ছায়ামূর্তি

0

নিজামউদ্দিন মোল্লা, টিডিএন বাংলা: জানুয়ারি মাসে এই প্রচন্ড শীতে পিকনিক জমে উঠেছে। জমে উঠবার তো কথা রান্না, আড্ডা আর অনেক কিছু চলছে। আমরা সপরিবারে আজ মেদিনীপুরে এসেছি। অনিলিখা দি ও বিশ্বজিৎ দা ও এসেছে। অনিলিখা দি এসেছে আর গল্প জমবে না তা কি হয়! তাই আমিই প্রশ্ন করলাম, “আচ্ছা অনিলিখা দি, এই জায়গায় আগে এসেছ কখনো?”

অনিলিখা দি একটু চুপ করে বলল,”না এটা কোলাঘাট এখানে আসিনি! এই প্রথম  এলাম।”
” আচ্ছা এই সোজা রাস্তা হাওড়া থেকে এলে গাড়ি করে, এই হাওড়া টু কোলাঘাটের মধ্যে কোথাও এসেছিলে এর আগে?”
” হ্যা! তবে সে এক মস্ত কাহিনী!” এটা বলেছে মাত্র সকলে বলে উঠল তাহলে শোনাও না প্লিজ!
অনিলিখা বলে উঠল, “ওকে তাহলে শোনো। ”

আজ থেকে প্রায়  বারো বছর হবে, তখন মামার সাথে বেড়িয়েছিলাম  হাওড়ায়। কোথায় কিভাবে জানি না! কিন্তু মামার সব চেয়ে বড় ইচ্ছে ছিল জমিদার বাড়ি দেখতে, পুরানো আমলের ঘর-বাড়ি ও আসবাবপত্র মামার খুবই পছন্দ। তাই আমার মামা একদিন এই শীতের সকালে আমাকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল, গ্রাম টার নাম মনে আছে আর সারাজীবন মনেও থাকবে। গ্রাম টার নাম ‘সারেঙ্গা’।নদীর ধারে এই নির্জন গ্রাম খুবই অসাধারণ। মামা খোঁজ পেয়েছিল,ওই গ্রামে একটা জমিদার বাড়ি আছে, আর সেখানে এমন কিছু পুরানো আমলের জিনিসপত্র আছে যা অমূল্য । সেই খবর পেয়ে মামা আমাকে নিয়ে গেল।
জমিদার বাড়ি নাম শুনেছি আমার জীবনের প্রথম অতবড় পুরানো বাড়ি দেখলাম, যার কাঠামো সত্যি অসাধারণ।  বাড়িটার নাম ‘রমজান মোল্লার বাড়ি’। গ্রামের জমিদার ও ক্ষমতাবান লোক ছিলেন এই রমজান মোল্লার। তা বাড়ি দেখেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
মামা সেখানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল ” এই মহলের মালিক কে এখন!”
তখন যেই ব্যক্তিটাকে জিজ্ঞাসা করল, তিনি উত্তর দিলেন,”কেন আমি”
মামা বললেন, “আচ্ছা আমি কলকাতা থেকে এসেছি, খবর পেয়েছি আপনাদের বাড়িতে অনেক পুরানো আমলের জিনিসপত্র আছে সেগুলি দেখতেই এলাম।”
লোকটি চুপ করে আমাদের দুজনকে প্রথমে ভালো করে  কিছুক্ষণ দেখল,  তারপর বলল, “আসুন আমার সাথে।” এই বলে আমাদের নিয়ে ভিতরে দিকে রওনা হলাম। যেতে যেতে লোকটি প্রশ্ন করলেন, “আপনাদের নাম কি!” মামা নিজের নাম ও আমার পরিচয় দিলেন।
লোকটি লুঙ্গি ও ফতুয়াধারী কিন্তু কি অদ্ভুত কথা, কত রহস্য, কত ইতিহাস বললেন আমাদের  আর তার সাথে দেখালেন বাড়ির মধ্যে থাকা অমূল্য আসবাবপত্র।  আর তার সঙ্গে দেখলাম সেই বড় সিন্দুক।
লোকটার নাম টাই বলতে ভুলে গেছি, লোকটির নাম সুলতান। বড় চেহারাযুক্ত কিন্তু মন বেশ স্বচ্ছ। তিনি আমাদের দুপুরের খাবারের ও ব্যবস্থা করলেন। পুরো মহল টা ঘুরলাম, বাইরে থেকে জীর্ণ হলেও  ভিতরে যেন জাদুঘরের মত সাজানো।

