রোহিঙ্গা গণহত্যায় মায়ানমারের সাংবাদিকরাও সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিয়েছে!

0

 টিডিএন বাংলা ডেস্ক: মায়ানমারের সামরিক জান্তার অন্ধকারতম দিনগুলোতে সাংবাদিক অং হ্লা টুন ছিলেন একজন নায়ক। ২০০৭ সালে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নেতৃত্বে বিদ্রোহের ডাক আসে। ওই আন্দোলন সেফরন বিপ্লব হিসেবে পরিচিত। সে সময় মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুন থেকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের জন্য প্রতিবেদন তৈরি করেন তিনি। সেনাসদস্যরা বিক্ষোভকারী এবং একজন জাপানি ফটোগ্রাফারকে গুলী করে হত্যা করার পর উদ্ভূত চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেই তিনি প্রতিবেদন তৈরি করে গেছেন। স্বীকৃতিস্বরূপ নিজ প্রতিষ্ঠানের বর্ষসেরা সাংবাদিকের পুরস্কার লাভ করেন অং হ্লা টুন। দুনিয়াজুড়ে সামরিক বাহিনীর এই নৃশংসতার খবর প্রচার হলে তৎকালীন জান্তা সরকার বিষয়টি অস্বীকার করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত খবরকে ‘গগনচুম্বি মিথ্যাচার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

সেফরন বিদ্রোহের সময় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী ভিক্ষুদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী উসকানি তৈরির মাধ্যম হিসেবে সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা মুসলিমদের দেশটির সাধারণ শত্রু হিসেবে চিত্রিত করে। এর মধ্য দিয়ে তারা ভিক্ষুদের মন জয়ের চেষ্টা করে। সেফরন বিপ্লবের এক দশকেরও বেশি সময় পর নতুন করে আবারও দুনিয়াজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এবারের সংকটের কেন্দ্রে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর জাতিগত জাতিগত নিধনযজ্ঞ।

Advertisement
head_ads

পশ্চিম রাখাইনে সেনাবাহিনীর হাতে খুন, ধর্ষণের মতো বিভৎসার মুখোমুখি হন রোহিঙ্গারা। তবে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এসব ঘটনাকে স্বাধীনতাকামী রোহিঙ্গা সংগঠন আরসা’র হামলার প্রতিক্রিয়ায় ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। জাতিসংঘের আশঙ্কা, প্রকৃতপক্ষে বার্মিজ সেনাবাহিনী সেখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে। বেসরকারি সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স-এর হিসাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরুর প্রথম মাসেই অন্তত ছয় হাজার ৭০০ রোহিঙ্গাকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণের মতো বিভৎসতার ভয়াবহতায় পূর্বপুরুষের ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করে দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যায় প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। এক্ষেত্রেও ১০ বছর আগের কৌশলই নেয় মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। তারা সাংবাদিকদের ‘মিথ্যাচারের’ দায়ে অভিযুক্ত করে এবং বার্তা সংস্থা এপি’র একজন প্রতিবেদককে ‘খারাপ আত্মা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। তবে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বা সরকারি প্রচারপত্রের রোষানলের বাইরে আছেন ২০০৭ সালের ঘটনায় নায়কে পরিণত হওয়া সাংবাদিক অং হ্লা টুন। এর কারণ হচ্ছে তিনি এখনই তাদেরই একজন।

২০১৮ সালে মায়ানমারের উপ তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান অং হ্লা টুন। এর মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমের তত্ত্বাবধানকারী মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের স্বপক্ষে একটা যুক্তি দেখিয়েছেন অং হ্লা টুন। তার বিশ্বাস, রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের সুনামের যে ক্ষতি হয়েছে তা থেকে তিনি উত্তরণ ঘটাতে পারবেন। এমনকি তিনি মনে করেন, স্থানীয় সব সংবাদমাধ্যমগুলোরও একই দায়িত্ব রয়েছে।

অং হ্লা টুন কলাম্বিয়া জার্নালিস্টস রিভিউ’কে বলেন, ‘মিয়ানমারের সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবের কারণে আমাদের ভাবমূর্তি খুবই খারাপ হয়ে গেছে।’

