হোমে নির্যাতন, উদ্বেগ প্রকাশ সুপ্রিমকোর্টের

0

টিডিএন বাংলা ডেস্ক: স্কুলে পেটে ব্যথা হচ্ছিল। বাড়ি যেতে চাইছিল মেয়েটি। অন্য একজন অভিভাবকের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল ওয়ার্ডেন। ফেরার পথে সেই অভিভাবকই ওই ছাত্রীকে তুলে দেয় তার এক আত্মীয়ের হাতে। তারপরই শুরু হয় নির্যাতন। ঘটনাটি উত্তর প্রদেশের। দেশের বৃহত্তম রাজ্যে লাগাতার ধর্ষণ, যৌন হেনস্তার ঘটনায় আরও একটি সংযোজন। বৃহস্পতিবারের এই ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে শনিবার। দেবেন্দ্র নামের অভিযুক্ত যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিহার এবং উত্তর প্রদেশে পরপর সরকারি হোমে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় শনিবার ফের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। ‘কীভাবে এসব বন্ধ হবে? কবে বন্ধ হবে?’, প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপতিরা। সরকারের উপর কার্যত বিরক্ত হয়েই তাঁরা বলেছেন, ‘আমরা সব কিছু করে ফেলতে পারব না, যদি না কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিই আদালতে উপস্থিত হন।’ শীর্ষ আদালতের এই মন্তব্যের পর বাধ্য হয়েই সরকারের পক্ষে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এবং নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রকের তরফে প্রতিনিধিত্ব করা হয় এদিন এজলাসে।

বাহরাইচের স্কুলে পড়াশোনা করতে আসা উত্তর প্রদেশের এক গ্রামের বাসিন্দা ওই নাবালিকা রক্তাক্ত অবস্থাতেই কোনোরকমে বাড়ি পৌঁছেছিল বৃহস্পতিবার। বাবা-মা’কে সমস্ত কথা জানানোর পরই তাঁরা অভিযোগ দায়ের করেন স্থানীয় থানায়। ওইদিন রাতেই গ্রেপ্তার হয় অভিযুক্ত যুবক। কিন্তু যে মহিলা ওই ছাত্রীকে দেবেন্দ্রর হাতে তুলে দিয়েছিল তার কোনও খোঁজ মেলেনি। বছর ১৩’র ওই নাবালিকা সেই মহিলার ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলতেও পারেনি। সংবাদ সংস্থা পি টি আই-র খবর অনুযায়ী, পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ওই মহিলা তার মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে স্কুলে গিয়েছিল। সেইসময় নির্যাতিতা ছাত্রীটি পেটের ব্যথায় কাতর হয়ে বাড়ি যেতে চায়। তারপরই ওয়ার্ডেন সিদ্ধান্ত নেন, ওই মহিলার সঙ্গেই বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে ছাত্রীটিকে। কিন্তু তিনি যাচাই করে নেননি একজন ছাত্রীর দায়িত্ব যাকে দিচ্ছেন, তার সঠিক পরিচয় কী। নির্দ্বিধায় ওই ছাত্রীকে ছেড়ে দেন তিনি, এমনই অভিযোগ। ওই ওয়ার্ডেন, রশ্মি শ্রীবাস্তবকে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়েছে। আরও দুজন আধিকারিকও কর্তব্যে গাফিলতির জেরে বরখাস্ত হয়েছে। রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষামন্ত্রী এক বিবৃতিতে এদিন বলেছেন, জরুরি ভিত্তিতেও কোনও পড়ুয়াকে বাড়ি পাঠাতে হলে, ওয়ার্ডেনেরই উচিত তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি তাঁর মত, আধার কার্ড নিয়ে বাবা-মায়েরা আসলে, তবেই ছেলেমেয়েদের তাদের সঙ্গে পাঠানো হবে। কোন জায়গায় ওই নাবালিকাকে অভিযুক্তের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, তা জানা যায়নি। ঘটনাটি পূর্ব পরিকল্পিত বলেই প্রাথমিক তদন্তের পর অনুমান পুলিশের।

এদিকে, দেওরিয়ার পর উত্তর প্রদেশের প্রতাপগড়ে দুটি হোম থেকে ২৬জন মহিলার নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে। দুটি হোমের একটি হোম পরিচালনা করেন বি জে পি নেত্রী। হোমের খাতায় নাম থাকলেও সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে একাধিকেরই খোঁজ মেলেনি। বিহারের মুজফ্‌ফরপুরের হোমে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় কয়েকদিন আগেই ক্ষোভ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। শনিবার ফের বিহার এবং উত্তর প্রদেশ— দুই রাজ্যেই নারী ও শিশুদের সঙ্গে যেসব পাশবিক ঘটনা ঘটে চলেছে তা নিয়ে উদ্বেগ দেখায় শীর্ষ আদালত। বিচারপতি মদন বি লোকুর, এস আব্দুল নাজির এবং দীপক গুপ্তার বেঞ্চ সরাসরি প্রশাসনের উদ্দেশে প্রশ্ন করেছে, ‘এসব কী হচ্ছে?’ প্রতাপগড়ের হোম থেকে মহিলাদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন তাঁরা। আদালত সরকারের প্রতিনিধিদের এজলাসে উপস্থিত হতে বলার পর দুটি মন্ত্রকের আইনজীবীরা যান। কিন্তু বিচারপতিরা বেশ ক্ষোভের সঙ্গেই বলেছেন, ‘আলাদা-আলাদা মন্ত্রকের আইনজীবীদের আসার কী প্রয়োজন? পৃথক মন্ত্রক থাকলেই যে আইনজীবীদের আলাদা আলাদা করে আসতে হবে এমন কোনও মানে নেই। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট বলেছে, শুধুমাত্র কেন্দ্রের নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রকের প্রতিনিধিরা থাকলেই হবে।

আদালত কেন্দ্রকে নির্দেশ দিয়েছিল, দেশে যত ‘চাইল্ড কেয়ার ইনস্টিটিউশন’ (সি সি আই) রয়েছে, সেগুলির একটি সোশ‌্যাল অডিট করতে হবে। শিশুদের অধিকার রক্ষায় গঠিত জাতীয় কমিশনের অধীনেই এই অডিট হবে বলেও জানিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু সেই অডিটের কোনও সুস্পষ্ট রিপোর্ট পায়নি সুপ্রিম কোর্ট। প্রতাপগড় এবং দেওরিয়ায় এই অডিট আদৌ কমিশন করেছে কি না সেই প্রশ্ন এদিন তোলেন বিচারপতিরা। চাপের মুখে কমিশনের আইনজীবী এদিন শীর্ষ আদালতে বলেন, ‘দ্রুত হোমগুলির অডিট করা হচ্ছে। তিন হাজার হোমের অডিট ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে। এ প্রসঙ্গেও আদালতের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে। কমিশনের কর্তাদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন বিচারপতিরা, ‘কেন এখনই এত দ্রুত করা হচ্ছে এই অডিট ? রাজ্যে রাজ্যে কী হচ্ছে সেটা জানেন না ? যদি এই তিন হাজার হোমে ধর্ষণ, যৌন হেনস্তা ঘটে তাকে বা ঘটে তার দায়িত্ব আপনারা নেবেন?’ আদালতের মত, একাধিক সোশ‌্যাল অডিট না হলেও চলবে, অডিটের গুণমানই আসল বিষয়।’ আগামী ২১শে আগস্ট ফের এই মামলার শুনানির দিন ধার্য করেছে সুপ্রিম কোর্ট।