শান্তি পেতে সারা পৃথিবীতে ইসলাম ধর্ম নিয়ে মানুষ বেশি চর্চা করছে -সঞ্জীব ভাট

0

টিডিএন বাংলা ডেস্ক: প্রথার বাইরে ভিন্ন লেন্সের আলোকে ইসলাম:
১৮/০১/১৮
জাকিয়া সোনামের কলমে,
সর্বভারতীয় ইংরাজী নিউজ পোর্টাল দা ওয়্যার থেকে টিডিএন বাংলার পাঠকদের জন্য  অনূদিত

সঞ্জীব ভাট তাঁর লেখা “ইসলাম ইজ গুড মুসলিম স্যুড ফলো ইট” ( ইসলাম ধর্ম ভালো, মুসলিমদের এটা মেনে চলা উচিত) বইটিতে তিনি বর্তমানে মুসলিমদের বাস্তব অবস্থা ও ইসলামের কালজয়ী ইতিহাসকে মেলে ধরেছেন।

সাধারণভাবে বলতে গেলে,আমরা বর্তমানে এমন একটা পৃথিবীতে বসবাস করছি যেখানে ধর্ম বা ধর্মীয় চেতনা সম্ভবত অবক্ষয়ের পথে। কিন্ত ঠিক অনুরুপ সময়ে, ইসলাম ধর্ম  সম্পর্কে আমাদের মধ্যে কৌতুহল ও আগ্রহের অন্ত নেই। এমনকি এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে সম্প্রতী আন্তর্জাতিক মহলের ইসলাম কে ঘিরে যত বেশি আগ্রহ ও উৎকন্ঠা  অন্য কোনো ধর্ম কে ঘিরে তা কিন্তু দেখা যায়না। আমেরিকা থেকে ভারত প্রভৃতি বিভিন্ন দেশের  রাজনৈতীক মহলে সরগরম ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে প্রচলিত, ভ্রান্ত নানা বোধ বিশ্বাস নিয়ে ।

যে ধর্মকে নিয়ে এত রাজনৈতিক বাকবিতন্ডা তা সম্পর্কে সম্প্রতি এ দেশের মানুষের মনেও আরো বেশি করে জানার কৌতুহল ক্রমশ বেড়ে চলেছে। অনেকে ইসলাম সম্পর্কে শঙ্কিত আবার অনেকে কুসংস্কার আচ্ছন্ন। বিভিন্ন মানুষের ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা এবং তা রাজনৈতিক-ভৌগোলিক সীমারেখার পরিবর্ধন, সন্ত্রাসী কার্যকালাপ, আইসিস এর ব্যাখ্যা, তথাকথিত সন্ত্রাস দমনে বিশ্বব্যাপি যুদ্ধ, সৌদি আরবে মুসলিম মহিলাদের  উপর বিভিন্ন বিধি-নিষেধ ইত্যদি বিষয় দ্বারা প্রভাবিত। ইসলামি নির্দেশিকার পরিপন্থী হলেও মুসলিমদের কার্যাবলির নিরিখেই সবাই ইসলামকে বিচার করে থাকে। আমরা এমন এক রাজনৈতিক সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি যেখানে ধর্মকে আইসিস এর কার্যকালাপ বা সন্ত্রাসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজ মুসলিমদের সমষ্টিগত সামাজিক ক্রিয়াকর্ম খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি সঞ্জীব ভাটলার লেখা এই বইটি যে কারো জন্য পড়া খুবি প্রয়োজন বিশেষত যারা ধর্মটি আরো ভালোভাবে জানতে আগ্রহী এবং পার্থক্য খুঁজতে চান। বইটির নাম করণের মধ্যেই সম্পূর্ণ বক্তব্য স্পষ্ট -ইসলাম ইজ্ গুড মুসলিম স্যুড ফলো ইট (ইসলাম ধর্ম ভালো, মুসলিমদের উচিত এটা মেনে চলা)। বইটি পড়ার সময় আমারও মনে হলো….যদি সত্যি  তা হতো।

বইটিতে ইসলাম ধর্ম এবং তার শিক্ষাগুলিকে নিয়ে বিস্তারিত লেখা হয়েছে। কীভাবে ১৪০০ বছর আগের সামাজিক ও রাজনৈতীক পরিস্থিতিতে জন্ম এবং বিকাশের মধ্য দিয়ে আজকের আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে ও সমান অর্থবহুল আলোচনার এই বিষয়বস্তু বইটির গুরুত্বকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। প্রফেট মহম্মদের (স) জীবনবৃত্তান্তের মধ্য দিয়ে লেখক তা স্বার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখক ভাটলা তাঁর স্বত:প্রবাহিত আলেখ্যে বর্তমান মুসলিম সমাজের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে ইসলামের কালজয়ী ইতিহাসের দিনগুলির মধ্যে (যার মধ্যে বেশ কয়েকটি আল্লাহর বাণীবাহকের অনমনীয় মানবিক চরিত্রকে কেন্দ্র করে) সংযোগ খোঁজার চেষ্টা করেছেন। নবী ছিলেন আধুনিক মননের ও একাধারে একজন সংস্কারক, একজন ন্যায়পরায়ণ ও উত্তম নেতা, একজন সুকৌশলী চিন্তাবীদ, একজন রাষ্ট্র-নেতা এবং একই সঙ্গে তার সঙ্গী-সাথীদের সঙ্গে আচার-আচারণের ক্ষেত্রে একজন সাধারণ মানুষ।বইটি বিষদভাবে আরো বর্ণনা করে ইসলাম ধর্মের নবী  অন্যান্য ধর্মের অনুসারিদের সঙ্গে কিভাবে তার আচার ব্যাবহারের মধ্য দিয়ে ধর্ম নিরপেক্ষ বাতাবরণ, সহিষ্ণুতা ও শান্তিপূর্ণ পারস্পারিক সহাবস্থানের পরিবেশ কায়েম করেন। মদীনা রাষ্ট্রের সংবিধানে (মদীনা সনদ)  বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্ত দলের প্রতিনিধীত্বের কথা বলা হয় যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই উৎসাহীত করে।

