পদ্মাবত সিনেমাটিতে অন্ধ গোড়ামিতা ও ইসলাম সম্পর্কে ভীতি তৈরী করা হয়েছে

0

রানা আইয়ূব, টিডিএন বাংলা ডেস্ক: দূর্ভাগ্যজনক কাশগঞ্জের ঘটনার  দিন যখন দেশপ্রেম নিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ বাকবিতন্ডার জেরে উত্তরপ্রদেশের এই ছোট্ট শহরটিতে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ বাধে এবং যার ফলে একজন যুবক খুন হয়, যখন গোটা ভারত প্রজাতন্ত্র দীবস পালনে ব্যাস্ত  ছিল , ঠিক তারই একদিন আগে সঞ্জয় লীলা বনসলির বহু বিতর্কিত ঐতিহাসিক ” পদ্মাবত ” ফিল্মটি মুক্তি পায় । 
এই সপ্তাহের প্রথমে আমি সিনেমাটি দেখি যদিও প্রথম পাঁচ মিনিট বাদ যায় যে সময় স্ক্রিনে লিখিত ঘোষণা দেওয়া হয় যে ঐতিহাসিক সত্যতার সঙ্গে এই সিনেমার কোনো  সংশ্লিষ্টতা নেই । মুম্বইয়ের নবীন সিনেমা হলটিতে আমার পাশে বসে ছিলেন এক বয়স্ক দম্পতি। কুর্তা-পাঞ্জাবি ও ওয়েস্ট কোট পরিহিত  মোজদি সাজে ছিলেন পুরুষ সঙ্গিটি। উনি আমাকে তথাকথিত ঐতিহাসিক ফিল্মটির তাৎক্ষণাৎ
নিহিত অর্থগুলি বোঝার সাহায্য করেন।

সিনেমাটির শুরুতে রাজা মুরাদকে দেখানো হয় যিনি জালাল উদ্দিন খিলজীর চরিত্রে অভিনয় করেন । তারপর তাঁর বর্বর ভাইপো একজন মুসলিম শাহজাদা রুপে  আলাউদ্দিন খিলজীকে সুরমা চক্ষু বিশিষ্ট, চরিত্রহীন এমন  ব্যাঙ্গাত্মকভাবে দেখানো হয়েছে। তাঁর বিয়ের ঠিক প্রারম্ভে আলাউদ্দিন খিলজী মেহরুন্নেসা নামের একটি মেয়ের সঙ্গে সহবাস করেন । বিয়ের রাতেই তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে তিনি দাসীর মতো আচরণ করেন ।
এর পর ক্রমান্বয়ে রাজা রতন সিং নামক চরিত্রটির সঙ্গে আমরা পরিচিত হই যিনি কিনা পদ্মাবতীর রুপ ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে পড়েন; এমনকি তার প্রথমা স্ত্রীর অনুমতি না নিয়েই তিনি পদ্মাবতীকে বিবাহ করেন এবং তিনি নতুন এই রাণীর দৈহিক চাকচিক্যের কাছে নিজেকে সোপে দেন , তাঁকেই  রাজ্যের মহারাণী হিসাবে  ঘোষণা করেন এবং তাঁর প্রথমা স্ত্রীর মর্যাদা সেখানে ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু রতন সিং একজন রাজপুত হওয়ায় কোথাও যেন তাঁর সম্পর্কে একটা ন্যায়পরায়ণতার  বোধ আমাদের বিবেকসত্ত্বার কাছে তুলে ধরা হয় সেখানে আলাউদ্দিন খিলজী নৈতিকভাবে জঘন্য প্রতিপন্ন হন। 