মামার লোভ ওই দানবীয় সিন্দুক টার উপরে দাঁড়ালো। মামা  সুলতান বাবু কে বললেন,” আচ্ছা এই সিন্দুক টাকে খুললে কেমন হয়!”
“না একবারে ও নয়। আর পাশের ঘরে প্রবেশ করবেন না।” এই বলে সুলতান বাবু আমাদের বাইরে নিয়ে গেলেন,  পুরো গ্রাম ও নদীর ধার ঘোরালেন।
বিকেল শেষ করে সন্ধ্যা নেমেছে। মামাকে বললাম, “মামা বাড়ি যাবে তো!”
” হ্যা চল তাহলে।” এই কথা শেষ হয়েছে, হঠাৎ পাশ থেকে সুলতান বাবু  বললেন,” আজ রাতে থাকুন, কাল ভোরেই বাড়ি ফিরবেন নাহলে! ”
অনেক জোর করার পর মামা থাকার সিন্ধান্ত নিল। বাড়ির মধ্যে অনেক ঘর  তাও সিন্দুক যে ঘরে আছে সেই ঘর টা আমাদের জন্য রাত কাটানোর ব্যবস্থা করল।রাতে খাবার পর আমি আর মামা সেই ঘরে প্রবেশ করে, আমিই মামাকে বললাম,” আচ্ছা মামা এটা কি কোন সন্দেহ হচ্ছে না!”
” কেন কিরকম?”
“সারাদিন এই গ্রামে কাটালাম, একটা লোক দেখতে পেয়েছ কি! শুধু এই ভদ্রলোকটি বাদে!”
“তা ঠিক বলেছিস তুই। কিন্তু কি জানি কেন? আর আমার মনে এই সিন্দুক আর ওই কোণের ঘর টাকে নিয়ে খটকা লাগছে বুঝেছিস!”
” কেন  সিন্দুকে কি থাকতে পারে বলে মনে হয়!”
“দামী জিনিস, টাকাকড়ি আরো অনেক রত্ন!”
” দূর মামা তুমি ভুল করছ! সেই রকম হলে এই ঘরে থাকতে দিত না কখনই।”
” তা দেখাই যাক এটাকে খুলে।” এই বলে মামা  চাবি খুজতে লাগল, পাশের মেহগনি কাঠের আলমারি থেকেই পাওয়া গেল সেই বিশাল চাবি, যার লক এই সিন্দুকে। খুব চেষ্টা করে খোলা হল, এই সিন্দুক তাতে ছিল কিছু চিঠিপত্র ও পুরানো হলদেটে কাগজ।
মামা এটুকুতেই থামল না, সেই কোণের ঘরটার দরজা খুলে প্রবেশ করল, অন্ধকারে কিছুই চোখে পড়ল না, কিন্তু এক জ্বলন্ত উজ্জ্বল রত্ন চোখে পড়ল সেটাই অন্ধকারে তুলে পকেটে পুরে নিল মামা।
কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর, হালকা তন্দ্রাভাব জেগেছে তাই আমি মামা দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, হটাৎ অনুভব করলাম আমার মাথার কাছে কে যেন  দাঁড়িয়ে। বিশাল লম্বা ও শক্তিশালী পুরুষের চেহারা। কিন্তু এটা বেশ বুঝতে পারলাম এটা মানুষ নয় ছায়ামূর্তি। আমি একটু ভয় পেয়েও নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করি,” কে আপনি!” উত্তরে এক কঠিন ভয়ানক গলায়  বলল, “আমি কে! আমাকে জানো না, আমি কে? আমি এই বাড়ির মালিক। রমজান মোল্লা।”
“ওহ আপনি! বুঝতে পারিনি! কিন্তু আপনি তো অনেক বছর আগে মারা গেছেন, তাহলে? ” এটা বলে একটু ভয় পেয়েছি, আমার শরীর এক ভয়ের শিহরণ খেলে গেল। তখন আবার উত্তর পেলাম,” এটা আমার বাড়ি, এখানে কি জন্য এসেছ! আমার শোবার ঘরে কেন প্রবেশ করেছ!”
আমি মামাকে ঠেলে তোলার চেষ্টা করছি,কিন্তু মামা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ বাড়িটা পুরোটা কাঁপতে লাগল, এক ঝোড়ো হাওয়া চলার অনুভব করলাম, সেটা নিজের বুকের ভিতর না বাইরে তা বুঝে উঠতে পারলাম না।  মামাকে ধাক্কা দিয়ে তুললাম, মামা উঠে দেখল তাঁর মুখের সামনে সেই বিশাল ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে, তখনই মামার মুখে একটা শব্দ ভয়ে ভয়ে উচ্চারণ করল, “অনি……… ঐ অনি। ” এটুকুই বলল, তারপর দুজনেই রাতের বেলায় লম্বা ছুট দিলাম। ভোর হয়েছে, আমরা অনেক দূর চলে এসেছি। তখন মামার সাথে কথা বলার চেষ্টা করি, কিন্তু মামার মুখ দিয়ে কিছুই বেরোচ্ছে না।সকাল হতে আমরা অন্য একগ্রামে এসে পড়েছি, আমি ওখানে একটা পরিবারের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি, এই বলে অনিলিখা চুপ করল, কিন্তু আমার মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে তাই অনিলিখাকে বললুম, ” কি জানতে পারলে?” অনিলিখা বলল, জানতে পারলাম, রমজান মোল্লার বাড়ি অনেক বছর আগেই পুড়ে গিয়েছে। আর ওই বাড়ির ভিতরের ঘরে রমজান মোল্লার কবর ও আছে।আর সুলতান হল রমজান মোল্লার দাড়োয়ান যে ওই বাড়িটা পোড়ার সময় বাড়িতে পুড়ে মারা গেছে।

