‘অনামি যাত্রা সমাজ’- এর নতুন ভিডিও গল্প ‘ছিটমহল’

হামিম হোসেন মণ্ডল, টিডিএন বাংলা, করিমপুর নদীয়া জেলার করিমপুরে ‘অনামি যাত্রা সমাজ’ একের পর এক সর্ট ফ্লিম বা চলচিত্র গল্প বানিয়ে চলেছে। বর্তমান সমাজ থেকে উঠে আসা বা পাওয়া ঘটনা, আসুবিধা বা সামাজিক জীবনযাত্রার গল্প নিয়ে তারা ভিডিও ফ্লিম বানিয়ে চলে। চলমান চিত্রের স্যোশাল সাইট ইউটিউবেও ছাড়া হয়ে থাকে‘অনামি যাত্রা সমাজ’ নির্মিত ভিডিও ফ্লিমগুলি। তাদের বর্তমান গল্প হল ‘ছিটমহল’। নামেই বলেদিচ্ছে যে ছিটমহলের জীবন যাত্রা নিয়ে এই ফ্লিম। তারই সুটিং নিয়ে ব্যাস্ত অনামি যাত্রা সমাজের কলাকুশলিরা।

বুধবার এই ছিটমহল নিয়ে টিডিএন বাংলাকে অনামি যাত্রা সমাজ-এর পক্ষ থেকে সুশিল বিশ্বাস জানান :-

