আমেরিকাকে সরিয়ে বিশ্বে পরাশক্তির স্থান নিতে চাইছে চীন

0

টিডিএন বাংলা ডেস্ক: বিশ্বব্যাপী চীনের প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তির স্থান থেকে সরিয়ে দেয়া ও সে স্থানে নিজেকে আসীন করা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও তার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ শুরু করেছে। চীন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিশ্বচ্যালেঞ্জ।
শুক্রবার অ্যাসপেন নিরাপত্তা ফোরামে চীনের উত্থান বিষয়ে এক অধিবেশনে সিআইএর পূর্ব এশিয়া মিশন সেন্টারের উপ সহকারী পরিচালক মাইকেল কলিন্সের বক্তব্যে এসব কথা উঠে এসেছে। তিনি বলেন, চীনের সরকারী ভাষ্য ও শি যা প্রকাশ করছেন তার ব্যাখ্যা এটাই যে তারা আসলে আমাদের বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যে স্নায়ুযুদ্ধ আমরা দেখেছি, এ স্নায়ুযুদ্ধ সে রকম নয়, কিন্তু তা স্নায়ুযুদ্ধের সংজ্ঞায়ই পড়ে। প্রতিদ্বন্দ্বীতার অবস্থানকে খর্ব করতে সংঘাতের পথ না নিয়ে বৈধ ও অবৈধ, সরকারী ও বেসরকারী , অর্থনৈতিক ও সামরিক সকল ক্ষমতা এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। কলিন্স বলেন, নীতি স্বার্থের দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নয়, গোটা বিশ্বের প্রতিটি দেশকে নিজেদের পাশে আনা তাদের প্রথম ও সার্বিক লক্ষ্য । কারণ, চীনারা ক্রমবর্ধমান ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরোধের পথে অগ্রসর হচ্ছে এবং তারা একটি পদ্ধতিগত সংঘাতের দিকে যেতে চাইছে।
তিনি বলেন, শি’র লেখা থেকে স্পষ্ট যে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শি’র চিন্তা ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্প্রতি চীনের সংবিধানে স্থান লাভ করেছে। তিনি বলেন, এটা আমাদের সাথে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে এবং তা গুরুত্বের দিক দিয়ে রাশিয়া যে হুমকি সৃষ্টি করতে পারে তার চেয়েও মারাত্মক।
ফোরামের তৃতীয় দিনের অধিবেশনে কলিন্সের বক্তব্যে অন্য দু’জন সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তা এফবিআই’র পরিচালক ক্রিস্টোফার রে ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক ড্যান কোটসের মতই প্রতিধ্বনিত হয়েছে যারা উভয়েই চীনকে আজ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক বিপদ বলে উল্লেখ করেন।
বুধবার রে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, বহু দিক দিয়েই চীন আমাদের দেশের জন্য ব্যাপকতর, ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হুমকি। সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় তারা এটা করছে। তারা প্রচলিত গোয়েন্দাগিরির মত অর্থনৈতিক গোয়েন্দাগিরি, প্রচলিত গুপ্তচরগিরির মত অপ্রচলিত গুপ্তচরগিরি, মানুষ ব্যবহারের পাশাপাশি সাইবার পন্থাও ব্যবহার করছে।
কোটস বৃহস্পতিবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন যে চীন প্রকৃত প্রতিপক্ষ না আইন সম্মত প্রতিযোগী। তিনি ব্যবসায়িক গোপনীয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা চুরির চীনের রাষ্ট্রীয় চেষ্টার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আমি মনে করি , এ জায়গা থেকেই আমাদের ভাবতে হবে।
গোয়েন্দা বিভাগের প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি মার্সেল লেটার বলেন, প্রভাব বিস্তার কর্মকান্ড হচ্ছে চীনের একমাত্র হাতিয়ার যা চীন সম্প্রসারণ ও বৃদ্ধির বৃহত্তর প্রষ্টোর অংশ হিসেবে কাজে লাগায়। এ কর্মকান্ডে চীনের ক্ষমতাসীন কম্যুনিস্ট পার্টি এ অঞ্চলের দেশগুলো ও তার বাইরে তার উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা ও সংহত করতে রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক কৌশল ব্যবহার করে।
