সাহিত্য অঙ্গনেও বিভেদের চেতনা 

0
মোহা: আজহারউদ্দীন, টিডিএন বাংলা : উনিশ শতকের প্রথম তিন দশকের মধ্যে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শতাব্দীই সম্ভবত ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক সৃষ্টিশীল চিন্তাধারা ও আবিষ্কারের যুগ। এই শতকে ইউরোপে যে উদারনৈতিক চিন্তাধারা, জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের বিকাশ হয় তার ঢেউ এসে আঘাত হানে ভারত ভূমিতে। ফলে ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতে জাতীয়তাবাদের সূচনা ঘটে। জাতীয়তাবাদের উন্মেষ এবং স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেরণা ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য জ্ঞান দর্শনের প্রত্যক্ষ ফসল। নবগোপাল মিত্র ন্যাশন্যাল সোসাইটি ও ন্যাশন্যাল পেপার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সর্বভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে জাতীয় ভাব বিকাশের চেষ্টা করেন। মিত্র মহাশয় হিন্দুদেরকে একটি স্বতন্ত্রজাতি হিসেবে দেখেছেন। তার প্রচারিত জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ধর্ম-সমগ্র ভারতে যেখানে হিন্দু আছে তাদের নিয়েই হিন্দুজাতি। পরবর্তীকালেই ধর্মাশ্রিত জাতীয়তা বোধই রাজনীতির ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতায় পরিণত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র জাতীয়তাবাদের ব্যাপারে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। ১৮৭২ সালে ‘ভারত কলঙ্ক’ ভারত বর্ষ পরাধীন কেন-এই প্রবন্ধে তিনি হিন্দুদেরকে স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে গণ্য করেন। তার প্রচারিত জাতীয়তাবাদ ছিল অতি সংকীর্ণ, তাতে হিন্দু ভিন্ন অন্য জাতির কোন স্থান ছিল না। রঙ্গলাল, হেমচন্দ্র এবং নবীনচন্দ্র প্রমুখ কবি ও সাহিত্যিকদের লেখায় সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ বিকাশের প্রবণতা দেখা যায়।
সাহিত্য যেকোনো দেশ, সমাজ-সভ্যতার দর্পন সে বিষয়ে সর্বশ্রেণীর জ্ঞানচর্চাকারী মানুষরা একমত হবেন তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।সমাজ ও জীবনবোধকে বাদ দিয়ে সাহিত্য হয়না। আর সাহিত্যেরও কোনো জাতের পরিচয় থাকার কথা নয়।সামাজিক সমস্যা, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ, তাঁর প্রাত্যহিক জীবনযন্ত্রণা ও সুখানুভূতি হল সাহিত্যের অঙ্গন। তাই হয়তো সামন্ততান্ত্রিক যুগেও রাজা-বাদশা-সুলতানরা সভাকবি রাখতেন নিজেদের প্রশস্তি রচনার জন্য।কিন্ত ওই সমস্ত প্রশস্তিতে প্রান্তিক মানুষের জীবন যন্ত্রণা কখনো স্থান পায়নি।তার অর্থ ততকালীন সাহিত্যিকরা নিজস্ব ভাবনার পরিস্ফুটন ঘটাতে পারতেন না। রাজার চাওয়াটাই শেষ চাওয়া ছিল।
কিন্ত জাতি-সমাজ ও সমাজ কল্যাণে সাহিত্যের ভূমিকা সর্বজন বিদিত। শুধুমাত্র সাহিত্যিকরাই পারে তাঁর লেখনী শক্তির দ্বারা কোনো জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে। বিশ্ব ইতিহাসের অধিকাংশ বৈপ্লবিক আন্দোলন, মুক্তি সংগ্রাম, অত্যাচার, অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই প্রভৃতির নৈপথ্যে নিঃশব্দে ক্ষেত্র তৈরিতে মুখ্যভূমিকা পালন করেছে লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরা। একটি ঘুমন্ত জাতিকে হটাত জাগিয়ে তুলতে পারে সাহিত্যের কলম। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, বাংলার নবজাগরণ, ফরাসী বিপ্লব কিংবা আফ্রিকার কালোবর্ণের মানুষের আন্দোলন হোক, সবার মূলে ছিল সাহিত্যিক, দার্শনিক ও লেখকদের ভূমিকা।
কবি সাহিত্যিকগণ তাদের লেখার মাধ্যমে গণচেতনাকে যেমন ইতিবাচক ও সত্যের দিকে পরিচালিত করতে পারে পক্ষান্তরে কোনো ঘটনা বা বিষয়কে ভুল ব্যাখ্যা করে সমাজ জীবনে বিভ্রান্তি ডেকে আনতে পারেন, সমাজের বিভিন্ন ভাষা গোসঠী,ও ধর্মবিশ্বাসের মানুষের মধ্যে বিভেদ, অবিশ্বাস ও ঘৃনাবিদ্বেষের বাতাবরণও তৈরী করতে পারেন।ভারতবর্ষের অনেক কবি সাহিত্যিক এই কাজটি জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে, নানা সময়ে, নানাভাবে ও নানা উদ্দেশ্যে খুব সূচারুভাবে করেছে। আজকের ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়ীকতার মত বড় বিপদ এরই ফল। কারণ তাদের একমাত্র পরিচয় সাহিত্যিক  কিংবা লেখক এই ধারণা থেকে তাদের লেখনী শক্তিকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।এমনকি বঙ্কিমচন্দ্রের মত এত বড় সাহিত্যিক ও নিরপেক্ষ ও সম্প্রীতির সাহিত্য রচনা করতে পারেনি।