সিনেমা বলতে যা বোঝায়; সে ধরণের কাজ করবার যোগ্যতা আমাদের নেই। নিত্যদিন আমাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা যেগুলো আমরা সহজে এড়িয়ে যাই, আলোচনা সভায় বিষয় ভিত্তিক আলোচনায় অংশ নিয়ে সবজান্তা হয়ে কিছুদিনের মধ্যেই ভুলে যাই। মহানুভবদের চিন্তায় হয়তো দেশ এগিয়ে চলে। ঘুন ধরে সভ্যতার চাকায়। সত্যিকারের সভ্যতাকে পেছন থেকে টেনে ধরে একদল অবহেলিত বুবুক্ষ মানুষ। আমাদের এই  গল্পের বিষয় সেই সব মানুষ। সহজ কথায় ছিটের মানুষ। ছিটমহল হচ্ছে কোন দেশের মূল ভৌগলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং অন্য একটি দেশের মূল ভৌগলিক সীমানার অভ্যন্তরে বিরাজমান ভূখণ্ড বা জনপদ। ছিটমহল দেশের থেকে বিচ্ছিন্ন। ছিটমহলে যেতে হলে অন্য দেশের জমির উপর দিয়ে যেতে হয়। ভারতের কুচবিহার ও জলপাইগুড়িতে এই ছিটমহল। ইতিহাসের দিক থেকে ছিটমহলের ইতিহাস অনেক পূরনো। এর অতীত মোগল আমল পর্যন্ত বিস্তৃত।
        কোচ রাজাগণ এবং রংপুরের মহারাজাগণ মূলত ছিল সামন্ত। তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতা ছিল, ছিল ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে মহলের বিনিময়। বলা হয়ে থাকে, সেই মোগল আমলে প্রতিদ্বন্দী এই ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজা ও মহারাজারা মিলিত হতো তিস্তার পাড়ে দাবা ও তাস খেলার উদ্দেশ্যে। খেলায় বাজি ধরা হতো বিভিন্ন মহলকে যা কাগজের টুকরা দিয়ে চিহ্নিত করা হতো। খেলায় হারজিতের মধ্য দিয়ে এই কাগজের টুকরা বা ছিট বিনিময় হতো। সাথে সাথে বদলাতো সংশ্লিষ্ট মহলের মালিকানা। এভাবেই সেই আমলে তৈরি হয়েছিল একের রাজ্যের ভেতরে অন্যের ছিট মহল।
        আজকের ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের সমস্ত ভূমি ব্রিটিশ রাজের অন্তর্গত ছিল না। প্রায় ৪০ শতাংশ ছিল বিভিন্ন তথাকথিত স্বাধীন রাজ্য যেগুলিকে বলা হতো নেটিভ স্টেটবা প্রিন্সলি স্টেট। এ রাজ্যগুলি কার্যত ছিল ব্রিটিশদের অধীন তবে অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে রাজাদের কর্তৃত্ব বজায় ছিল। হায়দ্রাবাদে নিজামের মত কোচ রাজাও ব্রিটিশদের নেটিভ স্টেট-এর রাজা হিসেবে থেকে যান। ভারত ভাগের সময় এরূপ রাজ্যগুলিকে স্বাধীনতা দেওয়া বা ভাগ করার এখতিয়ার ব্রিটিশ রাজের ছিল না। ১৯৪৭ সালে ১৫ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স এ্যক্ট-১৯৪৭ পাশ করে। এ আইন অনুসরণ করে সেই বছরেই ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশরাজ বিলুপ্ত হয় এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে রাষ্ট্র গঠিত হয়। ছিটমহলের থেকে যায় ছিটমহলেই।
        ছিটমহলবাসীরা বাস্তবে নিজদেশে পরবাসী। তাদের নাগরিকত্ব কার্যত নামমাত্র নাগরিকত্ব। নিজেদের মূল দেশের সাথে তাদের যোগাযোগ নেই। এ যেন ক্যাম্পবন্দি জীবন। দেশের পরিচয়ে তারা বাংলাদেশের মানুষ,অথচ থাকতে হয় ভারতের ভেতর। আবার যারা ভারতের মানুষ, বসবাস বাংলাদেশের ভেতর। কিন্তু বাস্তবে এরা দেশহীন,নাগরিকত্বহীন। কোন দেশেরই যেন এদের  প্রতি কোন দায়িত্ব নেই। বাস্তবে এরা জীবন যাপন করছে ছিটের মানুষ পরিচয় নিয়ে। রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত।
        শিক্ষা,চিকিৎসা,পানীয়জল,রাস্তা ঘাট,যানবাহনের তেমন কোন সুযোগ-সুবিধা ছিটমহলের মানুষের নেই। নেই ব্যাংক,বিদ্যুৎ ব্যবস্থা,পাকা সড়ক,সেতু, হাটবাজার ইত্যাদি। ছিটমহলগুলোতে আইনের শাসন বলতে কিছু নেই। ৯০ শতাংশের বেশী মানুষ অক্ষর জ্ঞান শূন্য। কুসংস্কার, অবহেলা, অবিশ্বাস আর হয়রানি তাদের নিত্যসঙ্গী। অবরুদ্ধ জীবন যাপনের কষ্ট, যাতায়াত, শিক্ষা ও
স্বাস্থ্যসেবার কষ্ট, নিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতার কষ্ট
  সব মিলে দীর্ঘশ্বাসে ভরা অনিশ্চিত তাদের জীবন।
        অপরাধীদের অভয়ারণ্য ছিটমহলগুলোয় অপরাধ বেড়ে চলছে, দাগি অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে এই ছিটমহল। আইনি জটিলতার কারণে কোনো দেশের পুলিশই ছিটমহলে প্রবেশ করে না। তাছাড়া ছিটমহলে প্রশাসনেরও নেই কোনো কর্তৃত্ব। মানুষ পাচার,জাল নোটের কারবারের রাস্তা হয়ে আছে ছিটমহলগুলো। পেটের টানে; একটু স্বচ্ছলতার আশায় পাশপোর্ট বিহীন এই লোকগুলো অবৈধভাবে পাড়ি দেয়
মায়ানমার, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশে। আপনজনকে নিরাপত্তাহীনতায় রেখে যে আশায় বুক বেঁধে এরা পাড়ি জমায় অজানা সুখে  উদ্দেশ্যে; দালাল চক্রের পাল্লায় পড়ে কেউ প্রাণ নিয়ে শূণ্যহাতে ঘরে ফেরে আবার অনেকের পক্ষেই তার প্রিয়জনকে দেখবার সৌভাগ্য এ জীবনে আর হয়ে ওঠে না। স্বার্থলোলুপ, লালসার থাবা গ্রাস করে ফেলে তাদের বেঁচে থাকবার সামান্যতম অধিকারটুকুকে। সম্প্রতি ছিটমহল সংযুক্ত হলো বাংলাদেশ বা ভারতের ভৌগলিক সীমানার সাথে, কিন্তু সেই সুলতানী আমল থেকে অবহেলিত ছিটের মানুষ আজও রয়ে গেলো অবহেলিত। এমনই কিছু মানুষদের জীবনের দৈনন্দিন জীবন যাপন নিয়ে আমাদের গল্প
ছিটমহল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *