বাংলার জন্য প্রাণ দিয়েছে যারা তাদের এখনও প্রশ্ন করা হয় মুসলিমদের ভাষা কী বাংলা!

0

মুহাম্মাদ আব্দুল মোমেন, টিডিএন বাংলা, কলকাতা: মুসলমানদের ভাষা আরবি, উর্দু ও ফারসি। পাবলিক সার্ভিস কমিশন আয়োজিত মিসলেনিয়াস সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় এক পরীক্ষার্থীর সাথে কথোপকথনকালে পরীক্ষার্থী ভাইটা বলেই ফেললেন। আপনার পূর্বপুরুষ সবাই কি এখানকার? আপনারা বাড়িতেও বাংলায় কথা বলেন? আপনিতো খুব সুন্দর বাংলা বলতে পারছেন। জানতে চাইলাম, এমন প্রশ্ন করছেন কেন? সহজ সরল ভাষায় বলল, আমরা জানি আপনারা সবাই উর্দু ভাষায় কথা বলেন। আমি বলেছিলাম যাদের মাতৃভাষা উর্দু তারাই উর্দুতে কথা বলে। আমরা বাঙালি আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। কেন বাঙালি তো হিন্দু। না না বাঙালির বৃহৎ অংশ হিন্দু, মিসলিমের সংখ্যা তার পরে। এছাড়াও খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধও আছে বাঙালি। বাঙালি একটি ভাষাগত জাতি। বাংলা একটি জাতির ভাষা। যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে তারাই তো বাঙালি। বাঙালি হলেই হিন্দু হবে এটা ভুল। তখন যুবক ভাইটা বলল, দুঃখিত ভাই আমার ধারনাই ভুল ছিল। আমাদের মধ্যে এই ধারণাই ছিল মুসলমানের ভাষা উর্দু। 
সম্ভবত ২০০০ সালে সংবাদ প্রতিদিনের দৃষ্টিপাত কলমে প্রান্ধিক আবদুর রাইফ লিখেছিলেন বাঙালি মুসলমানের ভাষা বিভ্রান্তি দুর হবেনা। এমনই এক আক্ষেপমূলক লেখায় আমার দু’বছর আগের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। তখন থেকেই প্রশ্ন ছিল – মুসলমানদের ভাষা বিভ্রান্তির এই কারণ কী?অনুসন্ধিতৎসু চিত্তে বিভিন্ন তথ্যের সন্ধান পেলাম। তবে কোন একদিন রেডিও বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রের “অমর একুশে”নামে শ্রদ্ধানুষ্ঠান শুনতে পাই। তাতে নাম ভেসে আসে সালাম, জব্বারদের নাম। বাংলা ভাষা আন্দোলনে সব মুসলমানের নাম? বুকটা যেন ভরেগেল। তথ্য অনুসন্ধান শুরু করলাম।আহরিত তথ্যের ভিত্তিতে আমার প্রশ্ন – যখন আমরা প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদ দিবস পালন করি এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি সেই সাথে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শিরোপা অর্জিত হয়েছে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করার সময় আব্দুস সালাম, আব্দুল জব্বার, দের অবদান স্মরণ করি। ঘটাকরে যাদের অবদানকে স্মরণ করি তারা সবাই মুসলমান। 
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি অবিভক্ত পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল খাজা নিজামুদ্দীন পল্টনের সভায় ঘোষণা করেন একমাত্র ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ এই ঘোষণার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু করে।এই আন্দোলন আরো প্রসারিত করার লক্ষ্যে দুদিন পরেই অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী একটি সর্বদলীয় কমিক গঠন করেন। সভাথেকে একটি কমিটি গঠিত হয়। মাওলানা ভাসানী ও কাজি গোলাম মাহবুব যথাক্রমে সভাপতি এবং আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। এছাড়াও খিলাফতে রাব্বাণী পার্টি, আওয়ামী লীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমিতির দুজন করে সদস্য নিয়ে একশান কমিটি হয়। সেই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি পূর্বপাকিস্থানর অর্থাৎ বাঙালির ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত গরিষ্ঠতাকে পদদলিত করার প্রতিবাদে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা ভাসানী ওই সভায় মুখ্য বক্তা ছিলেন। এই সভায় আব্দুল হালিমের প্রস্তাব অনুসারে আসন্ন ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ সরকারের বাজেটের দিনে সাধারণ ধর্মঘটের টাক দেয়।
