চলে গেলেন বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ ফুয়াদ সেজগীন

0

টিডিএন বাংলা ডেস্ক : চলে গেলেন তুরস্কের বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ ফুয়াত/ফুয়াদ সেজগীন। গত শনিবার (৩০ জুন) তুরস্কের একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। প্রেসিডেন্ট এরদোগানসহ অন্যান্য তুর্কি নেতৃবৃন্দ এবং মুসলিম বিশ্বের স্কলাররা তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।

মুসলিম গবেষক স্কলারদের কাছে সেজগীন একটি অতি আপন, অতি পরিচিত নাম। ১৮শ শতক থেকে প্রাচ্যবিদরা বলতে গেলে এককভাবে মৌলিক ইসলামী গবেষণা এবং তাহকীকুত তুরাছের ময়দানে ছড়ি ঘুরিয়েছিল। এটা সালেহ মুনাজ্জিদসহ অনেকেই স্বীকার করেছেন। যদিও উস্তাদ আব্দুস সালাম হারুন এবং আল্লামা আহমাদ শাকের সেটা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তবে, তুরাছে ইসলামীকে ইতিহাসের হারানো গলীগুলো থেকে তুলে এনে পূনর্জীবন দান করার ক্ষেত্রে প্রাচ্যবিদদের অবদানকে স্বীকার করতে হবে। তুরাস গবেষণার যে সর্বোৎকৃষ্ট পদ্ধতি তারা প্রয়োগ করেছিলেন তার সাথে তৎকালীন বা তার আগের মুসলিম গবেষকরা পরিচিত ছিলনা। আল আগানী, সুবহুল আশার মতো বহু মূল্যবান ইসলামী তুরাছ তাদের হাত ধরেই আলোর মুখ দেখেছে। গুটিকয়েক যে মুসলিম এবং আরব গবেষক প্রাচ্যবিদদের সে গৌরবে ভাগ বসানোর হিম্মৎ করেছিলেন, তাদের মধ্যে আরবে ফুয়াদ আব্দুল বাকী, লন্ডনে আলবার্ট হোরানী, আমেরিকায় ফিলিফ হিট্টি, ফ্রান্সে মুহাম্মাদ আরাকুন, এবং আলী মুরাদ, এবং জার্মানীতে ফুয়াদ সেজগীনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মুসলমানদের পতন বা পিছিয়ে পড়ার মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে আমরা সভ্যতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছি। অথচ আমাদের পূর্বসূরীরা এক সময় তাদেরকে সভ্যতার চালকের আসনে বসাতে সক্ষম হয়েছিল। ৮ম শতক থেকে নিয়ে ১৫শ শতক পর্যন্ত সময়ের জ্ঞান বিজ্ঞান এবং সভ্যতার ইতিহাস মুসলমানদের হাত ধরেই রচিত হয়েছিল। কিন্তু তার পরে সেই ধারা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। পাশ্চাত্যের অতি দ্রুত গতিতে উন্নতি লাভ করা বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্যের সাথে পাল্লা দিতে পারেনি। ফলে গোটা মুসলিম বিশ্বের উপর নেমে আসে কলোনিয়াল শাসনের মতো বিভিষিকাময় এক অধ্যায়। উসমানী সালতানাতের পতনেরও এটাই বড় কারণ। তারচেয়েও বড় সমস্যা হয়েছে, পরবর্তি মুসলিম প্রজম্ম তাদের পূর্বসূরীদের রেখে যাওয়া জ্ঞান ভান্ডারের ব্যাপারে একেবারেই বেখবর হয়ে গেল। ফলে পাশ্চাত্যের চোখ ধাঁধানো সভ্যতার সামনে নিজেদেরকে অসহায় মনে করা শুরু করলো। এর দ্বারা সাংস্কৃতিক গোলামীর দরজা খুলে গেল। এই আত্মঘাতী মানসিক দৈন্যতাকে রোধ করার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে উত্তরাধুনিক মুসলিম প্রজন্মের সামনে বিশ্বসভ্যতা গঠনের পেছনে মুসসলিম জাতির অসাসান্য অবদানগুলোকে তুলে ধরা। এই কাজটিই করতে চেয়েছিলেন ফুয়াদ সেজগীন।

ইসলামী তুরাছের বিব্লিউগ্র্যাফী বলতে তখন একটাই ছিল। জার্মান প্রাচ্যবিদ কার্ল ব্রুক্যালমেনের “তারীখুল আদবিল আরবী”। কিন্তু ব্রুক্যালমেন তাঁর অনবদ্য এই গ্রন্থে তুরাসে আরবীর খুব কিয়দাংশই তুলে ধরতে পেরেছিলেন। তার ইসতিদরাক আসা খুব দরকার ছিল। সেজগীন ১২ খন্ডে “তারীখুত তুরাছিল আরবী” রচনা করে সেই মহান কাজটি সম্পাদন করেছিলেন। ১৯৪৭ সাল থেকে তিনি কাজটি শুরু করেছিলেন। দৈনিক ১৭ ঘন্টাও কাজ করেছিলেন বলে শ্রুতি আছে। আরব এং পাশ্চাত্যের হাজার হাজার লাইব্রেরীতে ঘুরে ঘুরে তিনি মুসলিম লেখকদের হাজারো মূলব্যান পান্ডুলিপি সংগ্রহ করেছিলেন। এটি এমন এক মূল্যবান গ্রন্থ, দুনিয়ার কোন মুসলিম গবেষক এর সহযোগীতা না নিয়ে সামনে চলতে পারবেন না। এই অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে সৌদি সরকার তাঁকে ফয়সাল পুরস্কারে ভূষিত করে।