ইকরাম কবীর,টিডিএন বাংলা: আমরা ডামাডোল পছন্দ করি, ডামাডোল দেখতে ও ডামাডোলের কথা শুনতে চাই। যুদ্ধের ডামাডোল, সিনেমার ডামাডোল, ফুটবলের ডামাডোল। ডামাডোল ছাড়া খবরই হয় না। সিরিয়া, রাশিয়া, আমেরিকা, ইরান, উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, চীন– এই দেশগুলোই ঘুরেফিরে আমাদের মনের ডামাডোলের পুরোটাই দখল করে রাখে।
কিন্তু ইয়েমেনের মানুষ কেমন আছে তা হয়তো আমরা জানতেই পারছি না। দক্ষিণ সুদানের মানুষগুলো কী করছে আমাদের জানা হচ্ছে না। বুর্কিনা ফাসোর মানুষেরা কেমন আছে? খেতে-পরতে পারছে? আফগানিস্তানের কয়েকটি প্রদেশে যে খাবার সংকট চলছে তার খবর আমরা যুদ্ধের ডামাডোলে একেবারেই জানতে পারছি না।
আর জেনেইবা কী হবে। কিইবা করতে পারবো মানুষগুলোর জন্য? হতে পারে, ইয়েমেনের লক্ষ-লক্ষ মানুষ যে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে তা আমরা নাও জানতে পারি। গণমাধ্যমে না প্রকাশিত হলে আমরা জানবো কী করে? না খেয়ে থাকার চেয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এক বেলা বেশি খেলে সেই খবর অনেক বড় করে প্রচার হয়। একটি দেশের বেশিরভাগ মানুষ খাবার পাচ্ছেন না বা সেখানে দুর্ভিক্ষ চলছে তা খবর হয়ে খুব কদাচিৎ গণমাধ্যমে আসে। দুর্ভিক্ষ আসলে কেন এবং কী করে কোন দেশে বা অঞ্চলে ঘটে তা আমাদের মাথায় ঠিক খেলে না।
গত মাসেই জাতিসংঘ বলেছে যে ইয়েমেনে লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ না খেয়ে এ বছরের শেষ নাগাদ মারা যেতে পারেন। কারণ হচ্ছে ওই দেশটির ওপর সৌদি আরবের নেতৃত্বে নিষেধাজ্ঞা আরোপ। আমরা অনেকেই এ ব্যাপারটি হয়তো জানি না। সৌদিরা হুতি বিদ্রোহ দমাতে গিয়ে দেশটির এই অবস্থা করে রেখেছে। ২০১৫ সাল থেকে এ অবস্থা চলছে। গেলো বছর থেকে শুরু হয়েছে দুর্ভিক্ষ। বহু মানুষ ইতোমধ্যে না খেয়ে মারা গেছেন। জাতিসংঘের সাহায্য শাখার প্রধান বলেছেন সৌদি আরবের সৈন্যরা ইয়েমেনের সব গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তারা চাইলেই প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে পারে। বন্দরগুলো দিয়ে খাদ্য আমদানি করা যাচ্ছে না বলেই মানুষ না খেয়ে আছে এ দেশটিতে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে, রিয়াদের সরকার অস্ত্র পায় আমেরিকা এবং যুক্তরাজ্য থেকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইরানের ভালো সম্পর্ক। ইয়েমেনের ৯০ ভাগ খাবার আসে বাইরে থেকে। আমদানি না হলে মানুষ না খেয়ে থাকবেই। জানা যাচ্ছে যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী ইয়েমেনের ওই অঞ্চলগুলোকেই লক্ষ্য বানিয়েছে, যে অঞ্চলগুলোতে খাদ্য উৎপন্ন হয়।
ওদিকে দক্ষিণ সুদানে চার বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। সেখানকার সংরক্ষিত খাদ্যের মজুত শেষ এবং ২০১৭ সালেই এ দেশটিকে দুর্ভিক্ষ-কবলিত দেশ হিসেবে ঘোষণা। কিছু দাতা সংস্থা সেখানকার অবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করছেন কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। শুধু দুর্ভিক্ষ-কবলিত দেশ হিসেবে ঘোষণা দিলেই কি চিড়ে ভিজবে? নাকি সে দেশের মানুষকে সাহায্য করতে হবে?