সরকারের তরফ থেকে ধর্মঘট ভেস্তে দিতে আগেরদিন সন্ধান ৬টা থেকে সর্বত্র১৪৪ জারি করে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের প্রস্তাব অনুসারে ১৪৪ অমান্যকরে মিছিল শুরু করে। পুলিশ মিছিলে লাঠি চার্জ, কাঁদান গ্যাস এবং গুলিও বর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে ৫জন আন্দোলনকারী ৬জন নিহত হয়। তারা হলেন – আব্দুল জব্বার, আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সালাম, শফিউর রহমান ও রিকশা চালক আউয়াল। এছাড়াও কমকরে১ ৭জন আহত হন। এই আন্দোলনের প্রভাব গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। দিনমজুর থেকে নৌকোর মাঝি সকলে মুখের ভাষার জন্য রক্ত দিতে প্রস্তুত হয়। এই আন্দোলন ফল হিসেবে পাকিস্তান সরকার ৫৪ সালের ৭ মে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেই আন্দোলন সাফল্য পেল। এর আর এক স্বীকৃতি ৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষনা করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দিনটিকে জাতীয় ছুটিসহ শহিদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা করে।
বাংলাদেশের বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে ভাষা শহিদদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষসহ বাংলা ভাষাভাষি মানুষ শ্রদ্ধার সাথে ভাষা শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। এটা বাংলা তথা বাঙালির গর্বের বিষয়। কিন্তু এই শহিদ যে বিশ্ববাসীর কাছে যথেষ্ট রেখাপাত করে। তাই একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা শহিদ দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এলো ১৯৩৯ সালের ২১ ডিসেম্বর। ওই দিন থেকে রাষ্ট্র সংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিক সংস্থা UNESCO আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনকে স্মারক হিসেবে আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি বাঙালি তথা বালা ভাষী হিসেবে অতি গর্বের। এখন এই গর্বের শিরোপা বাংলা তথা বাঙালির শিরে স্থান পেল ছালাম জব্বার বরকত রফিকদের আত্মবলিদানের বিনিময়ে ।তাঁরা সকলেই কিন্তু মুসলমান।
বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে প্রথম সোচ্চার হয়েছিলেন, বহুভাষাবিদ ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি ১৯১৮ সালে বিশ্বভারতীর একটি সভায় ভারতের সর্বসাধারণের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৩৭ সালে মাওলানা আরাম খাঁ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে বাংলা ভাষাকে ভারতের রাষ্ট্রীয়ভাষা করার দাবি জানান। এছাড়াও ডঃ শহীদুল্লাহ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার প্রস্তাব হলে তিনি তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি পেশ করেন। (পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা প্রবন্ধ, ডঃ শহীদুল্লাহ)। ভারতের সংবিধানের খসড়া প্রস্তুত করে যে গণপরিষদ। প্রস্তুতকৃত সংবিধানের গণপরিষদের সকল সদস্যগণের স্বাক্ষর করেছিলেন সেই খসড়া সংবিধানে নিজের মাতৃভাষা বাংলা লিপিতে যিনি স্বাক্ষর করেছিলেন তিনি হলেন দক্ষিণ ২৪ পরগণার বাঙালি ভূমিপুত্র খানবাহাদুর জসিমুদ্দিন। কথিত আছে বাংয় স্বাক্ষর করতে গিয়ে তাঁকে অনেক লড়াই করতে হয়েছিল।
এখন আমরা বুঝলাম বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে সোচ্চার এমনকী জীবণ পর্যন্ত যারা দিয়েছেন যাঁরা তাঁদের সবাই মুসলমান। তারপরেও বাঙালি মুসলমানের ভাষা বাংলা তা একটা বৃহত্তর অংশের বাঙালি এমনকি ভারতীয় মানতে চান না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েছে-১৯৬১ সালের ১৯ মে, অসমের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা নিয়ে আন্দোলনে এগারো জন বাংলাভাষী যুবক যুবতী শহিদ হয়েছিল তাঁদের সবাই অমুসলিম। তাঁদের মধ্যে ষোড়ষী যুবতী কমলা ভট্টাচার্যই ভাষা আন্দোলনের প্রথম মহিলা শহিদ। মনে হয় অসমের ১৯ মে’র ভাষা আন্দোলনকে অধিক ফোকাস করে ভাবা হয় বাংলা ভাষা বাঙালির ভাষা, (বাঙালি বলতে হিন্দুই বোঝে) কিন্তু মুসলিমদের ভাষা নয়। মুসলিমদের ভাষা উর্দু বা আরবি অথবা ফারসি।তাই আক্ষেপের সাথে বলতে হয় আমরা প্রতি বছর ঘটনাকরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করি এবং ভাষাশহিদগণের স্মৃতি তর্পণ করি কিন্তু ভুলে যাই যে বাংলা ভাষা বাঙালির ভাষা। বাঙালি একটি জাতি কোন ধর্মের পরিচয় নয়।

(লেখক সাতুলিয়া ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার ধর্মশাস্ত্র বিষয়ের শিক্ষক)