তিনি বলেন, চীনের সামরিক বাজেট বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম, বিশ্বের বৃহত্তম স্থল বাহিনী তার, তার বিমান বাহিনী বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ, ৬০টিরও বেশি সাবমেরিনসহ চীনের রয়েছে ৩শ’ যুদ্ধ জাহাজের এক নৌবাহিনী। এর সবকিছুর ক্ষেত্রেই আধুনিকায়ন ও উন্নতকরণের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, গত এক বা দু’দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখেই চীন তা করছে।
চীন মে মাসে দেশে তৈরি তার ৫০ হাজার টনের বিমানবাহী জাহাজের উদ্বোধন করেছে। ১২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট শি’র বক্তৃতার পর বিমানবাহী জাহাজটি প্রথমবারের মত পরীক্ষামূলক সমুদ্র যাত্রা করে। বক্তৃতায় শি চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির ব্যানারে বিশ্বমানের নৌবাহিনী’ নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। চীনের নয়া বিমানবাহী জাহাজ এ অঞ্চলে দেশটির সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ বিমানবাহী জাহাজ পুরনো ধরনের এবং আমেরিকার বিমানবাহী জাহাজের মান থেকে অনেক পেছনে পড়ে আছে।
একই সময়ে চীন ভারত মহাসাগরে কিছু সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করেছে যা জিবুতি পর্যন্ত বিস্তৃত। চীন গত বছর সেখানে দু’টি যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করেছে যেগুলোর সেনাসংখ্যা অজ্ঞাত। এটি হচ্ছে বহির্বিশ্বে চীনের প্রথম সামরিক ঘাঁটি।
পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন সুসান থর্নটন। তিনি দক্ষিণ চীন সাগরে অচলাবস্থার উল্লেখ করে বলেন, এ এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বিতর্কিত অঞ্চলের উপর দাবি জানানো দেশগুলোর সাথে আলোচনায় বসতে চীনের উপর চাপ সৃষ্টি করবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন সরকার দক্ষিণ চীন সাগরে কয়েকটি কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ করেছে এবং রাডার স্থাপনা ও বিমান ঘাঁটি নির্মাণসহ সামরিক স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করেছে। বেইজিং জোর দিয়ে বলে যে দক্ষিণ চীন সাগরের অধিকাংশই তার সার্বভৌম ভূখন্ড। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশই চীনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
তিনি প্রশ্ন করেন যে চীনকে কী আইন মানতে বাধ্য করা হবে? তারা কি আসিয়ানের সাথে আলোচনা করবে নাকি তারা একের পর এক সবাইকে তাবে আনার চেষ্টা করবে ও এপথে বেশি সুবিধা আদায় করবে?
থর্নটন প্রথমে সহকারী মন্ত্রী হিসেবে ট্রাম্পের পছন্দ ছিলেন। তিনি আর ট্রাম্পের পছন্দ নন বলে তকে জানানো হলে জুনে তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি শুক্রবার বকস্তৃতার সময় জানান যে এ প্যানেল আলোচনার শেষেই তার চাকরির মেয়াদ শেষ হবে।
ট্রাম্পের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে ডিসেম্বরে যে সব পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল তার মধ্যে ছিল প্রযুক্তি ও সাইবার ফ্রন্টে চীনকে মোকাবেলা। সে সাথে বিশ্বব্যাপী অংশীদারদের সাথে চীনের বিরুদ্ধে কাজ করা এবং বেইজিংকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানদন্ড মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করাও ছিল।
৯/১১’র পর বিশ্বের মনোযোগের অধিকাংশ সন্ত্রাসবাদ দমনে নিবদ্ধ হয় , কিন্তু চীন এ বছরগুলোতে নিজের পথে এগিয়ে যায়। থর্নটন ও কলিন্স উভয়েই উল্লেখ করেন যে গত এক দশকে চীন দ্রুত সম্প্রসারণ ও প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে। থর্নটন বলেন, চীনারা সুযোগের সদ্ব্যবহারে দড়। সাম্প্রতিক অতীতে মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের গুরুত্ব আরোপের প্রেক্ষিতে তারা এর সুযোগ নিয়েছে । তিনি বলেন, আমাদের কূটনৈতিক শক্তি তাদের কূটনৈতিক শক্তির চেয়ে শক্তিশালী। আমাদের অংশীদাররা জানে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াই , আমরা তাদের উপর আমাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেই না, আমরা তাদের সাথে কাজ করি।