চাকরির ভবিষ্যৎ পর্যন্ত পরিচালন সমিতির হাতে সঁপে দিয়ে যান এবং ৮৮ হাজার চাকুরি প্রার্থীর চাকরি পাওয়ার স্বপ্নও বিলীন হয়।

উল্লেখ্য:

(১)  শিক্ষা সংক্রান্ত মামলায়, যথেষ্ট আনুকূল্য থাকা সত্ত্বেও, একরামুল বারির মতো একজন বিখ্যাত ও দুঁদে আইনজীবীর ওই পরাজয়ের পিছনে অন্য কলকাঠি নড়েছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা।

(২)  এরপর রাজ্য সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার দরকার বোধ করেনি বরং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পরিচালন সমিতিগুলোর উদ্দেশে শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি সার্কুলার জারি করে ৩/৩/২০১৬ সালে।

(৩)  কিন্তু হাইকোর্টের এই শেষোক্ত রায়ের প্রেক্ষিতে জাতিধর্ম নির্বিশেষে কয়েকজন মাদ্রাসা শিক্ষকদের একটি সদ্যগঠিত অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বেঙ্গল মাদ্রাসা এডুকেশন ফোরাম’ (হাঁ, এই একটি মাত্র সংগঠন) ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিমকোর্টে আপিল করে।

(৪)  ফোরামের আপিল মঞ্জুর করে সুপ্রিমকোর্ট ১৪/০৩/২০১৬ সালে কোলকাতা হাইকোর্টের রায়কে স্থগিতাদেশ দেয় ফাইনাল রায় পর্যন্ত।

(৫)  কান টানলে মাথা আসে। তাই এ মামলায় সুপ্রিম কোর্টেও রাজ্য সরকারকে অংশ নিতে হয়। কিন্তু এখানেও সরকারি আইনজীবীর গড়িমসি অব্যাহত থাকে। ফলে চলতে থাকে দীর্ঘসূত্রতা।

(৬)  ফোরাম ৮৮ হাজার বেকার যুবক যুবতীর বিলিন হওয়া স্বপ্নকে ফিরিয়ে দিতে আরও একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে সংগঠনের পয়সায় ৭৭ জন পরীক্ষার্থীকে দিয়ে সুপ্রিমকোর্টে পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের আপিল করে ।

(৭)  ফোরাম চ্যালেঞ্জে সফল হয়। কোর্ট রেজাল্ট প্রকাশের অনুমতি দেয়। সরকার কমিশন কে দিয়ে ২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৮৮ হাজার চাকুরি প্রার্থীর পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ করে। এতে ৩৭০৬ জন পাশ করলেও এখনও  তাদের নিয়োগ করা হয়নি।

(৮)  অবশেষে সুপ্রিমকোর্টের লিভগ্রান্ড ও ফোরামের রাজ্য জুড়ে গনআন্দোলন এর প্রভাবে ২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিল রাজ্য সরকার কমিটিকে দেওয়া নিয়োগের জি.ও প্রত্যাহার করে নেয়।

(৯)  ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ কোলকাতা হাইকোর্ট নিয়োগের অনুমতি দিলেও সরকার বা কমিশন নিয়োগ করেনি।

(১০)  সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ ও মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত কোনও মামলার নিষ্পত্তি হতে সাধারণত বেশি বিলম্ব হয় না। অথচ এক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে ! কারণ একটাই, সরকারের সদিচ্ছার অভাব। দেখা যাচ্ছে, কোনও শুনানিতে সরকারের উকিল অনুপস্থিত আবার কোন শুনানি না করেই সময় চেয়ে নেওয়া। এর জ্বলন্ত প্রমাণ ২২/০২/১৮ তারিখের কোর্টের শুনানি মুলতবি  হওয়া।

(১১)  সুদীর্ঘ প্রায় ৬ বছর হতে চলল, অর্ধ সহস্রাধিক মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ স্থগিত !

(১২) হতাশাগ্রস্থ ৩৭০৬ জন বেকার যুবক যুবতীর ভবিষৎ অন্ধকার !

(১৩)  ফলশ্রুতিতে, অধিকাংশ মাদ্রাসায় শিক্ষকের অভাবে পঠনপাঠন শিকেয় উঠেছে। দু’তিনজন করে শিক্ষক নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক মাদ্রাসা চলছে ! এমনকি, কোনও কোনও মাদ্রাসায় একজনও শিক্ষক নেই ! ২৫০-এর বেশি মাদ্রাসায়  প্রধান শিক্ষকও নেই ! ৬১৪টি মাদ্রাসায় ৬ হাজারেও বেশি শিক্ষক শূন্যপদ !

ভাবতে পারেন!

উপরোক্ত (বিস্ময়কর !) তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের ভার পরিচালন সমিতির হাতে ফিরে যাক-এটাই সরকার চায়। কেন না, এমনটা হলে:

১) পরিচালন সমিতিতে জায়গা পাওয়ার জন্য মুসলিম সমাজে রক্তারক্তি লেগেই থাকবে।

২) বেশির ভাগ পরিচালন সমিতিতে শাসকদলের প্রভাব থাকবে। ফলে স্থানীয় অশিক্ষিত নেতারাও কর্মহীন শিক্ষিত যুবকদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে পারবে।

৩) যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক রং আর অর্থের মাপকাঠিতে শিক্ষক নিযুক্ত হবে।

৪) প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার দিক দিয়ে পঙ্গু হয়ে যাবে।

৫) গরিব পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা হতাশার শিকার হয়ে মাঝপথে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে বিদায় নেবে।

৬) ভোটিং মেশিনে এসবের ভালোই প্রভাব পড়বে। আর, এটাই তো সরকারের বড় সাফল্য বলে পরিগণিত হবে।

শেষ করার আগে আবারো প্রশ্নটি রাখতে চাই-  ‘মাইনোরিটি স্ট্যাটাস’ থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি মাধ্যম মাদ্রাসাগুলিতে যদি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের দ্বারা শিক্ষক নিয়োগ করা যায় তাহলে বাংলা মাধ্যম মাদ্রাসাগুলিতে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের দ্বারা শিক্ষক নির্বাচন করা যাবে না কোন্ যুক্তিতে ? পুনশ্চ বাম আমলের মতো এই আমলেও, সরকারে যোগ দেওয়া মুসলিম নেতারা শিক্ষা সংক্রান্ত এই জ্বলন্ত বিষয়ে অদ্ভুতভাবে মৌন !

লেখক:

লেখক পবিত্র কুরআনের অনুবাদক,           বহুগ্রন্থপ্রণেতা, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক রহমানিয়া হাই মাদ্রাসা (বিষ্ণুপুর) উঃমাঃ দক্ষিণ ২৪ পরগনা

head_ads