কোরাণ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিতে তিনি সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি গুলো উল্লেখ করে আধুনিক সময়ে তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করেন।  উত্তম ব্যাবহার, নম্রতা, বিশ্বাস, সততা ইত্যাদির উপর দৈনন্দিন কাজে কর্মে কোরাণে খুবই তাগীদ দেয়া হয়েছে। তিনি পবিত্র গ্রন্থের বিভিন্ন আয়াত বা লাইন উদ্ধৃত করে এবং রাসূলের  জীবনের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে শান্তিপূর্ণ পারস্পারিক সহাবস্থান,অহিংসা, রাজতন্ত্রবিরোধী শাসন ব্যবস্থা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, পক্ষপাতহীনতা, দয়া ও অনুকম্পা, সুবিচার, শালীনতা, সদাচরণ এমন কিছু মূল্যবোধভিত্তিক নীতির উপর বিষদ আলোচনা করেন।
আমার ব্যাক্তিগত ভাবে ভালো লেগেছে প্রায় গোটা বই জুড়ে সুন্দরভাবে ইসলামে মহিলাদের যে সমান অধিকারের দেওয়া হয়েছে সে দিকটার উপর জোর দিয়ে তিনি তার লেখাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন – বইটির শুরুতেই উদ্ধৃতি সহ তিনি লেখেন ( মহম্মদ স: পর) প্রথম মুসলিম হন মহিলাদের মধ্য থেকেই। কোরাণে সর্বতভাবে যুক্তি-দর্শনের উপর ভিত্তি করে “নারী” ও “পুরুষে”  যে সমান তা স্পষ্ট প্রতীয়মান। নারী পুরুষের সমান পুরষ্কার, স্ত্রী শব্দের ব্যাবহার না করে সঙ্গিনী শব্দের প্রয়োগ, লিঙ্গের দিক থেকে নারী পুরুষ একে অপরের পরিপুরক, একে অন্যের বন্ধু প্রতিদন্দী নয়, এসব কথা নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বার্তা বহন করে। বইটিতে ইসলাম আসার পূর্বে আরবের বুকে নারীদের যে সোচনীয় অবস্হা তার সঙ্গে যে এই আমূল বৈপরীত্ব তা স্মরণ করিয়ে দেয়। কোরাণে নারীজাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলে, তাদেরকে পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারের হক দেয়, তারা নিজেরাই তাদের পুরুষ সঙ্গিকে তালাক দেওয়ার অধিকার লাভ করে, কন্যা ভ্রুণ হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়। নারীরা সে সময় বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ইস্যুতে অংশগ্রহণ করতো, তার বেশ কিছু নজির বইটির বিবরণির মধ্যে লেখক সেগুলি লিপিবদ্ধ  করেছেন।

পুস্তকটি অর্থবহভাবে “দ্যা থার্ড ফ্যাক্টর” বা “তৃতীয় প্রভাবক” নামক একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপসংহার দিয়ে শেষ হচ্ছে। এই অংশে লেখক ভাটলা সমগ্র মুসলিম ও ইসলাম ধর্মের কাজীদের সম্মুখে সোজা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন ; ঠিক আজকের সময়ে রাসূল যদি  বেঁচে থাকতেন তাহলে তিনি কি ভূমিকা পালন করতেন ? তিনি নিশ্চিত যে এই প্রশ্ন কাজীদের  মনের মধ্যে রাসূলের ব্যাক্তিসত্বা সম্পর্কে একটা বোধ জাগ্রত করবে যা তাদের বিবেক কে সঠিকভাবে ব্যাবহার করতে উদ্বুদ্ধ করবে।এই “তৃতীয় প্রভাবক” প্রত্যেক মুসলিমকে মনে করিয়ে দেবে নবীজীর কথা;  দু:খি নিপীড়ীত সাধারণ মানুষের জন্য তার উদ্বেগের কথা , ফলে সেও তার চিন্তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবে। যদি নবীর মতো তারা সদাচারী ও দয়ালু হতে পারে তাহলে তাদের সামনে নতুন পথ খুলে যাবে- তাদের বিচার-ফায়সালা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিচারের মতো হবে। তাহলে নবীর মতো প্রতিটি মুসলিম বিবেকের ডাককে শুনতে  পাবে।

প্রায় সমস্ত ধর্ম,জাতি ও এলাকার লেখকরা ইসলামের উপর বিভিন্ন পান্ডিত্যপূর্ণ বই লিখেছেন। তারপরও এই বইটি প্রশংসার দাবি রাখে; বইটি সরাসরি পাঠকের সঙ্গে আলাপ করে চলেছে এবং তাকে নবীর জীবনের উপর ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। নবীর জীবনী এবং তিনি যে সমাজকে পরিবর্তনের জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন তার উপর সুন্দরভাবে গবেষণালবদ্ধ বইটি পাঠক কে গভীর ভাবনার তলদেশে নিয়ে যায়। বইটি শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য অবশ্য পড়নীয় নয় এটা বরং তাদের জন্যও যারা ন্যায় ও শান্তির পক্ষের অবলম্বন চায়।

( টিডিএন বাংলার পাঠকদের জন্য লেখাটি অনুবাদ করেছেন একরামুল হক মোল্লা)