খিলজীর নৈতীক অবক্ষয়ের উল্লেখ সুচারুভাবেই চলতেই থাকে ; মালিক কাফুরের সঙ্গে তাঁর সমকামী সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে কিনা খিলজিকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য ব্যাকুল হতে থাকে । বনশালীর সিনেমাটিতে রুপায়াতি বিভিন্ন দৃশ্যের মধ্যে সমকামীতার দিকটি যদি উপেক্ষা করা যায়, তারপরও মুসলিম শাসকদের চরিত্রের উপর আরোপ লেপন করা হয়েছে ; তাদের চরিত্রকে নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, বিবেকহীন, দুমুখো সুযোগ সন্ধানী এভাবেই প্রতিষ্ঠিত করা হয় । সিনেমাটিতে যখনই খিলজী রাজপুতদের উপর পশ্চাদ থেকে বা সরাসরি আক্রমণ করছেন তখন এই প্রতীকগুলো আপনার দৃষ্টি এড়ানো সম্ভব নয় । সিনেমাটিতে খিলজী এই জাতীয়তাবাদী ন্যায়পরায়ণ রাজপুতদের সর্বভৌমত্বকে  অক্রমণ করছেন এবং তখনই একটি অর্ধচন্দ্র ও তাঁরকা আঁকা সবুজ পতাকাকে বড়ো বড়ো করে দেখানো হচ্ছে। সম্প্রতী কাশগঞ্জের ঘটনার অবতারণার সঙ্গে এটা খুবি সাদৃশ্যযুক্ত।
অধিকন্তু , আরো দেখানো হয় যে যখন খিলজী তার নিজের ভাইপো,বিস্বস্ত সহচর এবং ক্রীতদাস মালিক কাফুরকে হত্যা করার ঠিক পূর্বে তিনি কোরাণের আয়াত পাঠ করছেন । পদ্মাবতীর খিলজীর রাজ্যে প্রবেশ করার সময়  যেখানে তিনি পদ্মাবতীর সঙ্গে প্রতারণা করে তাকে জয় করার পরিকল্পনা করছেন সেসময় ব্যাকগ্রাউন্ডে নামাজের কথা শোনা যায়। যখন খিলজী রতন সিং এর সঙ্গে প্রতারণা করে তাঁকে পেছন থেকে ছুরির আঘাতে হত্যা করছেন, (গোটা সিনেমাজুড়েই এধরনের নমুনা মেলে ধরা হয়েছে), সে সময় আমার পাশের আসনে বসা আঙ্কেল তাঁর স্ত্রীকে বলেন , “এসব মোল্লারা তো এরকমই , সবসময় মোঘলরা পেছন থেকেই আক্রমণ করতো ।”
দিল্লি সুলতানরা মুলত চরিত্রহীন ;মোঘল সম্রাটদের সম্পর্কে এই থিমটিকেই বনশলীর সিনেমার কাহিনীর গোটা অংশ জুড়ে উপজিব্য বক্তব্য হিসাবে উঠে আসে।
এর আগে তাঁর ” বাজিরাও মাস্তানি ” সিনেমা মুক্তি পায় যেখানে নিজামরা এবং দিল্লির দরবারিরা ছিলেন সুরমা চক্ষুবিশিষ্ট পশুর মতো যারা দেশপ্রেমী পেশোয়ারদের উপর আক্রমণ শানায় শুধুমাত্র দেশটিকে পূর্ণ কব্জায় আনার জন্য।
” পদ্মাবত ”  সিনেমাটি কোনোভাবেই ইতিহাসের ধারেকাছেও ঘেঁষে না । এমনকি যে কাল্পনিক উপাখ্যান কে নিয়ে এই সিনেমাটি নির্মিত বলে দাবি করা হয় তার সঙ্গেও এর মিল নেই । চৌদ্দ শতকের ঐতিহাসিক, কবি ও রহস্য লেখক ওমর খসরুর বিবরণ বনসলি যে ভাবে দেখিয়েছিনে তা বিব্রতকর । আমির খসরু ছিলেন ইসলামি সুফি দর্শন এবং ফারসী সাহিত্যের অন্যতম স্তম্ভ । তাঁকে ” তুতী-ই-হিন্দ ” বা ভারতের গায়ক পাখি বলেও অভিহিত করা হয় । তাঁর লেখা কবিতা ও সাহিত্যে  সোমনাথ এর ব্রাহ্মণদের কথা যেমন উঠে এসেছে , তেমনি একই সঙ্গে উঠে এসেছে মক্কার হাজীদের কথা যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারাকেই মেলে ধরে । এতদাসত্বেও পদ্মাবত সিনেমাটিতে খসরুকে রাজসভার একজন ভাঁড় হিসাবে দেখানো হয়েছে ; যিনি নাকি নিষ্ঠুর আলাউদ্দিন খলজির রাজসভায় একজন জী-হুজুর গোছের তাঁবেদার ছিলেন ।
সিনেমা জগতে একটি ঐতিহাসিক ছবি কে তাঁর নিজস্ব বুননে তুলে ধরার স্বাধীনতা বনশালির আছে । মুলধারার জনপ্রিয় সিনেমাগুলির  ঐতিহাসিক বিবরণির ক্ষেত্রে বিচারধারা মেনেচলাও সম্ভবপর হয়না । তিনি তার স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গিকে মেলে ধরবেন এটা তাঁর গণতান্ত্রিক অধিকার  এবং এটা আমাদের দেশ এবং দেশের সকলের নৈতিক দায়বদ্ধতা করণি সেনার গুন্ডাদের  হিংসাত্মক কার্যবিধি ও ভাঙচুররের বিরোধিতা করা । কিন্তু এখানেই যতো নাটকীয় বৈপরিত্ব । বনশালি দীর্ঘ-পাতার এক লিখিত বিজ্ঞাপনি বয়ান প্রকাশ করে রাজপুত সম্প্রদায়কে শান্ত করাতে জানালেন যে সিনেমাটি রাজপুতদের বীরত্বপূর্ণ বিজয়গাথা নিয়ে । তিনি নত হয়ে পিছু হটলেন, করনি সেনার কাছে অনুরোধ রাখলেন সিনেমাটি দেখে সম্মতিমূলক সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য । এমনকি তিনি সিনেমার শিরোনাম পরিবর্তন করলেন যাতে কারো ভাবাবেগে আঘাত না পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে। কিন্তু রাজপুতদের সৌর্য-বীর্য চিত্রিত করার জন্য অপর একটি সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার দরকার ছিল কি ?
বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশগুলির মতো ভারতেও সাধারণ জনমত গঠন ও বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল ধারার সিনেমাগুলি  খুবই শক্তিশালী অস্ত্র ।
দেশের সাম্প্রদায়িক স্পর্শকাতর বাতাবরণের মধ্যে বিশেষত যেখানে ধর্মের নামে পিটিয়ে খুন, হত্যা একটি  স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে সে সময়ে মুসলিম সম্পর্কে ক্ষতিকর, নৃশংস,  খুনে এমন সব বদ্ধ চিন্তাধারাকেই  বনশালি আরো বেশি মজবুত , শক্তিশালি করেছেন  যাকে হাতিয়ার করে ডান-পন্থীদের সংখ্যালঘুদের প্রতি ঘৃণার  ভিত্তি দেওয়া হচ্ছে ।
তাজমহলকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে ডাক বিজেপি নেতারা দিয়েছেন বা প্রসিদ্ধ এই তাজমহল নিয়ে বিজেপির নেতারা যে অবমাননাকর মন্তব্যগুলো করছেন সেখানে এই ধরনের কল্পকাহিনীর বিস্তৃত রুপকেই ব্যাবহার করছেন । এটি মোঘলদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্মৃতি সৌধ হিসাবে যারা মনে করে তাঁদের কাছে এধরনের ব্যাখ্যা কে পেশ করা হচ্ছে ।

