স্বাস্থ্যই ব্যবসা : বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করে বিশেষ নিবন্ধ লিখলেন প্রাবন্ধিক মো: আজাহারউদ্দিন

0

টিডিএন বাংলা : যান্ত্রিক সভ্যতায় উদ্ভাবনী শক্তির ক্রমবিকাশে মানুষ পাতাল থাকে আকাশের দিকে ছুটেছে, বিজ্ঞানের কলাকৌশলে চাঁদে পা রেখেছে। শুধু তাই নয় চাঁদের জমি নিলামে বিক্রিরও সমস্ত আয়োজন হয়তো শেষের দিকে। এককথায় সভ্যতা অ্যান্টি-ক্লাইমেক্সের পথে। কিন্ত বিজ্ঞানের এত চলমান অগ্রগতিতেও মানুষকে হাসি-খুশি রাখার একটি টনিকও আবিস্কার করতে পারলো না। রহিম ভেবেছিল তার বাবা হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে হ্যাঁ ফিরলোও সে কিন্ত নিথরদেহ হয়ে,   তার পরিবারকে বিশ্বপ্রকৃতির মালিকের অভিভাবকত্বে সে এক অজানা জগতের দিকে রওনা দিলেন। কিন্ত ডাক্তার বা হাসপাতালের মালিকের ভাগের অংশে কমতি হয়নি। একদিকে অসহায় মানুষের আকাশ-বাতাস আন্দোলিত করা ক্রন্দনে মাটি বিদীর্ণ হয়েছে, অন্যদিকে শহরের মধ্যমণিতে ডাক্তার আর ডাক্তারে বউয়ের ঝা চকচকে ফ্লাট আর লেটেস্ট মডেলের একটি ফোর হুইলার কেনার চরম আনন্দে ঠোঁটদুটো শিউলি ফুলের ন্যায় পুলকিত হয়ে বিলাসিতার মোহে আচ্ছন্ন।

যে সময় সরকারি চিকিৎসালয় গুলো গোচারণের ক্ষেতে পরিণত হতে শুরু করেছে ঠিক সেই সময় বেসরকারি চিকিৎসালয় গুলো বেলজিয়াম কাঁচে রাজপ্রসাদ গড়ে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। সুচিকিৎসার হোডিংয়ে রোগীকে প্যাকাজের পাঠ নিতে হয়। আশঙ্কা ও ব্যয়বহুলের আতঙ্কে সর্বদা রোগীর হার্টবিট ঝড়ের গতিতে উঠানামা করে।

সর্বস্ব খুইয়ে যায় চিকিৎসা খাতে। সমাজ-সেবার নামে ছদ্মবেশে সমাজবিরোধী আচরণ সর্বোত্রই জগদ্দল পাথরের ন্যায় দানব হয়ে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে হাসপাতাল-নার্সিংহোমের মালিক ও ডাক্তারের আয়ের নেশা। খলিলের মায়ের ছুটির দিনে নার্সিংহোমে ডাক্তারের অনুপস্থিতি। খলিলের মাকে আরাকদিন থাকতে হবে। এর জন্য। আরো তিন হাজার টাকা খরচের খাতে যোগ করতে হবে। ডাক্তার বাবু আপনি কি জানেন খলিলের মা তার পড়নের গহনাটা সুদখোরদের বাক্সে বন্ধী রেখে এসেছে?

সম্প্রতি তিনদিনে সরকারি-বেসরকারি মিলে আমি চারটি হাসপাতাল স্বশরীরে ভিজিট করে সমাজসেবার বিবর্তনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মনুষ্যত্বের নতুন সংজ্ঞা আবিস্কার করি, যে রোগী চিকিৎসালয়ের দরজায় আর্তনাদ করে বলবে আমাকে একটু বাঁচান আর চিকিৎসালয়ের ভাড়াটিয়া দানবরা বলবে আমাদের এখানে এতটাকা খরচ হবে আপনি কি সক্ষম আছেন? উত্তর যদি সদর্থক হয় তাহলে আপনার আর্তনাদে তারা সাড়া দেবে, অন্যথায় পথের ধূলিকণাকে সাক্ষী রেখে বাড়ির গন্তব্যে ফিরে যেতে হবে, তাকে বলে চিকিৎসা শাস্ত্রে মনুষ্যত্ব।

আমাদের রাজ্য ও দেশের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে উন্নয়নের গল্পটা কত হাস্যকার ও মজাদার তার স্পষ্টতায় কোনো সংশয় থাকবে না। মু্র্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ কিছু চলমান চিত্র তুলে ধরবো। মেডিক্যাল কলেজ নামটা কত মুখরোচক। ইমারজেন্সি কোনো রোগী নিয়ে গিলে হাসপাতালের প্রথমতলের সিঁড়ি অতিক্রম করার আগেই মারা যাবে, সেখানে না আছে কোনো হেল্পার আর না আছে যথেষ্ট রোগীবহন করা ট্রলি ১০/১৫ মিনিট ধরে দিকভ্রান্ত হয়ে ট্রলি খুঁজে পাওয়া গেলেও বাড়ির লোককেই ঢেলা দিয়ে নিয়ে যেতে হয় উপরতলার দিকে আবার একটা বেডে দুজন রোগিকে রাখা হয়। গরু গোয়াল ঘরে তার থেকে ভালো অবস্থায় থাকে। তাই হাসপাতাল উঠিয়ে গোরুর গোয়াল ঘর করলে অন্ত:ত গোরক্ষাবাহিনীরা তো খুশি হবে।

