“মোবাইলের শাসন” বিশেষ নিবন্ধটি  লিখেছেন প্রাবন্ধিক মো: আজাহারউদ্দিন 

0

মো: আজাহারউদ্দিন, টিডিএন বাংলা : ‌৯০-এর  দশকে আমার জন্ম। এক পলকে আমার জীবন থেকে ২৮ টি বসন্ত ঝরে পড়েছে। মনে পড়ে আমার ছোট বেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের আম্রকানন যা এখনও রয়েছে কিন্ত সেই মালিকগুলো আর বেঁচে নেই। আর এই দশকের শিশুরা আম্রকাননে প্রবেশ করার স্বাধীনতা ও হারিয়েছে। সেই আমার প্রাইমারি স্কুলের ঘুগনিওয়ালার কথা আজও মনে পড়ে মাত্র ৫ পয়সায় এক প্লেট ঘুগনি পাওয়া যেত। পাশের বিদ্যালয়ের ২০০ মি. দূরত্বে ছিল রেল পথ আজও আছে ট্রেন গেলেই টাটা-বাই-বাই জানানো তখনও আমার ট্রেন যাত্রার অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রথম আমার ট্রেন যাত্রার সালটা ছিল ১৯৯৬। যাত্রার দূরত্ব ছিল বর্তমান ঝাড়খন্ড রাজ্যের পাকুড় স্টেশন থেকে বর্ধমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান স্টেশন সঙ্গে ছিল ছিল পিতা ও আমার বড়দাদা। তখনও যোগাযোগের মাধ্যম এত উন্নত হয়নি। আমারর স্পষ্ট মনে পড়ে গ্রামে হাতে গণা কয়েকটা টিভি আর কয়েকটা ল্যান্ডফোন বা টেলিফোন, মোবাইল প্রায় ছিল না। বিংশ শতাব্দীতে মার্টিন কুপার মোবাইল শাসনের গোড়াপত্তন  করেছিলেন। আজ তার  শাসন পৃথিবীর সব মানচিত্রে অব্যহত।


একাবিংশশতাব্দীর ভারতে জনসংখ্যার চেয়ে মোবাইলের সংখ্যা বেশি। পরিবার শোচালয় না থাকলেও একটি আন্ড্রয়েড সেট আছে। তা থেকেই বোঝা যায় যোগাযোগের গুরুত্ব কতটা বেড়েছে তা অস্বীকার করারও নয় কিন্ত ব্যবহারের অসাবধানতার জন্য বিপদ ধেয়ে এসে মৃত্যুর কিনারা পর্যন্ত পৌছে দেয়। আর তখনই আমরা মোবাইলের  স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে যায়।

আমরা ভালো করে জানি কথা হবে বার বার জীবন একবার আমরা মোবাইল আসক্ত হয়ে পড়েছি তাতে কাজের থেকে অকাজ আমাদের বেশি ভীড় করে। তাই নানাভাবে আমরা খুব সহজেই দূর্ঘটনার কবলে পড়ে যায়। ফলে অকালেই পৃথিবী থেকে ঝড়ে পড়তে হয়। বিশেষ করে পরিবহন দূর্ঘটনা কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে শুধু মোবাইলের কারণে। নিশ্চয় আমাদের চেয়ে মোবাইলের গুরুত্ব বেশি নয়। কিন্ত আমরা ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারি না।ফলে হাজারো অপূর্ণ মুল্যবান জীবন আমরা শেষ করে ফেলেছি।

বিজ্ঞানের প্রত্যেকটা পদক্ষেপ মানুষের মুশকিলকে আসান করারর জন্য আমাদের অজ্ঞতা মুশকিল থেকে বেরোতে পারেনি।আসলে বিজ্ঞানের আবিষ্কারটা গবেষণালব্দ হলেও ব্যবহারিক দিকগুলো গবেষনালব্দ হয়ে ওঠেনি।তাই বিজ্ঞানের সুফল থেকে কুফলের শিকার আমরা বেশি হচ্ছি। আর মোবাইলের মত একটা ছোট্ট যন্ত্র আমাদের শাসন চালাচ্ছে। আর এই শাসন শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ আমরা মুক্ত হতে পারিনি।

