যে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা গান্ধীজীকে ক্ষত বিক্ষত করে খুন করেছে, তারাই আজ ভারতকে শেষ করছে

0

“গান্ধিকে ইতিপূর্বে আরও তিনবার হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। প্রথম হত্যার চেষ্টা চলে ১৯৩৪ সালে, পুণেতে। তখন তিনি সেখানে অস্পৃশ্যতার বিরোধী আন্দোলন চালাচ্ছিলেন। ১৯৪৪ সালেও তাঁকে আক্রমণ করা হয়। এ আক্রমণও ছিল হিন্দুমহাসভার পক্ষ থেকে বলে অনুমান। ১৯৪৬ সালে গান্ধিজি যখন ট্রেনযাত্রা করছিলেন তখন ট্রেনে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়।” টিডিএন বাংলার হয়ে কলম ধরলেন মুহাম্মদ নুরুদ্দিন। মূল নিবন্ধটি এখানে তুলে ধরা হলো-

বুলেট বিদ্ধ  যখন ভারত আত্মা

মুহাম্মাদ নুরুদ্দিন

Advertisement
head_ads

ভারত তখন সবে মাত্র স্বাধীন হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ভাবে সেই স্বাধীনতাকে বরণ করে নিতে সমগ্র দেশবাসীর সাথে উত্তাল দিল্লি নগরীও৷ আলােকসজ্জায় সজ্জিত মহানগরীর বুকে মানুষের ঢল। তাদের মুখে মুখে ধ্বনিত হচ্ছিল ‘মহাত্মা গান্ধি কি জয়’। একে একে এলেন জওহরলাল নেহরু, রাজেন্দ্র প্রসাদ৷ ব্রিটিশ ভারত আর স্বাধীন ভারতের সন্ধিলগ্নের দিকে এগােচ্ছে কালের ঘোড়া৷ সংবিধান সভাগৃহের অভ্যন্তরে তুমুল উত্তেজনা৷ উৎসব আর উৎসব৷ মহাত্মা গান্ধির জয়ধ্বনিতে গমগম করছে সংবিধান সভা। কিন্তু গান্ধি তখন কোথায় ? মহাত্মা গান্ধি তখন উৎসবে উত্তাল, আলো ঝলমল শহর থেকে বহুদূরে কলকাতার অন্ধকারাচ্ছন্ন বেলেঘাটার এক পরিত্যাক্ত বাড়িতে৷ দাঙ্গার আঘাতে যে বাড়ির বাসিন্দারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, সেই হায়দরী মঞ্জিলের অন্ধ কুটিরে বসে মহাত্মা গান্ধি তখনও মানুষের মনে আলো জ্বালানাের ব্রতে অবিচল।
এই হলেন মহাত্মা গান্ধি। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত মহাত্মা পান্ধির জীবনীগ্রন্থে রোমারোলা লিখেছিলেন, এটা নিশ্চিত যে, যিশু খ্রিস্ট ও বুদ্ধের মতো গান্ধীজীর  অন্তদর্শন ও আদর্শ কালজয়ী হবে। বিশ বছর পর বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও গান্ধিজি সম্পর্কে ভুয়সী প্ৰশংসা করেন। অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যখন গদি, ক্ষমতা, মান সম্মান, পদমর্যাদা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত, সাধারণ মানুষ যখন উৎসব আনন্দে উত্তাল তখন এই মহামানব মানুষের সমস্যা নিয়ে নিজেকে উজাড় করে দিতে তৎপর।

তিনি ছিলেন ভারতীয় রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ যতই ওত্তাল হয়ে উঠছে, ডিভাইড অ্যান্ড রুলের ছোবল তত শক্তিশালী আঘাত হানছে। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মেতে উঠছে হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়।

নােয়াখালি থেকে খবর এলো সেখানে দাঙ্গা লেগেছে। মাত্র ৩০ শতাংশ হিন্দু আর ৭০ শতাংশ মুসলমান, সুতরাং হিন্দু সমাজের নিরাপত্তা আক্রান্ত। গান্ধিজি প্রশ্ন করলেন, নােয়াখালির অর্থনৈতিক অবস্থা কী। তাকে যখন বলা হল, ৭০ শতাংশ জমি হিন্দুদের হাতে আর ৩০ শতাংশ জমি মুসলমানদের I গান্ধিজি বললেন-বৈষম্যই তো বিদ্বেষের কারণ।
বৈষম্য কমিয়ে মানুষকে কাছাকাছি অনাই ছিল গান্ধিজির ব্রত৷ এই ব্ৰত থেকেই তিনি অস্প্যতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন ৷ জন্মের ভিত্তিতে কেউ ছোট বড় হয় না। এটা বুঝাতে তিনি শূদ্রদের হরিজন বলে বুকে টেনে নিয়েছিলেন৷ দেশভাগ জনিত বিষয় নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে I অনেকেই দেশভাগের জন্য গান্ধিজিকেও দাবী করেন। কিন্তু মুসলমানদের দাবি দাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে কীভাবে দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখা যায় সে আলোচনার জন্য তিনি নিজেই বারবার ছুটে যেতেন জিন্নাহর বাসভবনে৷ কংগ্রেস নেতারা এটা অপমানজনক মনে করা সত্বেও গান্ধিজি কোনও কিছু মনে করতেন না। গান্ধিজি শুধু বর্নবৈষম্য দূর করার চেষ্টা করেননি, তিনি নারীজাতির প্রতি বৈষম্যেরও ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন ৷ সর্বাবস্থায় নারীজাতির উন্নয়ন ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আধিপত্যসূলভ মানসিকতার তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন৷ গোঁড়া হিন্দু সমাজের মানসিকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। হয়ত এই কারণেই ব্রাহ্মন্যবাদের কােপে পড়তে হয়েছিল তাকে৷ গান্ধিজিকে হত্যা করার উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট ৷ নাথুরাম গডসে নামক পাষন্ড তার বুকে গুলি চালালেও এটা কোনও ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। গডসের পিছনে ছিল সংগঠিত শক্তি। গান্ধিকে ইতিপূর্বে আরও তিনবার হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। প্রথম হত্যার চেষ্টা চলে ১৯৩৪ সালে, পুণেতে। তখন তিনি সেখানে অস্পৃশ্যতার বিরোধী আন্দোলন চালাচ্ছিলেন। ১৯৪৪ সালেও তাঁকে আক্রমণ করা হয়। এ আক্রমণও ছিল হিন্দুমহাসভার পক্ষ থেকে বলে অনুমান। ১৯৪৬ সালে গান্ধিজি যখন ট্রেনযাত্রা করছিলেন তখন ট্রেনে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয় ৷