এবার আসুন একটু বেসরকারী হাসপালের দিকে যায়। কলকাতার কিছু নামী হাসপাতালের শিরোনামে আছেন আপোলো, আর.এন টেগর, পিয়ারলেস, ডিসান, আমরি প্রভৃতি। আজ থেকে ১১বছর আগে সালটা ছিল ২০০৭ চিকিৎসা সূত্রে আমি প্রথম কলকাতার সঙ্গে পরিচিত হই চিকিৎসার স্থানটা ছিল অ্যাপোলো হাসপাতাল। আমার বন্ধুর ভাগ্নির এক সন্দেহজনক রোগের জন্য সেখানে নিয়ে গিয়েছিলাম একঘণ্টার মধ্যে খরচ হয়েছিল ১২ হাজার টাকা। তখন থেকেই আমার বেসরকারী হাসপাতাল সম্পর্কে ধারণা হয়েছিল। ২০১৮ সালে সেই ধারণা খুব স্ট্রং হয়ে উঠল। সম্প্রতি আমার কাকার হার্টের চিকিৎসার জন্য কলকাতার আর.এন টেগর হাসপাতালে এসেছিলাম পেসেন্টকে গাড়ি রেখে আমি ইমারজেন্সি কক্ষে ঢুকে পড়ি। প্রথমে আমাকে বলা হয় আমাদের এখানে চিকিৎসা করালে প্রতিদিন ২৫/৩০ হাজার টাকা খরচ হবে। পরিস্থিতি কিছু করার নেই চিকিৎসা করাতে হবে আমি রাজি হয়ে যায়। ২২ হাজার টাকা খরচ  করে কার্ডিয়াক অ্যাম্বুলেন্সে করে ২১৫ কিমি. পথ অতিক্রম করে এসেছি। রোগীকে ইমারজেন্সিতে নেওয়া হল আবার বেড পেতে একটু দেরি হবে বলল। এইদিকে অ্যাম্বুলেন্স ওয়ালা আবার বলছে এক ঘন্টা দেরি হলে অতিরিক্ত হাজার টাকা চার্জ দিতে হবে একথাটা আমাকে বারবার বলছে আমি রেগে গিয়ে বললাম আপনাদের মধ্যে কোনো হিউম্যানিটি আছে? আমাকে বলল দাদা সব জায়গায় এই নিয়ম, তা বুঝলাম কিন্ত পরিস্থিতি বুঝে কথা বলবেন তো। আসলে তা নয় একাবিংশ শতাব্দীর মানুষ চিকিৎসাকে লাভজনক ব্যবসা হিসাবেই গ্রহন করেছে আমার সেই ঘটনা তার ব্যতিক্রম নয়। নিঃসন্দেহ তারা আর্নিং অ্যাডিক্টেড ডিজিজে সাফার করছে।

আমি জানি আমার ক্ষুদ্র সাহিত্যচর্চায় এই সমাজটাকে পালটাতে পারবো না কিন্ত যারা সমাজ পরিবর্তনের পেটেন্ট নিয়ে পুঁজিবাদের হুঙ্কারে বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে  সাম্যবাদ প্রতিষ্টার কাতারে পা মিলিয়ে পুঁজিবাদ উৎখাতের লিটারেচার ছড়িয়ে রেখেছে কেন তারা গাছতলার লোকদের কথা না ভেবে পাঁচতলা প্রসাদের অট্টালিকা উদ্বোধনের তাদের স্মৃতি ছড়িয়ে রেখেছে? আমি সাহিত্য ভাবনার ক্ষুদ্র প্রয়াসে বেশিকিছু করতে না পারলেও আপনাদের দায়বদ্ধতা নিয়ে জাতির সামনে প্রশ্ন তুলতেপারি।

আর আপনাদের দোরেখা একাদশীকে অপরাধের কাঠ গড়ায় দাঁড় করাতে পারি এর সাথে একটু চিকিৎসালয়ের মালিক ও চিকিৎসকদের সালাউদ্দিনের ইতিহাস মনে করিয়ে দিতে পারি। যে সালাউদ্দিন আয়ুবী ছিলেন একজন যৌদ্ধা। ইউরোপের মানুষ তার রণকৌশলকে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারবেনা।সেই সালাউদ্দিন শুধু যৌদ্ধাই ছিলেন না তার সাথে তিনি ছিলেন তৎকালীন একজন খ্যাতিমান চিকিৎসকও। যৌদ্ধা  হওয়ার পরেও তিনি রণজয়ী হতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন তার পবিত্রভুমি রক্ষা করতে। আর যুদ্ধের শেষে বিরোধীশক্তির মধ্যে যারা যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হতেন ছদ্মবেশে তাদের তিনি চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলতেন। এটা ছিল তার মনুষ্যত্ব ও পেশার দায়বদ্ধতা আর এখন ডাক্তাররা সেবার নামে চালাচ্ছে মানুষ হত্যা।

আপনারা কি ডাক্তারের বেশে মনুষ্য সেজে ছদ্মবেশী কষাই হয়ে  হত্যালিলা অব্যহত রাখবেন? না আপনার পেশার মর্যাদা রক্ষা করবেন? এই প্রশ্ন আমার নয় হাজার হাজার এই দেশের মজলুম মানুষের। যারা সুচিকিৎসার অভাবে ধুকে ধুকে মরে আর আপনাদের কাছে কিন্ত আপনাদের পাষান হৃদয়ে সেই বিবেক জাগ্রত হয়না। তাই শেষে বলতে চাই আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে কষাই না হয়ে সালাউদ্দিনের মত ডাক্তার হবে।