এদিকে মামার অবস্থা খুব খারাপ মুখ দিয়ে একটাও কথা বেরোচ্ছে না আর।আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না ওটা পোড়া বাড়ি কারণ অতকিছু সব ভালো দেখলাম সেটাকে পোড়াবাড়ি বলে মানতে পারলাম না, কিন্তু এই গ্রামের কিছু জন আমাকে আবার নিয়ে গেল, সেই বাড়ির সামনে গিয়ে দেখলাম, কি অদ্ভুত! সত্যি বাড়িটা পোড়া।
যা হোক করে, মামাকে বাঁচিয়েছি, দুদিন পরেই মামা কথা বলেছে। মামা নিজেও বিশ্বাস করতে পারেনি,  কিন্তু হঠাৎ মামা আমাকে একটা সাদা রঙের রত্ন দেখিয়ে বলল, ” অনি এটা কি জানিস?”
” এটা তো সেই রত্ন টা!”
“হ্যা এটার রঙ চেঞ্জ হয় দিনে দিনে।”
“তাই নাকি!”
“হ্যা দু দিনে প্রথমে হলুদ ছিল এখন সাদা হয়েছে। ”
“মামা পাথর টা দেবে আমায়?” মামা আমাকে পাথর টা দিয়ে বলল, “সামলে রাখিস!” আমি তাই নিজের ঘরের নিজের আলমারিতে লুকিয়ে রেখেছি।
পরের দিন রাতে শুয়েছি, হঠাৎ অনুভব করলাম সেই ছায়ামূর্তি। আমাকে প্রশ্ন করল, ” আমার রঙীনসাগর রত্ন কোথায়?”
আমি দেখেই ভয় পেয়েছিলাম, তার পর বলি, “আলমারিতে।” দেখি  চলে গেল সেই ছায়ামূর্তি।  আমি সকালে উঠে যখন আলমারি থেকে সেই রত্নটা খুঁজি তখন কোথাও নেই। জানি তোমরা কেউ বিশ্বাস করবে না এই কাহিনী তাই এত দিন আমি বলিনি।  ভূত-প্রেত আমার বিশ্বাস হয়না কিন্তু ঐ ঘটনাকে আজও ভুলতে পারিনি।  এই বলে অনিলিখা থেমেছে তখন, সবার ফেকাসে মুখ টা চোখে পড়ল। ইচ্ছে হল নিজের মুখটাও আয়নায় দেখি, কিন্তু জানতাম সবার মত আমার মুখও ফেকাসে হয়ে আছে ।