সত্য-ন্যায়ের-মুক্ত কণ্ঠ প্রতিনিয়ত হচ্ছে স্তব্ধ বুলেটের আঘাতে

0
আফরিদা খাতুন আঁখি

আফরিদা খাতুন আঁখি, টিডিএন বাংলা : আজ ৬ই সেপ্টেম্বর। ঠিক এক বছর আগে আজকের দিনেই গৌরী লঙ্কেশের প্রতিবাদী কণ্ঠটাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বেঙ্গালুরুর তাঁর নিজ বাসভবনের সামনে। লঙ্কেশ পত্রিকার কর্ণধার, কবি ও সাংবাদিক পি.লঙ্কেশের তনয়া গৌরী লঙ্কেশ বরাবরই ছিলেন বেশ দাপুটে এবং প্রতিবাদী। তাঁর এই প্রতিবাদী কণ্ঠ থেকে সংঙ্ঘ পরিবার, বিজেপি এমনকি জাতীয় কংগ্রেসও রক্ষা পায়নি।

কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন সর্বদা। এমনকি তাঁর পিতার মৃত্যুর পর ‘লঙ্কেশ পত্রিকা’ র প্রধান সম্পাদক হয়েও নাসকতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ কে কেন্দ্র করে ‘লঙ্কেশ পত্রিকা’র বাণিজ্যিক বিভাগের প্রধান তাঁর ভাই ইন্দ্রনীল লঙ্কেশের সাথে তাঁর মতবিরোধ ঘটলে তিনি ‘লঙ্কেশ পত্রিকা’র সবরকম দায়িত্ব থেকে নিজেকে অপসরণ করেন।

হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার করণে তাঁকে সংঙ্ঘপরিবার এবং বিজেপি সহ বেশ কিছু হিন্দুত্ববাদী দলের রোষানলের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। তাঁর হত্যাকাণ্ডকে নিয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়িও কম হয়নি।

গৌরী লঙ্কেশের কণ্ঠ ছিল জ্বালাময়ী, সমস্ত ভয়-আশঙ্কাকে উপেক্ষা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় ছিল তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি। আর তাঁর এই কণ্ঠই হয়ে উঠেছিল কয়েক শ্রেণীর মানুষের কাছে চরম আশঙ্কার কারণ। তারা এতটাই বেশি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল যে একটি মাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে তাদের সাহায্য নিতে হয়েছিল তিনজন হত্যাকারীর। তাদের প্রয়োজন পড়েছিল একটি বা দুটি নয়, আটটি বুলেটের। গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের যেন একপ্রকার দূর্বল চরিত্রের পরিচয়ই ফুটে উঠেছিল।

ভারতের মাটিতে গৌরী লঙ্কেশের মত সাহসী কণ্ঠকে স্তব্ধ করার ঘটনা এই প্রথম অথবা শেষ নয়। তাঁর হত্যাকাণ্ডের চার বছর পূর্বে পুণেতে সামাজিক অন্ধ বিশ্বাসের ব্যাপারে মুখ খুললে সমাজবিদ নরেন্দ্র ধবলকারকে হত্যার স্বীকার হতে হয়েছিল। রামরহিম সিং নামক ভণ্ড সাধুর কুকীর্তির পর্দা ফাঁস করার কারণে ‘পুরা সাচ’ পত্রিকার কর্ণধার রামচরণ ছত্রপতিকে দিবালোকে তাঁর নিজ বাসভবনের সামনে রামরহিম নিযুক্ত হত্যাকারীর হাতে প্রাণ হারাতে হয়।

বিগত মাসের ১৩ তারিখে দিল্লির সংসদভবনের নিরাপত্তা ঘোরটোপেও কনস্টিটিউট ক্লাবের বাইরে আততায়ীর হামলার শিকার হতে হয় ছাত্র নেতা উমর খালিদকে। এরকম হামলা বা হত্যাকাণ্ডের হয়তো ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে যা সঠিক তথ্য বিশ্লেষণের অভাবে আমাদের দৃষ্টির অগোচরে রয়েছে।

ভারতের সংবিধানের ১৯নং ধারায় যেখানে রয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সেখানে কেন মুক্ত কণ্ঠের জন্য প্রাণ হারাতে হবে আজও? আজ ভারতের সংবিধান ধারাগুলি দলিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কখনো লঙ্ঘিত হচ্ছে স্বাধীন ভাবে ভোটাধিকারের স্বাধীনতা। কখনো ধর্মীয় স্বাধীনতা আবার কখনো সমঅধিকারের স্বাধীনতা। প্রত্যেকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান সেই দেশের নাগরিকদের রক্ষাকবচ। সংবিধানের প্রত্যেকটি ধারা নাগরিকদের কাছে ঢাল স্বরুপ।

সেখানে আমাদের সংবিধানের ধারাগুলি আজ নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আজ ভারতের সংবিধানের ধারাগুলি যেন ‘যেমন খুশি তেমন বেছে নাও’ এর মত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে তাও আবার নেতা মন্ত্রী বা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের জন্য। দূর্নীতির এই সাম্রাজ্যে ভারতীয় সংবিধান একাউন্টার সহ হাতে গোনা কয়েকটি বিষয়ের রক্ষাকবচে পরিণত হয়েছে। এছাড়া বাকী সময় পার্লামেণ্টের পাঠাগারের আলমারিতে তালাবন্ধ এক মূল্যহীন পুস্তক, যা বিআর আম্বেদকারের কাছেও ছিল সম্পূর্ণ অভাবনীয়।