বাংলাদেশ কি ৫ জানুয়ারির চেয়েও খারাপ নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে?

0

মিয়া হোসেন, টিডিএন বাংলা, বাংলাদেশ :

●সরকার যা চায়, নির্বাচন কমিশন তাই পালন করে                   -বিএনপি
●এই ইসির অধীনে সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয় -জামায়াতে ইসলামী
●ইসি কার স্বার্থে কাজ করছে?-সুজন

নির্বাচন কমিশনের কর্মকান্ড নিয়ে একের পর এক বির্তক সৃষ্টি হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সকল দাবি পূরণ করা হচ্ছে আর বিএনপির কোন দাবিই আমলে নিচ্ছে না এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। আর তাদের অধীনে আয়োজিত নির্বাচনেও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের প্রতি মানুষের আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের চেয়ে খারাপ নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন প্রশ্ন উঠেছে সাংধিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি কার স্বার্থে কাজ করছে? এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন দাবি করছেন কেউ কেউ।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনের কাছে বিএনপি যেসব দাবি তুলছে তা আমলে নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। আর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ যে কোন দাবি তোলার সাথে সাথেই তা বাস্তবায়ন করছে ইসি। বিএনপি গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু ইসি তাৎক্ষণিক সাফ জানিয়ে দিয়েছে সেনা মোতায়েন করা  যাবে না। বিএনপি বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহার করতে নিষেধ করেছে ইসিকে। কিন্তু ইসি ইতোমধ্যে ইভিএম ব্যবহার করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বিএনপি গাজীপুরের এসপিকে প্রত্যাহার করে সেখানে নিরপেক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু ইসি তা আমলে নেয়নি। ফলে সেখানে বিএনপির নেতাকর্মীদের পুলিশী হয়রানি অব্যাহতই রয়েছে। এমন কী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। এদিকে খুলনা সিটিতে বিএনপির নেতাকর্মী ও নির্বাচনী এজেন্টদের গ্রেফতার ও হয়রানি করার অভিযোগ করেছে। এ জন্য খুলনার পুলিশ কমিশনারকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু ইসি তা আমলে নেয়নি। অপরদিকে খুলনার রির্টানিং অফিসারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ অভিযোগ করার সাথে সাথেই সেখানে একজন সিনিয়র নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে ইসি। আওয়ামী লীগের  দাবি করার পরই মন্ত্রী-এমপিদের সিটি নির্বাচনে প্রচারের সুযোগ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অথচ আগের কমিশন বির্তকের মুখে এ সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেছিল। এ ছাড়াও ইসি নিজেদের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের দাবি বাস্তবায়নসহ নানা কারণে আস্থার সংকটে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাদের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে তা এখনই দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে গেছে। তারা জনগণের স্বার্থে কাজ করার পরিবর্তে একটি বিশেষ মহলের স্বার্থে কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের কর্মকান্ডের কারণে দায়িত্বভার গ্রহণের দেড় বছর না হতেই তাদের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা ইসির কাজে শিথিলতা দেখছেন। প্রশ্ন তুলেছেন, কার স্বার্থে কাজ করছেন তারা? তবে এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন নির্বাচন কমিশন। তারা বলছেন, সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যর্থতা নেই। সবকিছু ঠিকঠাকভাবেই চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ করতে পারছে না ইসি। গত বছর ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদীয় আসনের সীমানা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশের কথা থাকলেও তা করেছে ৩০ এপ্রিল। ৩৮টি আসনের সীমানা পরিবর্তন এনে ৩০০ আসনের খসড়া গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে শুনানি শেষে ২৫টির পরিবর্তন আনা হয়। কিন্তু চূড়ান্ত সংসদীয় সীমানা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা খসড়া তালিকাতে থাকলেও পরে তাতে পরিবর্তন আনা হয়নি। এ কারেণে বিএনপি ইসির নতুন সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে।
সীমানা নির্ধারণ চূড়ান্তকরণের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম। তাকে সেদিন প্রশ্ন করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের চাপে সীমানা পুন:নির্ধধারণ করা হয়েছে কি না ? জবাবে বলেন, চাপে যদি বলেন, উনারা যেটা বলেছেন, শুনানিতে যা বলেছেন, ২০১৩ সালের সীমানার পক্ষে। ২০১৩ সালের কিন্তু সীমানায় নেই। বেশিভাগ আসনকে আমরা অখন্ডিত করেছি।
সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের কোনো প্রভাব মোকাবেলা করেছেন কিনা-এ প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার বলেন, সীমানা নির্ধারণ কিন্তু আসলে জনগণের জন্য, জনপ্রতিনিধিদের জন্য এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জন্য। তাদের বক্তব্য ছাড়া সীমানা নির্ধারণ যৌক্তিক নয়। শুনানিতে যে বক্তব্যএসেছে সেগুলো চুল চেরা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আপনি যদি বলেন আওয়ামী লীগের, হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের যে দাবি ছিল, সে দাবিটা গৃহীত হয়েছে শুনানির মাধ্যমে। আবার কোনো দাবি গৃহীত হয় নাই। অন্যদের বক্তব্যকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির মধ্যে পাঁচটি আইন ও নয়টি বিধিমালার সংস্কার চূড়ান্তের কথা থাকলেও এগুলোর কোনোটি এখনও শেষ হয়নি। নির্বাচন সামনে রেখে অংশীজনদের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংলাপ শেষ করতে পারলেও সময়মতো এর সুপারিশ চূড়ান্ত করতে পারেনি ইসি। গত ডিসেম্বরের মধ্যে সংলাপের সুপারিশ চূড়ান্ত করে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোর কথা থাকলেও তা শেষ করতে এপ্রিল পার হয়ে যায়।