রাজপুতদের বাহাদুরিকে তিনি ইচ্ছামত রং চড়িয়ে দেখাতেই পারেন কিন্তু সেজন্য কি কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে কালিমালিপ্ত করার প্রয়োজন ছিল বিশেষ করে যারা ক্রমবর্ধমানভাবে এই দ্বিমেরুকরণের ন্যারেটিভে নিজেরাই ক্ষমতাহীন ? পদ্মাবত সিনেমার আপাত আড়ম্বপূর্ণ জাঁকজমকের ফ্রেমের আড়ালে একটা বিশৃঙ্খলা তৈরীর প্রচেষ্টা নিহিত । এধরনের বিপদজনক স্টিরিওটাইপ সিনেমাকে বিক্রি করে হয়তো বনসালি খুব তাড়াতাড়ি  আনুকূল্য পাবে কিন্তু  তা একটি প্রজন্মের মধ্যে বিশেষত যারা জনপ্রিয় সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত হয় তাদের মনে একটি সম্প্রদায় সম্পর্কে অপ্রিতীকর ছাপ রেখে যাবে ।
২০১৫ সালে বনশালি পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন । অনেক বড়ো সম্মানের এবং খ্যাতির সঙ্গে অনেক বেশি দায়বদ্ধতা চলে আসে। যদি তা সত্য নাও হয় , অন্তত এমন একটা দেশের জন্য এটা সত্য যার গঠন তন্ত্র অল্প সুবিধাভোগিদের জন্য সততা ও পক্ষপাতহীনতার বুনিয়াদের উপর  গড়ে উঠেছে ।

( রানা আইয়ুব হলেন পুরস্কার প্রাপ্তা অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিক এবং একজন রাজনৈতিক লেখিকা।টিডিএন বাংলায় প্রকাশিত লেখাটি এনডিটিভি থেকে অনূদিত)