প্রতিবারের আক্রমণটা আসে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষ থেকে। এরা নাথুরাম গডসের প্রতিনিধি I এরা মারাঠি চিতপাবন ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ভুক্ত ৷ উগ্র জাত্যাভিমান এদের প্রধান ধর্ম ৷ এরা নাৎসী ও ফ্যাসিবাদের পূজারি ৷ আমরাই শ্রেষ্ঠ, বাকি সবই নিকৃষ্ট এটাই এদের ভাবনা। আমরা উঁচুজাত সুতরাং বাকি সবাই আমাদের হুকুমে ও আমাদের সেবার উদ্দ্যেশ্যই বেঁচে থাকবে, এটাই ছিল তাদের মূল কথা। গান্ধির জীবনাদর্শ ছিল এই ভাবনার বিরুদ্ধে কুঠারাঘাত৷ তাঁর সত্যাগ্রহ ও অহিংস আন্দোলন যে প্রভাব সৃষ্টি করেছিল স্বাধীন ভারতে তা জারি থাকলে অবিলম্বে তা হিন্দু সমাজের বর্ণভেদ ব্যবস্থার বেড়াজাল ভেঙে ফেলত। এই কারণেই সনাতন ধর্ম রক্ষার নামে কায়েমি স্বার্থবাদীরা তটস্থ ছিল গান্ধিকে সরানো ছাড়া তাদের জাত ধর্ম রক্ষা করার আর কোনও রাস্তা ছিল না। তাই তারা গান্ধিকে দুনিয়া থেকে সরানোর জন্য তারা ছিল মরিয়া।

সব জেনেবুঝেও প্যাটেল নেহরুরা গান্ধির প্রতি তত গুরুত্ব দেননি৷ তাঁর নিরাপত্তার কোনও ব্যবস্থাও করেননি৷ গান্ধির ক্ষত বিক্ষত লাশকে দেখে ঢুকরে  কেঁদে ছিলেন  নেহরু৷ বেতার ভাষণে গোটা দেশ নেহরুর কান্নার আওয়াজ শুনেছে। কিন্তু গান্ধিহত্যার পিছনে তাদের যে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কম ছিল না, এটা দিবালােকের মতো সত্য ৷ গান্ধিকে হত্যা করে নাথুরাম গডসে একটি শ্রেণির কাছে হিরো হয়েছে ৷ নাথুরাম নয়, তার আসল নাম ছিল রামচন্দ্র ৷ বিনায়ক গডসে কুসংস্কারের আচ্ছন্ন ছিলেন, তাই তিনি পুত্র রামচন্দ্রের নাক কান ফুটো করে দেন৷ পরানাে হয় নাকে নথ ৷ এই নথ থেকেই নাম হয় নাথুরাম ৷ আরএসএস কেও তিনি কট্টর মনে করতেন না। তাই তিনি গঠন করেছিলেন ‘হিন্দুরষ্ট্র দল’৷

এই উগ্রতাবাদীদের হাতে বিদায় নিতে হয়েছে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধিকে। যে অসহিষ্ণুতা গান্ধিকে হত্যা করেছিল সেই অসহিষ্ণুতা আজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দেশজুড়ে। একটি সিনেমাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে অরাজকতা চালিয়ে যাচ্ছে নাথুরামের উত্তরসূরিরা ৷ রোহিত ভেমুলা, কানহাইয়া কুমার, আখলাক, জুনাঈদ, অসংখ্য দলিত ও সংখ্যালঘু মানুষ আজ এই উগ্রতায় আক্রান্ত I হিংসা আর উগ্রতায় ছেয়ে যাচ্ছে গোটা দেশ ৷ জাতির পিতার আদর্শ তুলে ধরার জন্য জাতির সন্তানরা কবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে? মহামিলনের ভারততীর্থ আজ এক মহাত্মার জন্য অপেক্ষা করছে।

(মুহাম্মদ নুরুদ্দিন একজন বিশিষ্ট লেখক ও প্রবীণ সাংবাদিক)

head_ads