বিএনপির আপত্তি সত্ত্বেও এমপিরা যাতে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় প্রচার চালাতে পারে তার পক্ষে মত দিয়েছে ইসি। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে আইন, বিধি-বিধান প্রণয়ন কমিটির এক সভায় এ প্রস্তাব তোলা হয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম নির্বাচন কমিশনে গিয়ে এ সুযোগ চান। তবে ইসির সঙ্গে বৈঠক করে এর বিরোধিতা করেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
নির্বাচন কমিশনে বিএনপির আবেদনের ফল  পেতে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা অভিযোগ করলে তার তদন্ত হতে নির্বাচন শেষ হয়ে যায়। আর আওয়ামী লীগ আবেদন করলে সঙ্গে সঙ্গে ফল পেয়ে যায়। সরকার যা চায়, নির্বাচন কমিশন তা-ই পালন করে।
খুলনা নির্বাচনে পুলিশকে নিরপেক্ষ রাখতে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনের আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করছি না। তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তারা পারবে কি না প্রশাসন এবং পুলিশকে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পক্ষে কাজ করাতে। নিয়ন্ত্রণে রেখে কাজ করতে পারবে কি না, এটা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আমরা। নির্বাচন কমিশন একটা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয় না। আমরা চাই, স্বাধীনভাবে কাজ করার যে ক্ষমতা সংবিধান তাকে দিয়েছে, সাহসিকতার সঙ্গে কমিশন তা প্রয়োগ করুক। এটা আশা করি।
খুলনার রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যক্রম পর্যব্ক্ষেণে ইসি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার সমালোচনা করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তার ওপর কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে নির্বাচন প্রভাবিত হবে। তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যক্রম তদারকি করবেন, এতে করে রিটার্নিং কর্মকর্তা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না।
ইসি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কর্মকান্ড সম্পর্কে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর ও সাবেক এমপি মাওলানা আ.ন.ম. শামসুল ইসলাম বলেন, গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। এতে প্রমাণিত হয়েছে এই সরকার এবং এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়।
ইসির বিতর্কিত কর্মকান্ডের বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্য হলো, নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা তো এখন দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তারা কার স্বার্থে কাজ করছে; তারা জনস্বার্থে কাজ করছে কি না- এনিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ আছে। ঢাকা সিটির নির্বাচন নিয়ে যে নাটক হলো আরেকটি নাটক মঞ্চস্থ হলো গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নিয়ে। এগুলো তো জনস্বার্থের পরিপন্থী। এর মাধ্যমে ভোটারদের ভোটাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে, সংবিধান লঙ্ঘন হচ্ছে। জনগণ দারুণভাবে সংক্ষুব্ধ।
নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ইসি এখনও সবার আস্থায় আছে। কেউ যদি দাবি করে আমরা আস্থা হারাচ্ছি, সেটা তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য বলে তিনি উল্লেখ যোগ করেন।
খুলনার নির্বাচনে ইসি নিরপেক্ষতা দেখাতে পারেনি
গাজীপুর সিটি করপোরেশনে বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানি করা হয়েছে। সেখানকার পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহারের দাবি জানালেও তা বাস্তবায়ন করেনি ইসি। অবশেষে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর ২৬ জুন নির্বাচনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছে ইসি। কিন্তু এদিকে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসি নিরপেক্ষতা দেখাতে না পারার অভিযোগ উঠেছে। খুলনা সিটি কর্পোরেশন-কেসিসি নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর অভিযোগ, মেয়র প্রার্থী হিসেবে তিনি নিজেও শংকামুক্ত নন। সাতদিন ধরে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। শনিবার রাতেও হাজার হাজার কর্মীর বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। নতুন করে আরও ১১ জনসহ দুশতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নির্বাচনী এজেন্ট এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীল সিনিয়র নেতাদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে। এতে গোটা নগরীতে আতঙ্ক ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরপরও নগরবাসী ধানের শীষে ভোট প্রদানের মাধ্যমে আওয়ামী দুঃশাসনের সাড়ে ৯ বছরের জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু সরকার একটি ভোট ডাকাতির নির্বাচনের আয়োজনে সবকিছুই ভেস্তে যেতে বসেছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের অতি উৎসাহী ভূমিকা এবং নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা ভোট ডাকাতির নির্বাচনের আয়োজনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে বলে তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করেন।