‘ওরা বাঁচতে দিল না’

0

ওরা বাঁচতে দিল না

সমীরণ খাতুন

হাতে একটা সুন্দর তাজা লাল গোলাপের বকে নিয়ে দাঁড়িয়ে সেন্টাল পার্কের ঝিলের পাশে আছে বছর পঁচিশের জয়দেব ব্যানার্জী(জয়)। বছর একুশের সদ্য কলেজ শেষ হওয়া সুন্দরী স্মার্ট আলিয়া পারভিন(রাই) এসে বললো, সরি জয় একটু দেরি হয়ে গেলো। তাতে আর কি আসে যায় রাই সুন্দরী। আমাদের দেশ প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে গেলেও নেতাদের মন আজও একশো বছর পিছিয়ে। তাহলে ভাবো পরিবর্তন হতে আরও কত সময় লাগবে? আচ্ছা রাই তোমাকে একটা প্রশ্ন করবো? এতে অনুমতির কি আছে জয়, নির্দিধায় বলো।


আমাদের প্রেমটা না হলেই ভালো হতো রাই। আচ্ছা তুমি আমাকে কেন ভালোবাসো বলতে পারো? আমি হিন্দু আর তুমি মুসলিম। এখন উপায়?

আজ খুব রোমান্টিক মুডে আছো মনে হয়। তোমার মনে আছে জয়? আজ থেকে ঠিক চার বছর তিনমাস আগে তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। সেই অভিশপ্ত দিনটার কথা কি আমি ভুলতে পারি? সামনে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা টিউশন সেরে ঘরে ফিরছিলাম সঙ্গে রবিউল, পল্টু, মিন্টু আরো অনেকে ছিলো। রাত তখন দশটা হবে। বেশ কিছুদিন ধরে পাড়ার ধনী ব্যবসায়ীর একমাত্র পুত্র আরিফ আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছিল। আমি তা অস্বীকার করায়, সেদিন রাস্তার মোড়ে হঠাৎ চার পাঁচজন সঙ্গীকে নিয়ে মদ্যপ যুবক আমাকে হাত ধরে টানতে লাগলো। বললো শালি, তোর বড়ো অহঙ্কার। বড়ো বাড় বেড়েছিস। আজ দেখি তোকে কে বাঁচায়? এক ঝটকার আমার ওড়না খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।


আমার বন্ধুরা কেউ এগিয়ে আসেনি সাহায্যের জন্য। আমি যখন ভাবলাম আজই আমার সর্বস্ব শেষ। ঠিক তখনি দেবদূতের মত তোমার আগমন। বাইকে তুমি ঘরে ফিরছিলে। কোন পরোয়া না করে তুমি একাই ওদের পাঁচজনের সঙ্গে লড়াই করেছিলে আমাকে বাঁচানোর জন্য। জানোয়ারগুলো অনেক বাজে মন্তব্য করেছিলো আমাদের দুজনকে নিয়ে। তবুও তুমি দমে যাওনি। ওরা অবশেষে তোমার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেয়। ততক্ষণে আমার দাদারা আর পাড়ার ছেলেরা এসে পড়েছিলো। তারপর তোমাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আমাকে ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছিল। আমার জন্য তোমার ঐ অবস্থা হওয়ার কারনে। তোমাকে শেষপর্যন্ত রক্ত দিতে হয়েছিলো। বলতে পারো জয় তোমার মতো সুন্দর মন কজন ছেলের আছে যে একটা অচেনা অজানা মেয়ের জন্য প্রাণ দিতে পারে। ভালোবাসার জন্য সুন্দর মন প্রয়োজন, তাই আমি তোমাকে এতো ভালোবাসি।

সেদিনের আলাপের পর ধীরে ধীরে তোমাকেও আমার খুব ভালো লাগে আর পরে ভালোবাসতে শুরু করি। কেন যে ঈশ্বর আমাদের এই ভিন্ন ধর্মে প্রেম দিলেন?  এ যে স্বার্থক হওয়ার নয় রাই।

এত হতাশ হয়ো না জয়, আল্লাহ মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ চাননা। তাই এই অসম প্রেমে তাঁর কোন আপত্তি নেই। আপত্তি তো মানুষ নামের অমানুষগুলোর।  যারা নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে। তুমি তো এখন সফল ইঞ্জিনীয়ার। চলো জয়! আমরা দূরে কোথাও চলে যাই। যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না। সেখানে গিয়ে বিয়ে করে আমরা নতুন জীবন শুরু করি। তারপর একদিন দেখো পিতামাতা ঠিক মেনে নেবে। সন্তান স্নেহ তাদের বাধ্য করবে মানতে।

তুমি ঠিককথা বলেছো রাই, কিন্তু পিতামাতা মেনে নিলেও বর্তমানে লাভ জেহাদের নামে একদল অমানুষ আমাদের বাঁচতে দেবে না রাই! চাকরিটাও যাবে। তাহলে এখন কি করবে জয়? আমি যা করবো তুমি তা পারবে না রাই। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না। আর ওরা আমাদের বাঁচতে দেবে না। আজ এখানে আমি নিজেকে শেষ করবো। রাই জয়ের মুখে হাত চেপে বললো, এমন কথা বলোনা জয়! বাঁচতে হলে একসাথে বাঁচবো। ভুলে যেও না তোমার জন্য আমার এ নবজীবনলাভ। তাই মরতে হলে দুজন একসাথে মরবো।

পরদিন ১৫ই ফেব্রুয়ারি ঝিলের পাশের একটি বড়ো গাছ থেকে পুলিশ দুটো ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে সঙ্গে একটি সুইসাইড নোট। তাতে লেখা-

মা-বাবা,

যখন তোমরা এই চিঠি পাবে তখন আমরা এই পৃথিবী ছেড়ে অনেক অনেক দূরে। যেখান থেকে কেউ ফিরে আসে না। আমাদের এই অসমবর্ণ প্রেম সমাজ মেনে নিলেও বর্তমানে লাভ জেহাদিরা আমাদের বাঁচতে দেবেনা। তাই বাধ্য হয়ে আমরা এই পথ বেছে নিলাম। পারলে আমাদের ক্ষমা করো। আমাদের মত অকালে কত জীবন ঝরে যাচ্ছে। ওরা আমাদের বাঁচতে দিলো না মা!

ইতি-

জয়দেব, আলিয়া

tdn_bangla_ads