সেনা অভ্যুর্থানের ১ বছর পূর্তি, কেমন যাচ্ছে তুরষ্ক

মুস্তাফা ফয়সাল পারভেজ ঃ ১. বারে বসে মদে ডুবে থাকা ছেলেরা যে সেদিন হিজাবী মহিলা এবং তাকবির শ্লোগানরত মৃত্যুঞ্জয়ীদের সাথে এক হয়ে বিদ্রোহী সেনাদের সাথে লড়াই করবে এটা কেউ ভাবতেও পারেনি। ২০১৪ সালে তুরষ্কে যাওয়ার পর থেকেই সেদেশের ছেলেদের ওপর অনেকটা বিরক্ত চলে এসেছিলো। প্রতিটা কাজে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের পারফর্মেন্স অনেক বেশি দেখে তুর্কি পুরুষদের বিরত্বগাথা ইতিহাস গুলো শুধু গল্পই মনে হতো। মেয়েদের উপস্থিতি ছাড়া তুরষ্কের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রোগ্রামকে জনশূন্য মনে হতো। কিন্তু ১৫ জুলাই ২০১৬ সালে সংগঠিত সেনা ক্যু এর পর এরদোগানের আহবানে জীবন বাজি রেখে সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার বিরত্ব সত্যিই প্রশংসিত ছিলো। তুরষ্কে অতিতে আরো চারটি ক্যু সংগঠিত হয়েছিলো কিন্তু কখনই তার্কিশদের এভাবে রাস্তায় নামতে দেখা যায়নি।

২. ক্যু ব্যর্থ হবার পর এর সাথে জড়িত ফেতুল্লা গুলেনের কয়েক হাজার অনুসারী গ্রেফতার হয় এবং প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন জায়গা হতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার তার অনুসারীরা চাকুরীচ্যুত হয়। রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষমতাসীন দল এবং জাতীয়তাবাদী দলের ঐক্য তৈরি হয়, অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনাকারী পিকেকে এবং তাদের রাজনৈতিক উইং হিসেবে পরিচিত এইচডিপি অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পরে।সেই সাথে পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক আরো শীতল হয়ে তা রাশিয়ার সাথে বৃদ্ধি পায়।

৩. ক্যু পর রাজনৈতিকভাবে এরদোগান অনেকগুলো সুবিধা অর্জন করে যার অন্যতম ছিলো তার গনভোটে ঐতিহাসিক বিজয়। যে বিজয়ের মাধ্যমে তুরষ্কে চলমান সেনাবাহিনী এবং আতার্তুকপন্থি সেক্যুলার বামদের দীর্ঘ ৯০ বছরে তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা সংকোচিত হওয়ার পথ প্রশস্থ হয়। নির্বাচনে বিজয়ের পর এরদোগান তুরষ্কের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অফিস আদালতে মসজিদ/নামাযের জায়গা বাধ্যতামুলক করা, পাঠ্যবই থেকে ডারউইনের থিওরি বাদ দেয়া সহ কয়েকটি ইতিবাচক কাজ করেছে। তবে ২০১৯ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গনভোটে বিপক্ষে অবস্থানকারী প্রধান বিরোধীদল সেকুলার বামপন্থী সিএইচপি, জাতীয়তাবাদী দল থেকে বহি:ষ্কৃত নেত্রী মেরাল আকসেনের, সাদাত পার্টি এবং কুর্দিশদের ডিএইচপির মধ্য এরদোগান বিরোধী সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোট গঠন হতে পারে।

৪. ২০২৩ সালের মধ্য এরদোগান অর্থনৈতিক, সামরিক, শিক্ষাসহ সকল দিক দিয়ে একটি শক্তিশালী তুরষ্ক গঠনে পরিকল্পনাবদ্ধ। একই সাথে এ অঞ্চলে একটা শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের পূনরাত্থানে ইউরোপ, আমেরিকা ও সৌদির মিত্ররা অনেক বেশি চিন্তিত। আরব বসন্তের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পরেছে তুরষ্কের অর্থনীতিতে, সেই সাথে ত্রিশ লাখ সিরিয়ান এবং পনের লাখ আফগান, ইরাকি এবং ইয়েমেনী রিফিউজি নিয়ে টালমাটাল অবস্থায় পরে গেছে তারা। তাই কাতার ইস্যুতে নতুন যুদ্ধে জড়াতে না চাইলেও, মুসলিম বিশ্ব এবং ইসলামপন্থীদের ইস্যুতে বসে থাকতে তারা নারাজ। তাইতো কাতারে সৈন্য প্রেরণের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় চলে আসছে তুরষ্ক। সেই সাথে রাশিয়া থেকে শক্তিশালী অস্ত্র ক্রয় এবং তুরষ্কে পরমানু জ্বালানী কেন্দ্র নির্মানের ইস্যুতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে সদস্য হওয়ার ইস্যুটা অনেকটা অনিশ্চিত বলা যায়।

৫. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরাজয়ে প্রায় সাড়ে ছয়শত বছরের ওসমানী খিলাফতের সমাপ্তি ঘটলে ১৯২৪ সালে আধুনিক তুরষ্কের যাত্রার নামে সেখানে মুসলামনদের ধর্মীয় অধিকারকে কেড়ে নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ভংগুর এ দেশটি বিংশ শতাব্দিতে ইউরোপের রুগ্ন মানুষ হিসেবেই বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়। ২০০২ সালে জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) এরদোগানের হাত দিয়ে নিও ওটোমানিজম এবং লেবারেল ডেমোক্রেসির ছদ্মাবরণে ওসমানী খিলাফতের হারানো ঐতিহ্য এবং শক্তিশালী তুরষ্ক বিনির্মানের প্রত্যায়ে বিশ্বরাজনীতিতে সামনে উঠে আসে।