নাইজেরিয়ায় গত তিন বছরের দুর্ভিক্ষের দেশজুড়ে যে হতাশা এবং অপরাধের জন্ম হয়েছে তা থেকে সে দেশ কবে মুক্তি পাবে তা কারো জানা নেই।
খাদ্যের রাজনীতি কিছু মানুষের কাছে মজার ব্যাপার এবং বেশিরভাগ মানুষের জন্য কষ্টের। অনেকের হয়তো আয়ারল্যান্ডে ২০০ বছর আগে আলু-দুর্ভিক্ষের কথা বইতে পড়ে থাকতে পারেন। চল্লিশের দশকে বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় চীন ভারতের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল। এই কয়েক বছর আগেও ভারত পাকিস্তানে বন্যার সময় খাদ্য সাহায্য পাঠাতে চেয়েছিল।
খাদ্য অথবা খাদ্য সাহায্য এমনি-এমনি আসে না। চার্চিলের বাংলার দুর্ভিক্ষের পর বোঝা গেলো যে খাদ্য একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আবার ব্যবসায়ের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। একবার আমেরিকার ইউএসএআইডি দুর্ভিক্ষ-কবলিত জিম্বাবুয়েকে ৫০ মিলিয়ন ডলার খাদ্য সাহায্য দিতে চেয়েছিল এবং তার পরিবর্তে আমেরিকা সেই দেশটির কাছে তাদের ‘সংশোধিত ভুট্টা’ বিক্রি করতে চেয়েছিল। তাহলে দেখা যাচ্ছে খাদ্য সাহায্য শুধু একটি দেশের বিদেশ-নীতিরই অংশ নয়, এটি ব্যবসায়ীক স্বার্থেও ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের দিকে যদি তাকাই, দেখবো আমেরিকা তখন নতুন জন্ম নেওয়া দেশের জন্য ২.২ মিলিয়ন টন খাবার আটকে রেখেছিল। কারণ, বাংলাদেশের তখনকার সরকার পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চাইছিলেন। তার এক বছর পরই ভয়ঙ্কর বন্যা এলো দেশে। তখনকার মার্কিন দূত বললেন তার দেশ বাংলাদেশকে খাদ্য দিতে পারবে না। কারণ, বাংলাদেশ কিউবায় পাট রফতানি করে। বাংলাদেশ নতজানু হলো। কিউবায় পাট রফতানি বন্ধ হলো; কিন্তু খাদ্য সাহায্য পৌঁছুতে অনেক দেরি হয়ে গেলো।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে সোমালিয়ায় প্রায় ৩০ লাখ এবং হর্ন অব আফ্রিকায় প্রায় এক কোটি মানুষ অনাহারে ছিলেন। তখন বিবিসি জানিয়েছিল, সোমালিয়ায় প্রায় সাড়ে ছয় লাখ শিশু অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগছিল এবং প্রতি ১০ হাজারে একজন করে শিশু প্রতিদিন মারা যাচ্ছিল। তখন বলা হয়েছিল যে ১৯৮৪ সালের পর সেটিই ছিল সবচেয়ে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। তখন সন্ত্রাসবাদীদের এর জন্য দ্বায়ী করা হয়েছিল। বলা হচ্ছিল যে আল-শাবাবের সন্ত্রাসীরা সোমালিয়ায় খাদ্য পাঠানোর পথ বন্ধ করে রেখেছিল। আমেরিকার হিলারি ক্লিনটন বলেছিলেন তার দেশ সেখানে ২৮ মিলিয়ন ডলারের খাদ্য সাহায্য দেবে। কিন্তু দেখার বিষয় তারা কত অর্থ খরচ করছিলেন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে।
বর্তমানে বুর্কিনা ফাসো’তে ২৫ লাখের বেশি মানুষ অনাহারে থাকবে সেই ভয় দেখা দিয়েছে। দেশে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফসল হয়নি। সেখানকার সরকার সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাউকে এখনও কিছু বলতে শুনিনি। বুর্কিনা ফাসো’তে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে– এটি তেমন একটা সংবাদ মাধমে প্রচারিত হচ্ছে না। যেইমাত্র আমেরিকা বা তেমন কোনও দেশ বুর্কিনা ফাসো’র ব্যাপারে কিছু বলবে, ঠিক তখনই তা খবর হবে।
এদিকে খরার কারণে আফগানিস্তানের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে আমাদের কাছে কোন খবরটি বেশি আসছে। অবশ্যই তালেবান এবং আমেরিকান সৈন্যদের খবর। প্রায় ২০ লাখ মানুষ সেখানে না খেয়ে আছে।
ক্ষুধা-কবলিত দেশগুলো থেকে যেসব ছবি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয় এবং টেলিভিশনে দেখানো হয়, তা দেখলে আমরা হয়তো মুখ ফিরিয়ে নেই; কারণ ওই খবর ও ছবিগুলো আমাদের তৈরি মানবতার প্রতি কর্কশ তিরস্কার, যা আমাদের সহ্য করতে কষ্ট হয়।
বর্তমানে বিশ্বে খাদ্যাভাব চলছে ১৩টি স্থানে। এর ১০টিরই কারণ সংঘাত বা যুদ্ধ। কোনও দেশে দুর্ভিক্ষ বা অনাহার দেখা দিলেই দাতা সংস্থাদের সাহায্যের কথা বলতে শোনা যায়, কিন্তু সেসব স্থানে সংঘাত নির্মূল করতে যা করা প্রয়োজন তা কাউকেই করতে দেখা যায় না।
বেশ কিছু বছর বিশ্বে খাদ্যাভাব কম ছিল। কারণ তখন সংঘাত কম ছিল। আবার অনাহারি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এরা সবাই সাধারণ মানুষ। সংঘাতের স্বার্থের সঙ্গে এদের সম্পর্ক নেই। এরা পরিস্থিতির শিকার।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, ক্ষুধার সঙ্গে সংঘাতের সম্পর্ক রয়েছে এবং খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতদিন পর? এত মানুষ মারা যাওয়ার পর? এ ঘোষণা ওই না খেয়ে থাকা মানুষগুলোকে কতটা সাহায্য করতে পারবে। জাতিসংঘ তো গেলো ৭০ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বে সংঘাত কতটা কমেছে?