নতুন তথ্য উপমন্ত্রী অং হ্লা টুন ছিলেন নিজের ক্যারিয়ারে জান্তা সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো খ্যাতনামা সংবাদকর্মীদের একজন। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি এখন ভিন্ন দায়িত্বে এসে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সেনাবাহিনীর অবস্থানের প্রতিধ্বনি করছেন।

মায়ানমারের নেতাদের জন্য বড় ধরনের সংকটে সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এটাই প্রথম নয়। কিন্তু সম্ভবত এবারই প্রথমবারের মতো দেশটির সিনিয়র সাংবাদিকরা সরকারের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সরকারের সঙ্গে সঙ্গে তারাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সমালোচনায় মুখর হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রতিবেদন তৈরিতে মিয়ানমার এরইমধ্যে বিপজ্জনক দেশে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালের অক্টোবরে দেশটিতে দুই বিদেশি সাংবাদিককে আটক করা হয়। গ্রেফতার করা হয় তাদের চালককে।  মিয়ানমারে তারা যেখানে উঠেছিলেন পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে তাদের কম্পিউটার ও মেমরি স্টিক জব্দ করে পুলিশ। আটককৃত দুই সাংবাদিক হচ্ছেন সিঙ্গাপুরের লাউ হন মেন এবং মালয়েশিয়ার মক চৌ লিন। তারা তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টার্কিশ রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশন কর্পোরেশনের (টিআরটি) সংবাদকর্মী। এর দুই মাসের মাথায় রোহিঙ্গাদের নিয়ে সংবাদ সংগ্রহের জেরে গত ১২ ডিসেম্বর মিয়ানমারে গ্রেফতার হন যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের দুই সাংবাদিক কো ওয়া লোন এবং কায়াও সোয়ে ও। রাখাইনের একটি গণকবরে পুঁতে ফেলা ১০ রোহিঙ্গার হত্যাকা- নিয়ে তথ্য সংগ্রহের দায়ে দাফতরিক গোপনীয়তা আইনে তাদের গ্রেফতার করা হয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা স্বার্থের ক্ষতি সাধনের দায়ে তাদের ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদ- হতে পারে। মিয়ানমারের তথ্য উপমন্ত্রী সাংবাদিক অং হ্লা টুন নিজেও একজন রাখাইন।

২০১২ সাল পর্যন্ত রয়টার্সের হয়ে কাজ করা অং হ্লা টুন এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর ব্যাপক মাত্রায় ক্ষুব্ধ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞের চিত্র উঠে আসায়, জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জীবনের করুণ আর্তি উঠে আসায় তিনি উত্তেজিত। তার এমন পরিবর্তন বিব্রত করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে কাজ করা তার এক সময়ের সহকর্মীদের।

২০১৪-২০১৫ সালে মিয়ানমারে রয়টার্সের ব্যুরো চিফ ছিলেন পল মুনি। পরে তিনি ওই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন। ২০১৪ সালে মান্দালায়ে দাঙ্গার সময় একটি মুসলিম মালিকানাধীন চায়ের দোকানে হামলা চালায় উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা। সে সময় অং হ্লা টুন’কে (বর্তমান তথ্য উপমন্ত্রী) বিষয়টি স্থানীয় পুলিশ কর্তৃক নিশ্চিত করতে বলেছিলেন পল মুনি। তবে অং হ্লা টুন এর বদলে রাজধানী নেপিদো’র পুলিশ কর্মকর্তাদের ফোন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যারা সেখানে কোনও সমস্যার খবর অস্বীকার করে। এরপর তিনি মান্দালয় পুলিশের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুবাদে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো তিনি এ বলে নিজেকে জাহির করেন যে, এই বিজ্ঞপ্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে নেপিদো’র পুলিশ সূত্র তাকে আগেই নিশ্চিত করেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, পুলিশ রকেট নিক্ষেপকারী দাঙ্গাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। কলম্বিয়া জার্নালিজম রিভিউ

head_ads