টিডিএন বাংলা ডেস্ক : আসামে ‘অভিবাসন’ সমস্যা অনেক দিনের। কিন্তু গত ৩০ জুলাই এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ হওয়ার পর হালনাগাদ সমস্যাটিকে সম্ভবত গুরুতর করে তুলেছে। বলা চলে, রাজ্যটিতে একটি টাইম বম্ব স্থাপন করা হয়েছে। যে চুক্তির ভিত্তিতে এই এনআরসি, সেই ‘আসাম অ্যাকর্ড’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। ৩৩ বছর পর তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আরও এক সারি নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটানো হয়েছে।

আসাম অ্যাকর্ড অনুসারে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগের ভোটার তালিকায় যাদের বা যাদের পূর্বপুরুষের নাম ছিল, তারাই কেবল হালনাগাদকৃত নাগরিকপঞ্জি তালিকার অংশ হতে পারবে। প্রশ্ন হচ্ছে – যারা পারবেনা, তাদের কি হবে? এখন পর্যন্ত কেউ স্পষ্ট নয় যে, তাদের ক্ষেত্রে কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা আপিল করতে পারে, তারা সম্পত্তি ও ভোটাধিকার হারাতে পারে, তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে অথবা তাদের জন্য আর একটি প্রকল্প গৃহীত হতে পারে।

কিন্তু কোনও কিছুই এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। বলা হয়ে থাকে, অতীতে কংগ্রেস অবৈধ অভিবাসীদের আশ্রয় দিত। কারণ তারা সাধারণত কংগ্রেসকে ভোট দিত। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, ১৯৮৫ সালে কংগ্রেসই চুক্তিটি করেছিল, যার কারণে অভিবাসীরা এখন বিপদে পড়েছে। এটা ঠিক যে, কংগ্রেস কখনোই এনআরসি বাস্তবায়ন করতে চায়নি। অল্পতেই বিক্ষোভ ফেঁদে বসা ভারতের মতো দেশে এধরণের চুক্তি করে ফেলে রাখা অনেক সময়ই কাজে দেয়। বস্তুত এনআরসি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। গত ৩০ জুলাই এনআরসি খসড়ায় ৪০ লক্ষ বর্তমান অধিবাসী বাদ পড়েছে। আপত্তি ও আপিল জানানোর সময় দিয়ে এ বছর ডিসেম্বরে চুড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হবে, আশা করা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুততার সঙ্গে খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ এর সঙ্গে বর্তমানে আসামে ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির এজেন্ডা মিলে গেছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এর মাধ্যমে আসামের লক্ষ লক্ষ বর্তমান অধিবাসীকে ‘অবৈধ’ অভিবাসী কিংবা ‘অভারতীয়’ তকমা লাগানো হয়ে গেছে। জল্পনা করা যায়, কেউ একজন একটি এলাকায় ৪০ বছর বসবাস করছে, পরিবার গড়েছে এবং তাকে এখন বলা হচ্ছে – তার কিছু নেই। ধরা যাক, কেউ একজন ১৯৭৮ সালে আসামে বসবাস শুরু করেছে এবং তাঁর পূর্বপুরুষের ভোটার তালিকায় থাকার প্রমাণ নেই। কেবল এই কারণে তাঁকে ‘অবৈধ’ বলা হবে? টাউট ও অসাধু কর্মকর্তাদের সুবিধাটাও কল্পনা করা যায়। তারা যে কারও কাছে একজন ‘পরদাদা’ বেঁচে দিতে পারে চড়া দামে। কল্পনা করা যাক এর সামাজিক সঙ্কট সম্পর্কেও। কেউ যখন ‘অবৈধ’ ঘোষিত হচ্ছেন, সামাজিক ভাবে তাকে ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হতে হবে না? আসলে জাতীয়তাবাদের নামে, সার্বভৌমত্বের নামে এবং অসমীয়া জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার নামে আমরা এসব কি করছি? এনআরসি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এতটা কঠিন ও বিভক্তিকর হবে যে, এর মাধ্যমে আরও অনেক বেশি সমস্যা তৈরি হবে। এসব সমস্যার সমাধান হবে আরও কঠিন।

১৯৮৫ সালে যখন চুক্তিটি হয়, তখন মাত্র ১৪ বছর আগের ‘কাট অফ’ তারিখ ঠিক করা হয়েছিল। এখন যখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তখন ‘কাট অফ’ তারিখ হবে ৪৭ বছর। ৪৭ বছর আগের তারিখ ধরে একটি তালিকা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি আমরা। আমরা কি সত্যিই এতটা বোকা! যে সব ব্যক্তি ৪৭ বছর ধরে ভারতে কাজ করেছেন, ভোট দিয়েছেন, সম্পত্তি তৈরি করেছেন, কর দিয়েছেন, পরিবার গড়েছেন, যারা ভারতবর্ষের প্রায় অর্ধশতকের একটি জীবন কাটিয়েছেন; তাদের ‘নাগরিকত্ব’ কিভাবে কেড়ে নেওয়া সম্ভব? চুক্তির বাস্তবায়ন ৩৩ বছর পেছানোর পর ‘কাট অফ’ তারিখও কি ৩৩ বছর পেছনে উচিত ছিল না?