মোবাইল আমাদের ঘুমের উপর থাবা বসিয়েছে। অবসর সময়ের স্বস্তিতে ভাগ বসিয়েছে।আপনি সঠিক সময়ে ফোন রিসিভ করতে না পারলে আপনার প্রিয়জনদের রাগের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হয়।আবার কোন বন্ধু বলে বসবে তোকে কোনো ফোনে পাওয়া যায়না। আবার কেউ বলবে তুই এখন বড়োদরের লোক। নানা রকম সায়সূত্রে আপনার জীবনকে নিশ্চয় অতিষ্ট করে তোলে। আর প্রেমিক প্রেমিকাদের কথোপকথনে সময় জলের চেয়ে কম মূল্যে বিক্রি হয়।অনেক সময় আপনি সময়ের হিসাব মেলাতে পারেন না কিন্ত প্রেমিককে সময় দেওয়ার ব্যাপারে আপনি অতি যত্নবান হয়ে ওঠেন। মোবাইল যে সত্যিই আমাদের উপর শাসন চালাচ্ছে সেটা আমরা বুঝ পারছিনা।

মোবাইলে আপনি ফেসবুক, হোয়াটসআপ, ইউটিউব, ইমো, ইমেল, টুইটার খুব বেশি ব্যবহার করেন এবং এগুলোর মাধ্যমে খুব সহজে যে কোনো জিনিস আদান-প্রদান করে পারে। আর প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে নেট এ্যাক্টিভ রাখতে হয় কিন্ত আপনি কি দেখিছেন অনেক সময় আপনি নেট এ্যাক্টিভ না রেখেও মোবাইলে ফেসবুক ওঠানামা করেন।আসল কথা হল আপনি একজন ফেসবুক এ্যাডিক্টেড মান হয়ে পড়েছেন।

বর্তমান শতাব্দীর এমন শিশু খুঁজে পাওয়া ভার যে তার অবিভাবক মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার শিশুকে নিয়ে অস্থির নাই। তাদের সাংস্কৃতিক মানসজগত গেমস আর কার্টুনের দখলে।

অবিভাবক সেই শিশুদের উপর নিয়ন্ত্রন গেলে শিশু কিশোরা আত্মহননের পথও বেছে নিচ্ছে। পোস্ট-কলোনিয়াল যুগে আসলে মোবাইলের শাসন নিরঙ্কুশ শক্তির অধিকারী।

আমরা ফোন ব্যবহার করি যাতে সব সময় অন্যদের সাথে যোগাযোগ রাখা যায়। কিন্তু এটি একইসাথে আমাদের মানসিক প্রশান্তিও কেড়ে নেয়। আমরা সব সময় আশা করতে থাকি এই বুঝি ফোনটি বেজে উঠবে কিংবা কেউ হয়তো মেসেজ দিবে। এমনকি মাঝে মাঝে ওয়াশরুমে আমাদের ফোন রিসিভ করতে হয়।

সচেতনভাবে না হলেও আমাদের অবচেতন মন আমাদের সব মনোযোগ এই ক্ষুদ্র ফোনটির কাছে কেন্দ্রীভূত করে। এধরণের চিন্তার কারণে এক ধরণের মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। প্রতিদিন এক ঘন্টার জন্য ফোনটি সুইচ অফ করে রাখুন। এটি আপনাকে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিবে।

আবার দেখুন কতরকম বোকা বানানোর ফাঁদ পেতে রেখেছে। হঠাৎ আপনার মোবাইলে ম্যাসেজ এল যে আপনি ৫/১০ কুংবা ৫০ লাখ টাকা জিতেছেন।আপনার ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্ট নম্বর ও চাইবে। কত অনর্থক ক্রিয়াকলাপের আপনি শিকার হচ্ছেন। কখনও প্রত্যক্ষ আবার কখনও পরোক্ষভাবে মোবাইল আপনাকে নিয়ন্ত্রন করছেই।

জল, জঙ্গল, প্রস্তর, নব্যপ্রস্তরযুগ ও ডাইনসরের যুগ পেরিয়ে এখন মোবাইলের স্বর্ণযুগে অবস্থান করছি। মোবাইলের শাসনে মানুষ হারিয়েছে সোনালী অতীত, আর প্রগতির মাঝে ভিড় করেছে টেনশন, আসক্তি, ভুলবুঝাবুঝি, মিথ্যার বাড়বাড়ন্ত, অলসতা, হারিয়েছে অকৃত্রিমতা, বেড়েছে ক্যান্সার, টিউমারের মত মরণব্যাধি রোগ। সত্যি মোবাইল এই যুগের বিস্ময়কর সফল শাসক। মোবাইলই একমাত্র শাসক যিনি সমগ্র পৃথিবীকে শক্ত হাতে সামাল দিচ্ছে।