আমরা যে কেউ বাঁচবো না গো!

0

সমীরণ খাতুন, টিডিএন বাংলা: আমি মায়ানমারের ছোট্ট এক শিশু। আমার আম্মুুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে অমানুষের দল। আম্মু আমাকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিল। ওরা দলবল নিয়ে ছুটে তেড়ে এল। বললো, ওই দুটো মুসলমানের বাচ্চা। মার ওদের। আম্মু আমাকে নিয়ে ছুটতে লাগলো। আমাকে বললো, “তুমি আমাকে খুব ভালোবাসো ফতেমা?” আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম জি আম্মু। আমার কপালে আম্মু শেষবারের মতো চুমু খেলো। আর একটো ঝোপের আড়ালে আমাকে লুকিয়ে রেখে বললো ওরা যদি আমাকে মেরেও ফেলে তবুও তুমি চুপ করে থাকবে। যতক্ষণ না তোমার আব্বু আসে তুমি এই ঝোপের নীচে গর্তে লুকিয়ে থাকবে।

এইবলে আম্মু ছুটতে লাগলো। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলো না। ওরা আমার আম্মুকে কোপা দিয়ে গলা থেকে দুখন্ড করে দিল। মৃত্যুর আগে মা চিৎকার করে বলেছিলো, “হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে রক্ষা করো।” মায়ের রক্তে ওদের শরীর ভিজে গিয়েছিল। ওরা আনন্দে চিৎকার করতে করতে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর আব্বু এল। মায়ের কাটা মাথাটা হাতে তুলে নিয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগলো। আমি গর্ত থেকে বেরিয়ে আব্বুর গলা জড়িয়ে ধরে বললাম, আব্বু! ইয়াসুয়াকি চানের বাবা আম্মুকে মেরে ফেলেছে।

আব্বু মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “আল্লাহ আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার বাল্যবন্ধু এমন নিষ্ঠুর হতে পারে! ওর জন্য আমি কি না করেছি। ও অসুস্থ হলে আমি নিজের রক্ত দিয়ে ওকে বাঁচিয়েছিলাম। আর সে কিনা আমার স্ত্রীকে….  । ওদের ক্ষমা করোনা প্রভু!” আব্বু মায়ের লাশ নিয়ে আমাকে নিয়ে ঘরে ফিরছিলো। আমার ছোটো খালামনি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে বললো, ওরা আমার নানা-নানী, মামা-মামী এমনকি আমার ছোটো ভাই মুন্নাকেও মেরে ফেলেছে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল একথা শুনে। এই তো কদিন আগে আমি ওকে কোলে নিয়ে চকলেট খাওয়ালাম। আর ও আপা বলে আমাকে কত আদর করছিলো!

ঘরে ফিরে দেখলাম, সারা ঘর আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে। আমার দাদা-দাদীকে ওরা সেই আগুনে হাত পা বেঁধে পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার বই খাতা সব পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার সেই ডল মনিকেও কোথাও খুঁজে পেলাম না। আব্বু মাটি খুঁড়ছিলো মাকে মাটি দেওয়ার জন্য। দূর থেকে আবার সেই চিৎকার শোনা গেল। চারিদিকে ঘরবাড়ি সব জ্বলছে। শুধু আগুন আর আগুন। আব্বু ছুটে এসে আমাকে আর খালামনিকে নিয়ে পুকুরপাড়ে ঝোপের আড়ালে রেখে এলো। মাকে আর আব্বুর কবর দেওয়া হলো না। ওরা এসে আব্বুকেও গলায় ফাঁস দিয়ে গাছে টাঙিয়ে দিলো।

আজ দুদিন হলো আমি আর খালা কিছুই খাইনি। ভয়ে বেরোতেও পারছিনা এখান থেকে। আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে গো। আমার আর কোনোদিন নতুন জামা পরা হবে না। মা আর কখোনো আমাকে সাজিয়ে দেবে না। আমার আর স্কুল যাওয়া হবে না। আব্বু আর কখোনো আমাকে রাজকন্যা বলে আদর করবে না।

তোমরা সকলে তো নিরাপদে আছো। আমার মতো আমার ছোটো ভাই মুন্নার মতো, আমার আব্বু আম্মুর মতো তোমাদেরও তো আপনজনেরা আছে। তোমাদের কত আনন্দ! কিন্তু আমার আর কেউ নেই। আমি এতিম হয়ে গেলাম। তোমরা কি এখোনো চুপ করে থাকবে? আমার মত কত মেয়েদের ওরা মেরে ফেলেছে। তোমাদের কষ্ট হচ্ছেনা একটুও? জানিনা আর কতক্ষণ আমরা এখানে বেঁচে থাকবো! তোমরা তোমাদের আপনজনদের কথা ভেবে আমাদের জন্য এগিয়ে এসো। প্রতিবাদ করো, সাহায্য করো। নইলে আমরা যে কেউ বাঁচবো না গো!