সুরাইয়া খাতুন

সুরাইয়া খাতুন, টিডিএন বাংলা :  বিদ্যাসাগর, প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিটা পেয়েছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপকদের কাছ থেকে। ১৮৩৯ সালের ২২ এপ্রিল হিন্দু ল’ কমিটির পরীক্ষা কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ১৬ মে ল’কমিটির কাছ থেকে তিনি যে প্রশংসাপত্রটি পান, তাতেই প্রথম তাঁর নামের সঙ্গে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিটি ব্যবহৃত হয়।

ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন যথার্থই দয়ারসাগর। সেই দয়ার পরিচয় পেয়েছেন সমসাময়িক মানুষরা, স্বয়ং মাইকেল মধুসূদন দত্তও। আর পেয়েছিল সে যুগের অভাগী নারীরা। নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রবল সমর্থক ছিলেন তিনি। তিনি বাংলায় নারীশিক্ষার প্রসারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, নারীজাতির উন্নতি না ঘটলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ড্রিংকওয়াটার বিটন উদ্যোগী হয়ে কলকাতায় হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ভারতের প্রথম ভারতীয় বালিকা বিদ্যালয়। এটি বর্তমানে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমান জেলায় মেয়েদের জন্য তিনি একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রামাঞ্চলে নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন জেলায় স্ত্রীশিক্ষা বিধায়নী সম্মেলনী প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ব্যাক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মে মাসের মধ্যে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলী ও মেদিনীপুর জেলায় ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ১৩০০ ছাত্রী এই স্কুলগুলিতে পড়াশোনা করত। পরবর্তীকালে তিনি সরকারের কাছে ধারাবাহিক তদবির করে সরকার এই স্কুলগুলোর কিছু আর্থিক ব্যয়ভার বহন করতে রাজি হয়। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮৮ টি। এরপর কলকাতায় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন (যা বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ নামে পরিচিত) এবং নিজের মায়ের স্মৃতি উদ্দেশ্যে নিজ গ্রাম বীরসিংহে ভগবতী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

গণশিক্ষার প্রসারের জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মাতৃভাষায় পঠন পাঠনের গুরুত্ব অনুভব করেন। এছাড়াও তিনি সমাজে প্রচলিত বর্ণভেদকে অস্বীকার করে সংস্কৃত-শিক্ষার প্রসারের জন্য তিনি সংস্কৃত কলেজে অ-ব্রাহ্মণ শ্রেণির ছাত্রদের ভর্তির ব্যবস্থা করেন। বাল্য বিবাহ নিবারণ ও বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণীয়।

তিনি মানবতাবাদের ওপর ভিত্তি করে একান্ত নিজস্ব উদ্যোগে সমাজ-সংস্কার আন্দোলনে ব্রতী হন। বাংলার সংস্কার আন্দোলন, বিশেষত নারীকল্যাণের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের অবদান চিরস্বীকার্য । উনিশ শতকের নবজাগরণ ছিল তাঁর সমাজ-সংস্কার ও শিক্ষা প্রসার আন্দোলনের সার্থক পরিণতি।