সাহিত্যের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র যতটা হিন্দু জাতীয়তাবাদকে উদ্বুদ্ধ করেছে তার থেকে বহুগুন হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ফাটল ধরিয়েছে। একদিকে হিন্দু সম্প্রদায়কে নিজ পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াবাড় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে আর অন্যদিকে মুসলিম সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্বেষের চোরাস্রোত ঢুকে পড়েছে হিন্দু হৃদয়ের গভীরে।
সদ্ভাবনামূলক সাহিত্য চর্চার অভাবে একাবিংশ শতাব্দীতেও ভারতীয় না হয়ে, হয়েছি হিন্দু ও মুসলমান। বর্ববরতার অতীত ইতিহাসের মানচিত্র থেকে বেরোতে পারিনি।তাই আজও হিন্দুর ঘরে ও আর্তনাদের চিতকার আর মুসলমানের ঘরেও স্বজন হারানোর আর্তনাদ শোনা যায়। একদিকে যখন নজরুল, শরৎচন্দ্র সম্প্রীতির সাহিত্য রচনা করছে অন্যদিকে বঙ্কিম বিভেদের সাহিত্য রচনা করেছে। নিরক্ষরতা যেমন জাতির অভিশাপ, তেমনি বিভেদমূলক সাহিত্য রচনা করা জাতির অভিশাপের সামিল। তারপরও আবার বিভেদমূকল সাহিত্য রচনা ও সিলেবাসের পাঠ্যগ্রন্থে স্থান পাই।
এত জ্ঞানভাণ্ডার থাকার পরও আমাদের দেশের বড়মাপের সাহিত্যিকদের সৃজনশীলতা জাতি দর্পনের পরিবর্তে হয়েছে জাতি ধ্বংশের হোতা। আমাদের সাহিত্য, সাম্প্রদায়িকতার উগ্র বন্ধনে পরিবেসঠিত, বুদ্ধিমত্তায় একধরনের সন্ত্রাসী ভাইরাস নিঃশ্চুপে বাঁসা বেঁধেছে। মানবিক উৎকর্ষতায় ধুলো পড়ে গেছে, অসৎ গুন শ্রেষ্ঠগুণের আসন নিয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তি এখন কপটাপূর্ণ আর বুদ্ধিজীবি ক্রয়যোগ্য পণ্য।
মূলত ব্রিটিশ শাসন আমলে বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়ীকতার অনুপ্রবেশ ঘটে। তাই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে লড়াই করতে পারেনি। কারণ সাহিত্যরচনার ক্ষেত্রেও ছিল একপেশে বিদ্বেষমূলক আচরন। কখনোও বঙ্কিম আাবার কখনো ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের লেখা “অঙ্গরী বিনিময়” তার স্পষ্ট প্রমাণ। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম ভারত সম্রাট ঔরঙ্গজেব সম্পর্কে ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসে পাতায় পাতায় যে সব তথ্য তুলে ধরেছেন তার যথার্থতা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক ছিল, এখনো ও আছে। এই উপন্যাসের অক্ষরে অক্ষরে মুসালমানদে প্রতি কটাক্ষ ও বিদ্বেষ নিহিত রয়েছে অবলীলাক্রমে।
আজকের ভারতবর্ষে একদিনে মাথাচাড়া দেয়নি,
এতে রয়েছে মানববিদ্বেষী সাহিত্যিক ও কলামিস্টদের নিরন্তর প্রচেষ্টা। কুঁয়োতে মৃত বিড়াল পড়লে তার পবিত্রার জন্য পানি না তুলে আগে মৃত বিড়াল তুলে ফেলতে হয়, ঠিক তেমনি এই ভারতবর্ষে সম্প্রীতি প্রতিসঠার আগে বিকৃত ইতিহাস ও বিভদমূলক সাহিত্যসাধনাকে মুছে ফেলতে হবে। আর আল্লাহ হু   আকবর ও জশ্রীরাম ধ্বনি অর্থ যদি নির্মমভাবে মানুষ হত্যার উৎস  নিহিত থাকে তাহলে সেটাও ছেঁটে ফেলতে হবে।জিন্নার মতো একজন অধার্মিক আল্লাহু আকবার ধ্বনি তুলে দেশ ভাগ করেছে আর সম্প্রীতির বাহক গান্ধীজিকে গডসের অনুসরণকারীরা জয়শ্রীরামের ধ্বনি তুলে জাতীয়তাবাদের পেটেন্ট নিয়ে দেশটাকে টুকরো টুকরো করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এদের বিরুদ্ধে নতুন করে কলম ধরে দেশ ও জাতিকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে সাহিত্য সাধনা ও ইতিহাস চর্চায় মনোনিবেশ করতে হবে। আমাদের এই মিটমিটে ভাবনা হয়তো একদিন প্রজ্জ্বলিত শিখার মতো জ্বলে উঠবে আর আমাদের মাতৃভুমি ভারতবর্ষ সত্যিকার অর্থে সম্প্রীতর পবিত্র ভূমিতে পরিণত হবে।